নাগরিকত্ব আইন: মোদি সরকারের মুখোমুখি তিন লড়াকু নারী

  • অমিতাভ ভট্টশালী
  • বিবিসি বাংলা, কলকাতা
নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে কলকাতায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ।

ছবির উৎস, SOPA Images

ছবির ক্যাপশান,

নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে কলকাতায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ।

প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলল ভারতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে। আসাম থেকে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে কেরালা বা পন্ডিচেরি - প্রতিবাদ হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। আর এসব বিক্ষোভ জমায়েতগুলোতে খুব বেশি সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের।

দিল্লির জামিয়া মিলিয়া আর আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় দুটিতে ছাত্রদের ওপরে পুলিশের ব্যাপক মারধরের পরে সারা দেশের ছাত্রছাত্রীরা যেন আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। হাজারে হাজারে তারা পথে নামছেন রোজ।

কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের এই বিক্ষোভে বেশ কয়েকটি প্রতিবাদী মুখ নিয়ে চর্চা হচ্ছে - ভাইরাল হয়ে গেছে তাদের প্রতিবাদী ছবি।

ঘটনাচক্রে তিনজনই ছাত্রী - এবং তিনজনের সঙ্গেই কোনও রাজনৈতিক দলের কোনও যোগাযোগ আগেও ছিল না, এখনও নেই।

তারা এতদিন ধরে শুধুই পড়াশোনা করেছেন আর সঙ্গে কেউবা নাচ, ছবি আঁকার মতো হবিতে জড়িয়ে ছিলেন। রাজনীতি থেকে দূরেই থেকেছেন এরা।

কিন্তু হঠাৎই তারা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছেন।

এই তিনজনের মধ্যে সবথেকে কম বয়সী কেরালার এর্নাকুলামের আইন প্রথম বর্ষের ছাত্রী ইন্দুলেখা পর্থান।

ইন্দুলেখা পর্থান, আইনের ছাত্রী, এর্নাকুলাম, কেরালা

ছবির উৎস, Indulekha Parthan

ছবির ক্যাপশান,

ইন্দুলেথা পর্থান, প্রতিবাদী নারী

ইন্দুলেখা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আমি কোনদিন কোনও রাজনীতি বা প্রতিবাদে যাই নি এর আগে। সেদিন কলেজের সিনিয়ররা ক্লাসে এসে জানায় যে নাগরিকত্ব সংশোধনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে ছাত্রছাত্রীদের। প্রতিবাদের ধরণ নিয়ে কারও কোনও আইডিয়া আছে কী না। তার আগেই প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, যারা অশান্তি ছড়াচ্ছে, তাদের পোশাক দেখেই চেনা যায় কারা এর পিছনে আছে। ওই কথাটা মাথায় এসেছিল হঠাৎ।"

সিনিয়র ছাত্রছাত্রীদের ইন্দুলেখা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী যখন পোশাক দেখে চেনা যায় বলছেন, তখন তিনি হিজাব পড়ে প্রতিবাদে যেতে চান। উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সঙ্গেই তার আইডিয়াটা পছন্দ হয়ে যায়। যোগাড় করা হয় হিজাব।

ইন্দুলেখা সেদিন ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদী মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন ওই হিজাব পড়ে। হাতে ধরা ছিল একটা প্ল্যাকার্ড: "মি. মোদী আমি ইন্দুলেখা। আমার পোশাক দেখে আমাকে শনাক্ত করুন।"

"আমার মনে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যটার প্রতিবাদ করা দরকার - যদি একজনও আমার হিজাব পড়ার কারণটা বুঝতে পারে, সেটাই আমার সার্থকতা - এটাই মনে হয়েছিল। কিন্তু ছবিটা যে এরকম ভাইরাল হয়ে যাবে, এটা ভাবিই নি। আমার এক বন্ধুই ছবিটা তুলেছিল," বলছিলেন ইন্দুলেখা পর্থান।

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান,

নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে সরব দিল্লির এই ডাক্তার ও মেডিকেল শিক্ষার্থীরা।

সম্পর্কিত খবর:

"আমি কখনই কোনও প্রতিবাদ মিছিলে যাই নি। কিন্তু আইনের ছাত্রী হিসাবে আমার মনে হয়েছিল ছাত্রদেরই এব্যাপারে এগিয়ে আসা উচিত - তার কারণ আমরাই তো শিক্ষিত শ্রেণি - আমরাই তো ভবিষ্যৎ। আগামী দিনে কারও নাম তালিকা থেকে বাদ যাবে - এটা তো আমাদেরই ভবিষ্যতের প্রশ্ন," বলছিলেন ১৮-বছর বয়সী ইন্দুলেখা।

যদিও তিনি আইন পড়ছেন, তবে তার ভালবাসার বিষয় হল অঙ্ক। রাজ্যস্তরের নানা অঙ্ক প্রতিযোগিতায় যোগ দেন তিনি। আরেকটি শখ ভারতনাট্যম নাচ।

ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরে পরিবার আর বন্ধুদের পাশে পেয়েছেন ইন্দুলেখা। অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমে তাকে ব্যাপকভাবে ট্রলও করা হচ্ছে। কিন্তু সেসবের দিকে মন দিতে চান না ইন্দুলেখা পর্থান।

ছবির উৎস, রাবিহা আব্দুরেহিম

ছবির ক্যাপশান,

রাবিহা আব্দুরেহিম, পন্ডিচেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্রী।

রাবিহা আব্দুরেহিম, গণসংযোগে এমএ পরীক্ষায় স্বর্ণ পদক প্রাপ্ত, পন্ডিচেরি বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে হাজির হয়েছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দ। অনুষ্ঠানে ডিগ্রি নিতে হাজির হয়েছিলেন সহপাঠীদের সঙ্গে রাবিহাও। সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিক কালো পোশাকের সঙ্গেই তিনি মাথায় জড়িয়ে নিয়েছিলেন গোলাপি রঙের হিজাব।

রাষ্ট্রপতির আসার জন্য যখন সকলেই উদগ্রীব, সেই সময়ে হঠাৎই পুলিশ কর্মকর্তারা রাবিহাকে বাইরে ডেকে নিয়ে যান। বলা হয় যে তার সঙ্গে কিছু কথা আছে।

"বাইরে নিয়ে গিয়ে পুলিশ আমাকে নানা প্রশ্ন করতে থাকে। তার আগেই সামাজিক মাধ্যমে আমি খুব কড়া প্রতিবাদ করছিলাম এনআরসি এবং সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে। আমার মনে হচ্ছিল সামাজিক মাধ্যমের ওইসব প্রতিবাদের কারণেই বোধহয় আমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং যতক্ষণ রাষ্ট্রপতি সমাবর্তনে ছিলেন, ততক্ষণ আমাকে হলে ঢুকতে দেওয়া হয় নি," বিবিসিকে বলছিলেন রাবিহা।

কিছু ছাত্রছাত্রীকে ডিগ্রি আর পদক দেওয়ার পরে রাষ্ট্রপতি বেরিয়ে যান। তারপরে পুলিশে রাবিহাকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেয়।

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান,

শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার নীতি।

তখনও বাকি ছাত্রছাত্রীদের ডিগ্রি প্রদান চলছিল।

মঞ্চে যখন তার ডাক পড়ে, তখন সটান বলে দেন, "আমি পদক নেব না। এটাই আমার প্রতিবাদ। নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদ করেছি বলে আমাকে হল থেকে বার করে দেওয়া হল! অত্যন্ত অপমানিত হয়েছি। আর আমি সেই অপমান সহ্য করে স্বর্ণপদক নেব?"

বিবিসিকে তিনি আরও বলছিলেন যে প্রথমে তার ধারণা হয়েছিল যে সামাজিক মাধ্যমে কড়া প্রতিবাদের কারণে তাকে বের করে দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে আরও মুসলমান ছাত্রী ছিল, এমন অনেকে ছিল যারাও এনআরসি-বিরোধী প্রতিবাদে সামিল হয়েছিল। "কিন্তু কাউকে না বেছে শুধু আমাকেই বের করে দেওয়া হয়। এটা তো বৈষম্য। পরে পুলিশ জানিয়েছে যে তাদের আশঙ্কা ছিল যে রাষ্ট্রপতির সামনে আমি কোনোভাবে প্রতিবাদ করে উঠতে পারি - সেজন্যই আমাকে সভাস্থল থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।"

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই সভার নিরাপত্তার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবেই ছিল পুলিশের। তাই সেখানে তাদের কিছু বলার ছিল না।

ওই ঘটনার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেতেই রাবিহাও হয়ে উঠেছেন ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের আরেকটি মুখ।

দেবস্মিতা চৌধুরী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে স্বর্ণ-পদকপ্রাপ্ত, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

ছবির উৎস, দেবস্মিতা চৌধুরী

ছবির ক্যাপশান,

দেবস্মিতা চৌধুরী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন বলে মনে করা হয়। তারা সব ইস্যুতেই ছাত্র-প্রতিবাদে রাস্তায় নামে, যেমনটা নেমেছে নাগরিকত্ব আইনে সংশোধন এবং এনআরসি নিয়েও।

মিছিল-বিক্ষোভে পা মিলিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা, স্লোগান দিয়েছে, পোস্ট-কমেন্ট করছে সামাজিক মাধ্যমেও।

কিন্তু এসবের থেকে কিছুটা দূরে থাকা, চুপচাপ পড়াশোনা আর ছবি আঁকার শখ নিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে লাগাতার প্রথম হয়ে আসছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের যে ছাত্রীটি, সেই দেবস্মিতা চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের মঞ্চে এমন একটি ঘটনা ঘটিয়েছেন, যাতে তার সম্পর্কে বন্ধুবান্ধব আর সহপাঠীদের ধারণাটাই বদলিয়ে গেছে।

সমাবর্তনে স্বর্ণ পদক নিতে উঠে মিজ. চৌধুরী নাগরিকত্ব আইনের কপিটা সবার সামনে ছিঁড়ে ফেলেন। তাকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায় 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ'। স্লোগানটা বামপন্থীদের হলেও তিনি নিজে কোনও দিন কোনও রাজনৈতিক বা ছাত্র সংগঠনের সঙ্গেই থাকেন নি, বলছিলেন দেবস্মিতা।

ভিডিওর ক্যাপশান,

বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের কপি ছিঁড়ে ফেলছেন দেবস্মিতা চৌধুরী।

"আমাকে সবাই জানে যে কম কথা বলি, পড়াশোনা নিয়ে থাকতেই পছন্দ করি। কখনও কোনও রাজনৈতিক সংগঠনে ছিলাম না। কিন্তু পরিস্থিতিই আমাকে বাধ্য করেছে রাস্তায় নামতে, প্রতিবাদ করতে। সেদিন মঞ্চে ওঠার আগে থেকেই ভীষণ ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম।"

"যেভাবে ছাত্রদের মারা হচ্ছে, বাচ্চা ছেলেরা মার খাচ্ছে পুলিশের কাছে, এটা জাস্ট মেনে নিতে পারি নি। আগে থেকে কিছুই ভেবে করি নি। হঠাৎই ক্ষোভটা উগড়ে দিয়েছি," বিবিসি বাংলাকে জানাচ্ছিলেন দেবস্মিতা।

তার ক্ষোভ যে শুধু এনআরসি এবং নাগরিকত্ব আইন বিরোধী প্রতিবাদে ছাত্রদের ওপরে পুলিশের লাঠিচার্জের কারণে নয়, সেটাও বললেন তিনি।

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান,

দিল্লিতে নাগরিকত্ব আইন বিরোধী এক ছাত্র সমাবেশ।

"আজকে সরকারকে বুঝতে হবে যে কেন এত মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে, কেন কোনও জায়গায় সেটা সহিংস হয়ে যাচ্ছে। আমি সহিংসতাকে সমর্থন করি না ঠিকই, কিন্তু সরকারের এটাও বোঝা উচিত যে এখানে দেশের মানুষের নিজের পরিচয় নিয়ে, অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। কারণ কারও যদি নাগরিকত্ব না থাকে, তাহলে তার নিজের পরিচয় আর অস্তিত্ব বা তার কোনও অধিকারই আর থাকবে না," বলছিলেন দেবস্মিতা।

কথার শুরুতে দেবস্মিতা বলছিলেন যে তিনি চুপচাপ পড়াশোনা নিয়ে থাকতেই ভালবাসতেন। কিন্তু সেরকমই একজনকে প্রতিবাদ করতে বাধ্য করেছে বিরাট বড় ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার।

"আমি বা আমার মতো কমবয়সীরা তো আমাদের দেশটাকে এভাবে দেখতে চাই নি। আমার ভারতকে আমি বড়ো হতে, বিশ্বের সেরা দেশগুলোর একটা দেখতে চেয়েছি। এভাবে নেতা-হীন একটা দেশ তো চাই নি আমরা। এই কথাগুলো যখন আপনাকে বলছি, গলার স্বরে বুঝতে পারছেন হয়তো আমার চোখে জল এসে যাচ্ছে।" বলছিলেন দেবস্মিতা।

সমাবর্তনের মঞ্চে উঠে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের কপি ছিঁড়ে ফেলার ছবি ভাইরাল হওয়ার পরে তার কাছে যেমন বহু ফোন আর মেসেজ এসেছে অভিনন্দন জানিয়ে, তেমনই ট্রলও করা হচ্ছে তাকে। আর সেই সব ট্রলে টেনে আনা হচ্ছে তার পরিবারকেও। কিন্তু পাশে পেয়েছেন সহপাঠী, শিক্ষকদের।