ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাতের অভিযোগে রিমান্ডে এক বয়াতি: প্রতিক্রিয়া কী হবে?

শরিয়ত সরকার বয়াতির গানের বিভিন্ন ভিডিও ইউটিউবে দেখা যায় ছবির কপিরাইট ইউটিউব
Image caption শরিয়ত সরকার বয়াতির গানের বিভিন্ন ভিডিও ইউটিউবে দেখা যায়

বাংলাদেশে একজন বয়াতী বা বাউল শিল্পীকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতারের ঘটনায় লোকসংগীত শিল্পীদের অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেকে এর নিন্দা জানিয়ে প্রতিবাদ করছেন।

পুলিশ বলেছে, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে এক অনুষ্ঠানে গানের আগে দেয়া বক্তব্যে শরিয়ত সরকার নামের এই বয়াতী ইসলামের নবী এবং ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করেছেন - এমন অভিযোগে এলাকায় বিক্ষোভ হয় এবং স্থানীয় এক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

সেই মামলার জের ধরেই মি. সরকারকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

গ্রেফতারের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদকারীরা বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে লোক সংগীতের বিকাশ এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আবারও বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলো।

শরিয়ত সরকার বয়াতির বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের আগধল্যা গ্রামে। একই গ্রামের ফরিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগ এনে মামলা করেছিলেন।

মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে যে, শরিয়ত সরকার বয়তি কয়েকদিন আগে ঢাকার ধামরাই এলাকায় এক অনুষ্ঠানে গানের আগে বক্তব্যে বলেছিলেন, গান-বাজনা হারাম বলে ইসলাম ধর্মে কোনো উল্লেখ নেই। কেউ প্রমাণ দিলে তিনি গান ছেড়ে দেবেন। সেই বক্তব্যের ভিডিও ইউটিউবে দেখেই বাদী এ মামলাটি করেছেন।

বয়াতিকে গ্রেফতারের পর টাঙ্গাইলের পুলিশ রোববার তাকে স্থানীয় আদালতে হাজির করে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়।

মির্জাপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইদুর রহমানের বক্তব্য হচ্ছে, স্থানীয়ভাবে ইসলামপন্থী বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভ এবং ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করার অভিযোগে মামলার কারণেই এই বয়াতিকে গ্রেফতার করে অভিযোগের তদন্ত করা হচ্ছে।

"আল্লাহ, নবী, রাসুল নিয়ে এবং হুজুর সমাজ নিয়ে ৫৯ মিনিটের একটা বক্তব্য দিছে গান গাইতে যাইয়া, ঐ বক্তব্যে প্রেক্ষিতে হুজুর সমাজ বা আলেম সমাজ বিরাট বিক্ষোভ মিছিল করছে এবং গ্রেফতার করার জন্য আমাদের আলটিমেটাম দিছে। তারা মামলাও করেছে। সেজন্য বয়াতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।"

'লোকজ গানের শিল্পী গ্রেফতার হওয়াটা এক বড় আঘাত'

এ ঘটনায় শিল্পীদের অনেকে তাদের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একজন লোকজ সংগীত শিল্পীকে গ্রেফতার করায় তারা অবাক হয়েছেন।

তারা মনে করেন, যুগ যুগ ধরে লোকজ শিল্পীরা গানের ভাব বা কথা ব্যাখ্যা করার পর সেই গান পরিবেশন করেন। একে কেন্দ্র করে এমন গ্রেফতারের ঘটনাকে একটা বড় আঘাত হিসেবে তারা দেখছেন।

আধুনিক এবং লোকজ গানের শিল্পী কৃষ্ণকলি ইসলাম বলছিলেন, "কবিগানের লড়াই- এটাতো চিরন্তন শরিয়ত এবং মারফতির একটা লড়াই।"

তিনি বলেন, "এই লড়াইটা বুদ্ধির চর্চার মাধ্যমেই হতো। কিন্তু এবার যেটা হলো, তাতে আবার প্রমাণ হলো যে আমাদের এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বার বার আহত হচ্ছে।"

আরো পড়তে পারেন:

হেফাজতে ঈমানের দাবির মুখে লালন অনুষ্ঠান বন্ধ

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বাউল গানের একটি আসর

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তাদের মধ্যে লীনা পারভিন নামে একজন বলছিলেন, এই গ্রেফতারের ঘটনাকে তিনি পুরো সঙ্গীত জগতের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন।

"এই বয়াতির যে বক্তব্য, সেটা হচ্ছে ইসলামে গানকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, সেটা তুলে ধরেছেন। কারণ আমাদের সমাজে এক ধরণের একটা অপব্যাখ্যা আছে। বয়াতি তার স্টাইলে তার বক্তব্যটা দিয়েছেন।"

"তিনি কিছু প্রশ্ন করেছেন, যার জবাব যুক্তির মাধ্যমে দেয়া যেতো। কিন্তু তা না করে এই গ্রেফতারের মাধ্যমে তাহলে প্রতিষ্ঠা করা হলো যে, এই সমাজে কেউ গান গাইতে পারবে না, বা কেউ কি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে না?"

বাউল-বয়াতিরা কি এ ঘটনায় ভীত হয়ে পড়বেন?

বাংলা একাডেমির লোকসঙ্গীত গবেষক সাইমন জাকারিয়া এ ব্যাপারে বিবিসি বাংলাকে বলেন, গ্রামের মানুষ থানায় যেয়ে একজন শিল্পীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এর সঙ্গে অন্য ব্যাপার জড়িত - এটা শুধু ধর্মের সাথে শিল্পীর দ্বন্দ্ব না।

বাংলাদেশে একসময় এসব বিষয় নিয়ে সিনেমায় গান গাওয়া হয়েছে, কিন্তু এমন অসহিষ্ণুতা দেখা যায় নি। এখন তাহলে কী পরিবর্তন হয়েছে?

এ প্রশ্ন করা হলে সাইমন জাকারিয়া বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী ব্যাপক ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে, আমাদের সাংস্কৃতিক মনস্তত্ব পরিবর্তিত হয়ে গেছে, আমাদের শিক্ষায় ও প্রশাসনে এসব বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে। হয়তো প্রশাসন যন্ত্রই এ গানকে খুব ভালো চোখে দেখছেন না।

বাউল বা বয়াতিদের ওপর এ ঘটনার কতটা প্রভাব পড়বে ? এ প্রশ্ন করা হলে সাইমন জাকারিয়া বলেন ভয়টা সেখানেই। তাদের ওপর মানসিক চাপ পড়বে, তবে তারা থেমে যাবে বলে আমার মনে হয় না।

কী বলছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী?

এসব সমালোচনা-নিন্দা বা অভিযোগ মানতে রাজি নন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ।

তিনি বলেছেন, ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতের অভিযোগ এলে সেখানে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে।

"স্বাভাবিক বিকাশের পথে এই সরকার কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। লোকজ সংস্কৃতিসহ সব কিছুর পৃষ্ঠপোষকতা এ সরকার করছে। এখন যদি ধর্মীয় অনুভূতিতে কোনো আঘাত দিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে আমি হলেও আইনের আওতায় আসবো। কারণ আইন সবার জন্য সমান।"

এদিকে, গ্রেফতারকৃত শরিয়ত সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আইনজীবী নিয়োগ না করায় তার দিকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় নি।

সম্পর্কিত বিষয়