রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল থেকে নারী নেতৃত্ব উঠে আসছে না কেন?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কতটা ভূমিকা রাখতে পারে তা নিয়ে বিতর্ক বহু পুরনো। ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কতটা ভূমিকা রাখতে পারে তা নিয়ে বিতর্ক বহু পুরনো।

ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ।

সেখানকার কায়েতপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অফিসে দেখা গেলো জনা সাতেক নারী কর্মীর অবস্থান।

সেখানেই পাওয়া গেলো কায়েতপাড়া ইউনিয়ন মহিলালীগের ৫ নং ওয়ার্ডের সভাপতি ফেরদৌসি আহমেদকে।

মিসেস আহমেদ আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই জড়িত আছেন।

অংশ নেন আওয়ামীলীগের ঘোষিত বিভিন্ন কর্মসূচিতেও। তবে তার আক্ষেপ আওয়ামী লীগে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেও মূল দলের স্থানীয় কোন কমিটিতেই আসতে পারেননি তিনি।

তার অবস্থান মহিলালীগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফেরদৌসি আহমেদ বলছেন,

'আমি তো মহিলালীগের মধ্যেই আটকায়া আছি। মূল দলের ওয়ার্ড বা ইউনিয়ন কমিটিতে যাইতে পারলাম না। আসলে মহিলাদের কেউ প্রাধান্য দিতে চায় না।'

তিনি বলছেন, 'আওয়ামী লীগের কোন প্রোগ্রাম থাকলে আমাদের মহিলালীগে যেইসব কর্মী আছে তাদের নিয়ে যাই। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভিতরে আমাদের তেমন গুরুত্ব দেখি না। ধরেন, স্থানীয়ভাবে যখন কোন প্রোগ্রাম দেয়া হইল, তখন প্রোগ্রামের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আমাদের ডাকে না। ডাকে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরে অংশ নেয়ার জন্যে।'

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption পুরুষদের তুলনায় দলে নারী কর্মীরা গুরুত্ব কম পান বলেই অভিযোগ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়ন মহিলালীগের ৫ নং ওয়ার্ডের সভাপতি ফেরদৌসি আহমেদের।

রূপগঞ্জে আরেক বড় দল বিএনপি'তেও একই অবস্থা।

রাজনীতিতে এমনিতেই বেকায়দায় থাকা দলটির দলীয় কার্যক্রম খুব একটা নেই। যা আছে সেখানেও নারীদের অংশগ্রহণ কম বলেই জানাচ্ছেন রুপগঞ্জ উপজেলা বিএনপি'র মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা হাওয়া বেগম।

তিনি জানাচ্ছেন, দলের ১০১ সদস্য বিশিষ্ট উপজেলা কমিটিতে তিনিসহ নারী আছেন মাত্র চার জন।

তিনি বলছেন, দলে স্থানীয়ভাবে যেমন নারীদের খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। তেমনি যারা নারী নেত্রী আছেন, তারাও উচ্চাকাঙ্খী নন।

'আমি রাজনীতি করি ১৯৯১ সাল থেকে। এতোদিনে আমার অর্জন হইলো কমিটির মহিলা সম্পাদিকা। আমার সময়কার পুরুষ নেতারা এখন অনেক বড় বড় পোস্টে। সত্যিকথা বলতে, আমাদের যেমন গুরুত্ব কম দেয়া হয়, আবার আমাদেরও নিজেদের আগ্রহে ঘাটতি আছে।'

তিনি বলছেন, 'নারীরা শুধু যে রাজনীতিতে পিছিয়ে আছে তা না। সবক্ষেত্রেই তো এই অবস্থা। এইটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর নেতা হইতে গেলেও তো টাকা লাগে। মহিলাদের কি এতো টাকা আছে?'

দলগুলোর কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কী অবস্থা?

নারায়ণগঞ্জে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের তৃণমূলে যখন এ অবস্থা তখন দল দুটির জাতীয় পর্যায়েও নারী নেতৃত্বের সংখ্যা খুব একটা বেশি নয়।

দুটি দলেরই শীর্ষ দুই পদের বাইরে অন্য যেসব গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের জায়গা সেখানে নারীদের অবস্থান পুরুষদের তুলনায় বেশ দুর্বল।

আওয়ামী লীগের সবোর্চ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর ১৯ সদস্যের মধ্যে চারজন মাত্র নারী সদস্য। এর মধ্যে সর্বশেষ কাউন্সিলে যে নতুন তিনজন স্থান পেয়েছেন তারা সকলেই পুরুষ।

চারজন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে নারী মাত্র একজন।

কাউন্সিলে আট জন সাংগঠনিক সম্পাদক পদের বিপরীতে যে পাঁচজনের নাম ঘোষণা করা হয়, সেখানেও কোন নারী নেই।

অন্যদিকে বিএনপি'র সবোর্চ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে যে ১৬ জন সদস্য আছেন তাদের দু'জন মাত্র নারী।

যুগ্ম মহাসচিব পদে ৭ জনই পুরুষ।

আর ১০ সাংগঠনিক সম্পাদকের দুটিতে আছে নারী প্রতিনিধি।

এমনকি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সব পর্যায়ে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বিএনপি'র কেন্দ্রীয় কমিটিতে সেটা মাত্র ১৫ শতাংশ।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বিলুপ্ত কমিটিতে সেটা ছিলো ১৯ শতাংশের নিচে।

আর এখনো পর্যন্ত নতুন যে আংশিক কমিটি গঠন হয়েছে, সেখানেও আগের তুলনায় খুব একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।

একই অবস্থা অন্যান্য বড় দলগুলোর ক্ষেত্রেও।

তবে কমিটিগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী কোটা পূরণের জন্য সব দলই অবশ্য ২০২০ সাল পর্যন্ত সময় পাচ্ছে।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption রাজনীতির পুরুষতান্ত্রিক চরিত্র অর্থাৎ পেশি শক্তির প্রয়োগ, সহিংসতা এসবের কারণেও রাজনীতিতে নারীরা পিছিয়ে বলে মনে করা হয়।

তৃণমূলে নারী নেতৃত্বের গুরুত্ব কী?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিস বিভাগের চেয়ারপারসন সানজীদা খাতুন মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো যে এখনো সব ধরণের কমিটিতে কার্যকর সংখ্যায় নারী নেতৃত্ব আনতে পারছে না, তার বড় কারণ দলগুলোর তৃণমূলে এখনো নারী নেতৃত্বের বিষয়টি অবহেলার চোখেই দেখা হয়।

তিনি বলছেন, "তৃণমূল রাজনীতিতে যদি গুণগত এবং সংখ্যাগতভাবে নারীদের প্রতিনিধিত্ব যথাযথভাবে না থাকে তাহলে তো জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব থাকবে। কমিটিতে নারীদের শুধু সংখ্যায় আনলে হবে না, তাদেরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতেও আনতে হবে। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি।"

তিনি বলছেন, "আমরা যখন চাইবো নারীরা রাজনীতিতে আসুক, সিদ্ধান্ত নিক, তখন কিন্তু রাজনীতিকেই নারীবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক পলিসি বলেন আর কাঠামোগত সংস্কার বলেন, সেটা করতে হবে। আমাদের দেশে রাজনীতির যে পুরষ চরিত্র অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগ, মারামারি এসব সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে হবে। তাহলেই রাজনীতিতে নারীদের গুণগত ভূমিকা বাড়বে।"