বিবিসি বাংলা রেডিও: এক যুগ পরে সকালের প্রত্যুষা বন্ধ , ফিরছে রাতের পরিক্রমা

বাংলাদেশী পাঠক তৎকালীন বিরোধী নেতা শেখ হাসিনার পোস্টারের সামনে জরুরী অবস্থার খবর জানছেন, ১২-০১-২০০৭। ছবির কপিরাইট JEWEL SAMAD
Image caption বাংলাদেশী পাঠক তৎকালীন বিরোধী নেতা শেখ হাসিনার পোস্টারের সামনে জরুরী অবস্থার খবর জানছেন।

জানুয়ারি মাসের ১১ তারিখ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। তের বছর আগে এই দিনে সামরিক বাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদ পদত্যাগ করেছিল, এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াজুদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এর পর টানা দু'বছর চলে জরুরি অবস্থার ভিত্তিতে পরোক্ষ সামরিক শাসন। দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে 'ওয়ান ইলেভেন' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে (আমেরিকায় 'নাইন-ইলেভেন'-এর আদলে)।

তবে ১১ই জানুয়ারি সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে বিবিসি বাংলার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। তের বছর আগে এই দিন সকালের দ্বিতীয় অধিবেশন 'প্রত্যুষা'-র যাত্রা শুরু হয়।

কাকতালীয় ভাবে, তের বছর পর একই দিন, অর্থাৎ ২০২০ সালের ১১ই জানুয়ারি 'প্রত্যুষা-র শেষ পর্ব প্রচারিত হল। এক যুগ পার হল, বলা যায় একটি যুগের অবসান হল।

প্রত্যুষা শুরুর পরে অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন ১১ তারিখে কী ঘটতে যাচ্ছে তা সম্পর্কে বিবিসি আগে থেকেই জানতো। কিন্তু সেটা পুরোপুরিই ভ্রান্ত ধারণা।

ঘটনা প্রবাহ যে খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলো, সেটা আমরা জানতাম, এবং আমার মনে হয় ঢাকায় কর্মরত অনেক সাংবাদিকই ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে আনা-গোনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন।

কিন্তু ঠিক ১১ তারিখেই যে সামরিক হস্তক্ষেপ হবে এবং দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আরেকটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, তা আমাদের জানা ছিল না।

ছবির কপিরাইট Peter Macdiarmid
Image caption বুশ হাউস: যে ভবন থেকে বিবিসি বাংলার প্রত্যুষা ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি প্রথম প্রচার করা হয়।

কিন্তু জানা না থাকলেও, ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারিতে নতুন অধিবেশন শুরু করার সুফল আমরা দ্রুত পেতে থাকি।

যদিও প্রথম দিনের প্রত্যুষা মোটামুটি সাদা-মাটা একটি অনুষ্ঠান ছিল, পরের দিন ভোর সাড়ে ছ'টার প্রভাতী আর সাড়ে সাতটার প্রত্যুষায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া প্রচার করা সম্ভব হয়েছিল।

প্রত্যুষায় জামাতে ইসলামীর তৎকালীন প্রধান মতিউর রহমান নিজামীর লাইভ সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয় যেখানে তিনি বেশ কড়া ভাবেই পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা করেন।

আবার গোড়ার দিকে ফিরে যাই। একটা কিছু ঘটতে পারে, সেটার জন্য আমাদের আরো অনুষ্ঠান দরকার, এই সব কথা মাথায় রেখে প্রত্যুষা শুরু করা হয়নি। প্রত্যুষার পেছনে কারণটা একটু সাদা-মাটা।

বিবিসি বাংলা প্রথম 'প্রভাতী' নামে একটি সকালের অনুষ্ঠান শুরু করে ১৯৬৯ সালে।

তখন শর্ট ওয়েভে বিবিসির তিনটি ভাষা বিভাগের অনুষ্ঠান - হিন্দি, উর্দু এবং বাংলা, পর পর প্রচার হতো। শুরুতে বাংলা, যেহেতু দক্ষিণ এশিয়ায় সূর্যোদয় বাংলাদেশেই প্রথম হয়, তারপর হিন্দি এবং উর্দু।

Image caption ঢাকায় প্রত্যুষা, ২০১১ থেকে ২০২০: শাহনাজ পারভিন আর আকবর হোসেন পত্রিকা পর্যালোচনা করছেন।

তিনটি অনুষ্ঠানের জন্য স্থানীয় সময় সাড়ে ছয়টা বেছে নেয়া হয় এই ভেবে যে, শ্রোতারা, বিশেষ করে গ্রামীণ শ্রোতারা অনেক ভোরেই কাজ শুরু করেন।

কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেল বাংলাদেশে সকালে যারা রেডিও শোনেন, তাদের বেশির ভাগ শোনেন সকাল সাতটা থেকে আটটার মধ্যে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে।

অর্থাৎ শুধুমাত্র ভোর সাড়ে ছ'টায় অনুষ্ঠান রেখে আমরা অনেক শ্রোতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলাম।

ঢাকায় ১৯৯৪ সাল থেকেই এফএম-এ বিবিসির অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছিল। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকেই অন্যান্য শহরে এফএম-এ অনুষ্ঠান দেয়ার জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনাও শুরু হয়ে যায়।

কাজেই শহুরে শ্রোতাদের কথা মাথায় রেখে অনুষ্ঠান সাজানোর চিন্তা-ভাবনা চলছিল।

কিন্তু সকাল সাতটায় নতুন অনুষ্ঠান দেয়া সম্ভব হল না, যেহেতু বাংলাদেশ বেতার তাদের সকালের খবর ঠিক ঐ সময়ে এফ এম তরঙ্গ প্রচার করে।

তখন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সাড়ে ছ'টার প্রভাতী বহাল রেখেই সাড়ে সাতটায় নতুন অধিবেশন শুরু করা হবে। যাতে গ্রামীণ এবং শহুরে শ্রোতাদের কেউ বঞ্চিত না হয়।

তারিখটা যখন বাছাই করা হয় তখন কোন পঞ্জিকা দেখে সেটা করা হয়নি, বা জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী শুনেও করা হয়নি। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল, কাজেই আর দেরী না করে ১১ তারিখ বৃহস্পতিবার প্রত্যুষা শুরু করা হয়।

ছবির কপিরাইট Peter Macdiarmid
Image caption রেডিওর জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে।

তের বছর পর এই অধিবেশন বন্ধের মধ্য দিয়ে সকালে বিবিসি বাংলার উপস্থিতি পুরোপুরিই গুটিয়ে নেয়া হচ্ছে। জিনিসটা কি ভাল হল? মোটেই না।

ইউরোপ বা আমেরিকায় আজ-কাল মানুষ সকালেই রেডিও শোনেন, রাতে দেখেন টেলিভিশন, আর সারা দিন কাজ করেন বা মোবাইল ডিভাইস, ডেস্কটপ-এ ইন্টারনেট ঘাঁটেন।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন।

বাংলাদেশে দু'একটি প্রতিষ্ঠান নির্ভরযোগ্য জরিপ করে থাকে, যেখান থেকে মিডিয়া ব্যবহারের একটি বিশ্বাসযোগ্য চিত্র পাওয়া যায়। চিত্রটি রেডিওর জন্য দিনকে দিন মারাত্মক আকার ধারণ করছে।

গত বছর বিবিসির জন্য করা এক জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশে এক কোটির কিছুটা বেশি মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার রেডিও শুনছেন। এই সংখ্যা দু'বছর আগে ১৩ শতাংশ বেশি ছিল।

খুব বেশি সময় না, মাত্র ২০ বছর আগেও বাংলাদেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ রেডিও শুনতেন। আজ সেই সংখ্যা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন - ১২ শতাংশে।

আর যারা শুনছেন, তাদের বেশির ভাগই রেডিও খোলেন রাতে - ৭টা থেকে ১২টার মধ্যে। সকালে শ্রোতা নেই, তা বলছি না। আছে। কিন্তু রাতের তুলনায় অনেক কম।

বাংলাদেশে শুধুমাত্র একটি মাধ্যমের ব্যবহার দিনকে দিন বাড়ছে, আর তা হল ডিজিটাল মাধ্যম। সামাজিক মাধ্যম, বিশেষ করে একদিকে ফেসবুক অন্যদিকে ভিডিও-নির্ভর ইউ টিউব ওপর ভর করেই এই মাধ্যম দ্রুত এগিয়ে চলছে।

কোন সন্দেহ নেই, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ডিজিটাল মাধ্যম খবর দেখার, শোনার এবং পড়ার সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম হতে যাচ্ছে।

বিবিসি বাংলা সেজন্য বছর খানেক আগে ডিজিটাল কনটেন্ট বাড়ানোর জন্য সকালের প্রভাতী এবং রাতের পরিক্রমা বন্ধ করে দেয়। তাতে আমাদের ডিজিটাল আউটপুট বৃদ্ধি পায় ঠিকই। কিন্তু রেডিও শ্রোতা সংখ্যায় রীতিমত ধ্বস নামে!

এর ফলে আমাদের স্ট্রাটেজীতে কোন পরিবর্তন আনা হয় নাই। কারণ, লক্ষ্য হচ্ছে ডিজিটালে সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখা। ভবিষ্যৎ তো সেখানেই। অনলাইন টেক্সট এবং ভিডিও, আর সামাজিক মাধ্যম অডিয়েন্সের কাছে দেগুলো পৌঁছে দেবার তরী।

তাহলে রেডিওর কি আর কোন ভূমিকা নেই? অবশ্যই আছে।

আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশে রেডিওর মাধ্যমে খবর এবং আলোচনার চাহিদা এখনো আছে, তবে সেটা সকালে না।

বিবিসি বাংলা ২০১৫ সাল থেকে তিন প্লাটফর্মে এক যোগে কাজ করছে - রেডিও, টেলিভিশন এবং ডিজিটাল। নতুন পরিস্থিতিতে নতুন করে ভাবনা শুরু হল এবং দেখা গেল যে এখানে নতুন করে পরিবর্তন এনে দু'দিক থেকে লাভবান হবার সম্ভাবনা আছে।

সকালের বাকি রেডিও, প্রত্যুষা, বন্ধ করলে তিনজন সাংবাদিককে অন্যত্র নিয়োজিত করা যায়। অর্থাৎ আমাদের ডিজিটাল কনটেন্টে বড় রকমের সম্প্রসারণ এবং মানগত উন্নয়ন আনা সম্ভব।

একই সাথে, রাতের পরিক্রমা ফিরিয়ে এনে যারা সন্ধ্যায় রেডিও শোনার সময় পান না, তাদের জন্য বিবিসি শোনার অপশনটা তৈরি করা সম্ভব। এর ফলে আমাদের শ্রোতা সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে কি না, তা বছর দুয়েক পরে নতুন জরীপ না হওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব না।

এই পরিবর্তনের ফলে লন্ডন থেকে নিয়মিত ডিজিটাল কনটেন্ট, বিশেষ করে ভিডিও, সেটা সাক্ষাৎকার বা ফেসবুক লাইভ বা এক্সপ্লেইনার হোক, তৈরি করা সম্ভব হবে।

পডকাস্টিং, বা ডিজিটাল মাধ্যমে অডিও কনটেন্ট সম্প্রচার-এ আমরা অনেক দিন পিছিয়ে ছিলাম। এবার সেই ঘাটতিটাও পূরণ করা সম্ভব হবে।

আর ঢাকায় ভিডিও কনটেন্ট প্রায় দ্বিগুণ করা যাবে এবং অনুসন্ধানী রিপোর্টিং-এর সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আপাতদৃষ্টিতে সবই ঠিক আছে, প্রতিটি পদক্ষেপ ভবিষ্যতমুখী। বেদনা শুধু একটিই, সকালে বিবিসি বাংলার কোন রেডিও অনুষ্ঠান আর থাকবে না।