অটিজম: 'আমি আমার জীবনের ৪০ বছর ফিরে পেতে চাই'

বার্নি
Image caption বার্নির একটি বাড়ি, পরিবার এবং শিক্ষক হিসাবে কাজ ছিল। তারপর তিনি জানতে পারেন তিনি অটিজমে আক্রান্ত।

বার্নি অ্যাংলিস তার জীবনের বেশিরভাগ সময় সুস্থ সবল থাকার জন্য লড়াই করে গেছেন।

অবশেষে ৪৯ বছর বয়সে এসে তিনি একটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান যা তার অনেক প্রশ্নের জট খুলতে সাহায্য করেছে।

তার মনে পড়ে, তিনি ছোট থাকতে তার পরিবার তাকে নতুন স্কুলে যেতে দেয়নি। "তারা ভেবেছিল সেখানে আমাকে টিটকারি দিতে দিতে মেরে ফেলা হবে"।

যদিও তিনি কথাবার্তায় ভাল ছিলেন তার হাতে গোনা কয়েক জন বন্ধু ছিল - তবে তিনি মনে করেন তার সহানুভূতি এবং সামাজিক দক্ষতার অভাব ছিল।

তার একটি বাড়ি, নিজের পরিবার এবং শিক্ষক হিসাবে একটি চাকরি থাকার পরও নানা, "বিপর্যয়মূলক চিন্তাভাবনা" দেখা দিতে শুরু করে।

তিনি ক্রমশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং নিজেকে অপর্যাপ্ত মনে হতে থাকে।

যা তার শারীরিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটায় - বিশেষ করে হাঁপানি সংক্রমণের সমস্যা নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়।

অবশেষে, স্ত্রীর অনুরোধে বার্নি একটি ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট বা মনরোগবিদের কাছে যান - এবং পরীক্ষায় তার এস্পারগার ধরা পড়ে।

এতে করে, এতদিন ধরে তার সামাজিক দক্ষতার অভাব, ভোঁতা চিন্তাভাবনা এবং সবসময় অতিরিক্ত গুছিয়ে চলার প্রবণতাটি হঠাৎ বোধগম্য হয়।

"এই পরীক্ষাটি আমার সমস্ত ব্যর্থতার কারণগুলোকে ব্যাখ্যা করে।"

ছবির কপিরাইট ROBERT GREENALL
Image caption রবার্ট সাইক্লিং পছন্দ করতেন তবে বিভিন্ন পার্টিতে আলাপ, কথাবার্ত তিনি ঘৃণা করেন।

বিবিসির সংবাদদাতা ৫৩ বছর বয়সী রবার্ট গ্রিনাল সম্প্রতি জানতে পারেন যে তিনিও অটিজমের পর্যায়ে রয়েছেন।

"সারা জীবন, আমি ভাবতাম যে আমি কখনই কেন অন্যদের সেভাবে বুঝতে পারিনি এবং তারাই বা কেন আমাকে বুঝতে পারে না," বলেন মি. গ্রিনাল।

"আপনি একজন রহস্যময় ব্যক্তি" বা "আপনি অন্য গ্রহে আছেন" এমন বিদ্রূপাত্মক কথা তাকে প্রায়শই শুনতে হতো।

দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মনে করতেন যে একমাত্র সন্তান হওয়ায় বা বোর্ডিং স্কুলে পাঠানোয় এবং বিচ্ছিন্ন শৈশব কাটানোর কারণেই হয়তো তিনি এমন।

তিনি মানচিত্র দেখতে এবং রেলপথ সম্পর্কে পড়তে পছন্দ করতেন। খেলার প্রতি আগ্রহী ছিলেন না তিনি।

তাই মাঠে তার আনাড়িপনা বা আত্মবিশ্বাসের অভাবকে নিয়ে টিটকারি করতো তার বয়সী অন্য ছেলেরা।

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও, সামাজিক কথোপকথন, এমনকি বিভিন্ন পার্টিতে ছোটখাটো কথাবার্তাও তার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো মনে হতো।

তিনি অবাক হতেন এই ভেবে যে তিনি কেন মানুষের আবেগ পড়তে এবং সহানুভূতি দেখাতে পারেন না।

আরও পড়তে পারেন:

ডাক্তার 'মুখে বলতে পারেননি ছেলে অটিজমে আক্রান্ত'

কিভাবে অটিজম শনাক্ত করবেন?

অটিজম নিয়ে এখনো কেন মানুষের ধারণা বদলাচ্ছে না?

"আমার নিজেকে ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হতো"

তার মনে টুকরো টুকরো হয়ে থাকা এই প্রশ্নগুলোর কোন উত্তর পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে অটিজম সম্পর্কে একটি টিভি অনুষ্ঠান দেখার পর, সেই টুকরোগুলো জোড়া লাগতে থাকে।

"অটিস্টিক লোকদের সম্পর্কে আমার এক ধরণের গৎবাঁধা ধারণা ছিল। আমি ভাবতাম তারা পুরোপুরি অক্ষম এবং মানুষের সাথে তাদের যোগাযোগ করার কোন ক্ষমতা নেই। কিন্তু তারা আবার কম্পিউটার চালাতে ভীষণ দক্ষ।

"তবে ওই প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায় যে, পুরোপুরি স্বাভাবিক মনে হওয়া ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটিজম ধরা পড়েছে। তাদের সাথে নিজের নানা দিকের মিল পাওয়ার পর তিনি যেন বিষয়গুলো নতুনভাবে বুঝতে শুরু করেন।"

রবার্ট তার স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটিজম নির্ণয়ের বিষয়টি জানতে পেরে "অত্যন্ত স্বস্তি" অনুভব করেন।

"অবশেষে আমার কাছে এমন একটি নাম আছে যা আমাকে এতদিন ধরে ভিনগ্রহের প্রাণীর মতো অনুভব করিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমি সবার থেকে আলাদা হওয়ার খারাপ লাগা থেকে মুক্তি পেলাম।"

ছবির কপিরাইট ROBERT GREENALL
Image caption ছোটবেলায় রবার্ট অন্য শিশুদের থেকে নিজেকে আলাদা মন করতেন।

বার্নি এবং রবার্ট সেইসব প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাত্র দু'জন যারা অন্যদের থেকে কেন আলাদা, সেটা না জেনেই জীবনের বেশিরভাগ সময় পার করে দিয়েছেন।

১৯৮০ সালে অটিজমকে প্রথমে একটি মানসিক ব্যাধি হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। আর আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের হয়তো স্বাস্থ্য পরীক্ষাই হতো না, অথবা ভুলভাবে পরীক্ষা করা হতো।

"যুক্তরাজ্যে প্রায় সাত লাখ মানুষকে অটিস্টিক বলে মনে করা হয় এবং সবসময় এর চাইতে বেশি মানুষের মধ্যে সেটা পরীক্ষায় ধরা পড়ে," ন্যাশনাল অটিস্টিক সোসাইটির নীতি ও জনসংযোগ বিষয়ক ব্যবস্থাপক অ্যানা বেইলি-বিয়ারফিল্ড বলেছেন।

আরও অনেক সময় এই রোগ নির্ণয় করা হয়।

"অটিজম প্রায়শই কেবল বাচ্চাদের হয় বলে দেখা যায় তবে এখন অনেক প্রাপ্ত বয়স্ক অটিস্টিক টিভিতে আসছেন এবং তারা এমন অনেক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন।"

"৪০ বা ৫০ বছর ধরে না জানার প্রভাব "খুব দুঃখজনক হতে পারে", বলেন মিস বিয়ারফিল্ড, "এতে ওই মানুষগুলো উদ্বিগ্ন এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করে।"

জাতীয় নির্দেশিকা বলছে যে মানুষ যদি এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পেতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যায় তাহলে সেটা নির্ণয়ের জন্য ১৩ সপ্তাহের বেশি অপেক্ষা করানো উচিত হবে না।

তবে ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার জরিপে দেখা যায় যে, মানুষকে এরচেয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

ছবির কপিরাইট ROBERT GREENALL
Image caption রবার্ট একমাত্র সন্তান ছিলেন।

'আমি জীবন নিয়ে এগিয়ে যেতে পারিনি'

রবার্টের ক্ষেত্রে সময় লেগেছিল প্রায় ১৮ মাস, তাও সেটা সম্ভব হয়েছে অনেক ফোন কল এবং অনেক বার হতাশ হওয়ার পর।

অবশেষে তিনি একটি প্রাইভেট পরীক্ষার জন্য যান, যার জন্য তার খরচ পড়েছিল প্রায় ১৯০০ ডলার।

"আমি কেবল এই অপেক্ষা শেষ করতে চেয়েছিলাম। আমি মনে হয়েছে যে, এভাবে ঝুলে থাকলে আমি আমার জীবন নিয়ে এগিয়ে যেতে পারব না।"

তার সেই দিনটির কথা এখনও স্পষ্টভাবে মনে পড়ে - তাকে ছয় ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল।

"প্রশ্নকর্তাদের অনেকেই আমাকে অনেক আগের ভুলে যাওয়া শৈশবের স্মৃতি মনে করতে বলেছিলেন - যেমন, আমি কোন ধরণের জিনিষ স্পর্শ করতে পছন্দ করতাম? আমি কি হাস্যকরভাবে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে যেতাম?"

ফলাফলে দেখা যায় যে আমার অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার নির্ণয় হয়েছে।

"এর চেয়ে সুনির্দিষ্ট ফলাফল আর কিছু হতে পারে না। -তবে এই অটিজমের সংজ্ঞা নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে, তাই অনেক বিশেষজ্ঞ এখনও এই শব্দটি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে চান," তিনি বলেন।

তবে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার নির্ণয়ের এই বিষয়টি মানুষের বাকি জীবনে ভীষণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, অ্যাংলিয়া রাসকিনের গবেষণা থেকে এমনটা জানা গেছে।

Image caption বার্নি বলেন যে এই পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর তিনি যেন নিজের ভেতর আরেকটি মানুষকে খুঁজে পান।

ডঃ স্টিভেন স্ট্যাগ, ৫০ বছরের বেশি বয়সী অন্তত নয় জন ব্যক্তির সাক্ষাতকার নিয়েছেন।

তিনি বলেন, "এই পরীক্ষা তাদেরকে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম থেকে মুক্তি দিয়েছে এবং নিজের আত্ম-পরিচয়কে নতুন করে গঠন করতে সাহায্য করেছে।"

"একজন মানুষের জন্য এটি এক ধরণের ইউরেকা মুহূর্তের মতো - আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ওইরকম অদ্ভুত হওয়ার পেছনে আমার কোন দোষ নেই"। আবার অনেকে, এতদিন "কী ভুল হয়েছিল বা কেন ভুল হয়ে এসেছে তা জেনে স্বস্তি পেয়েছেন"।

তবে প্রায়শই তাদের প্রচুর অনুশোচনা কাজ করে।

হেলথ সাইকোলজি এবং বিহেভিওরাল মেডিসিন অধ্যয়নের জন্য বার্নির সাক্ষাতকার নেয়া হয়, এতে বার্নি যে বিষয়টা উপলব্ধি করেন তা হল, তার কাছের অনেক মানুষ, এমন সমস্যা ভোগ করছে।

"যখন আমি পেছনের কথা মনে করি, আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে আমি একজন শিক্ষক ছিলাম - আমার আত্মবিশ্বাস অনেক কম ছিল, লোকজনের সাথে সেভাবে যোগাযোগ করতে পারতাম না। এবং তিনি তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি বাবা হিসেবেও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছিলেন, তার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছিল এবং সম্পর্কে চিড় ধরতে শুরু করে।"

তবে তার এস্পারগার নির্ণয়, জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মতো ছিল।

"ওই স্বাস্থ্য পরীক্ষাটি আমার নিজের ভেতরে একটি ভিন্ন সংস্করণ খুঁজে পেতে সাহায্য করে," তিনি বলেন।

একসময় আমাকে বন্ধুত্ব করার জন্য লড়াই করতে হতো, আর এখন আমার শত শত বন্ধু রয়েছে - এখন আমি নিজের ব্যাপারে সব জানি, এবং তা বলতে পারি।

এখন তার লক্ষ্য হল অটিজম নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞ লেখক, গবেষক, প্রশিক্ষক এবং শিক্ষকদের জন্য উৎসবের আয়োজন করা।

এর আগেও তিনি তার কলেজের সাবেক শিক্ষকদের নিয়ে উৎসব আয়োজন করে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।

বার্নি এখন নিজের সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। এখন তিনি নিজের অনুভূতির কথা বলতে পারেন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption কাঁচা মাছের আবরণ বার্নি পছন্দ করেন।

মাছ এবং শার্ট

উদাহরণস্বরূপ, বার্নি কাঁচা মাছের আবরণ বা টেক্সচার পছন্দ করতেন এবং সবসময় তার মায়ের জন্য এই মাছগুলো কাটতে চাইতেন।

"আমি আমার পুরো সময় ওই অনুভূতির কথা মনে করে কাটাতাম।"

"মাছের মধ্যেও একটা দানা দানা ভাব রয়েছে, সেটা মুরগিতেও আছে। সেটা আপনি কতোটা অনুভব করবেন তা নির্ভর করবে আপনি সেটা কিভাবে কাটছেন তার ওপরে। এই অনুভূতিটি অন্যরকম। আমার খুব ভাল লাগতো।"

বার্নি তার শার্টগুলি ধরে ধরে প্রশান্তি খুঁজে পেতেন। তিনি যে শার্টটি পরতেন সেটার সেলাই বরাবর হাত বোলাতেন।

এরকম অন্তত ২৫টি ছোট ছোট ভাল লাগার বিষয় তার আছে। এই ভাল লাগার বিষয়গুলো এখন তিনি জানেন যা তার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

রবার্ট এখন, তার এই অটিজম এবং এর প্রভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন - তবে যখন এক বন্ধু তাকে বলেন যে, এমন বৈচিত্র্যময় স্নায়ু বা নিউরোডাইভার্স বন্ধু পেয়ে তিনি খুব গর্বিত" তখন রবার্ট খুব খুশি হন।

ছবির কপিরাইট Getty Images

অটিজম কী?

অটিজম মূলত তিনটি বিষয়ে প্রভাব ফেলে, যেমন কোন ব্যক্তি কীভাবে অন্য ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করে, একে অপরের সাথে কীভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং কীভাবে তারা বিশ্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করে।

অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অন্যদের থেকে বিশ্বকে ভিন্নভাবে দেখেন, শোনেন এবং অনুভব করেন।

তাদের পক্ষে নিচে উল্লেখিত বিষয়গুলো বোঝা কঠিন হতে পারে:

১. মুখের অভিব্যক্তি বা কণ্ঠের অভিব্যক্তি বুঝতে সমস্যা হয়।

২. বন্ধুত্ব করা কঠিন মনে হয়।

৩. শব্দ, স্পর্শ এবং আলোর প্রতি সামান্য বা অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে থাকে।

৪. সবসময় রুটিন মেনে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাজ করতে পছন্দ করেন।

৫. তাদের দেখতে অনেক সংবেদনশীল বলে মনে হয়।

৬. অদ্ভুত আচরণ করতে দেখা যায়।

একজন মানুষের অবস্থা অন্যের থেকে একেবারেই আলাদা হতে পারে এজন্য প্রত্যেকের আলাদা ধরণের মনোযোগ প্রয়োজন।

কারও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে এবং শেখার অক্ষমতা আছে।

জাতীয় অটিস্টিক সোসাইটি এবং ব্রিটেনের এনএইচএস প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অটিজম নির্ণয় সম্পর্কে এসব তথ্য দিয়েছে।