ইরান আমেরিকা: বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় সামরিক বাহিনীর পক্ষে সাফাই দিলেন খামেনি

আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তার মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয়। ছবির কপিরাইট EPA
Image caption আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তার মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

ভুল করে একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা স্বীকার করার পর ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষেই সাফাই দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

তিনি বলেন, রেভল্যুশনারি গার্ড অর্থাৎ দেশটির এলিট ইউনিট যেটি কিনা বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার জন্য দায়ি- তারা ইরানের "নিরাপত্তা বজায়" রেখেছে।

এই ঘটনাটি সামাল দেয়া নিয়ে ইরানের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ এবং অন্য রাষ্ট্রগুলোর সমালোচনা ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

কিন্তু ২০১২ সালের পর প্রথমবার তেহরানে প্রথম শুক্রবারের নামাজে ইমামতি করে দেয়া ভাষণে তিনি কিছুটা সমর্থন টানার চেষ্টা করেন।

গত ৮ই জানুয়ারি উড্ডয়নের কিছু পরেই বিধ্বস্ত হওয়া ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমানটি তেহরান থেকে কিয়েভে যাচ্ছিল। বিমানের ১৭৬ জন আরোহীর সবাই নিহত হয়। যাদের মধ্যে ইরান, কানাডা, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্যের নাগরিক ছিল।

আয়াতোল্লাহ "জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন" এবং বলেন ইরানের "শত্রুরা"- যা বলতে তিনি ওয়াশিংটন ও এর মিত্রদের বোঝান- বিমান ভূপাতিতের ঘটনাকে ব্যবহার করে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যাকে ধামাচাপা দিতে চাইছে।

"বিমান বিধ্বস্ত নিয়ে আমরা যতটাই দুঃখ পেয়েছি আমাদের শত্রুরা ততটাই খুশি হয়েছে,"তিনি বলেন।

"তারা খুশি কারণ তারা গার্ড এবং সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার কোন একটা অজুহাত পেয়েছে।"

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তেজনার মধ্যে প্রাথমিকভাবে ইরানের কর্তৃপক্ষ দায় অস্বীকার করে কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রেভল্যুশনারি গার্ড স্বীকার করে যে, বিমানটিকে "ক্রুস মিসাইল" ভেবে ভুল করা হয়েছিল।

আরো পড়তে পারেন:

ইরান-আমেরিকা সংঘাতে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা কোথায়

ইরানের বিরোধী দলগুলো কতটা শক্তিশালী?

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption শুক্রবারের নামাজের ইমামতি করছেন আয়াতোল্লাহ খামেনি

বিমানটিকে ভূপাতিত করার কয়েক ঘণ্টা আগে, সোলেইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইরাকে মার্কিন দুটি বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।

ওয়াশিংটন প্রাথমিকভাবে জানায় যে, কেউই হতাহত হয়নি, কিন্তু পরে জানায় যে, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কয়েক দিন পর প্রচণ্ড ধাক্কাজনিত আঘাতের কারণে ১১ জনকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে।

আয়াতোল্লাহ আরো কী বলেছে?

রাজধানীর মোসাল্লা মসজিদ থেকে জাতীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন ৮০ বছর বয়সী আয়াতোল্লাহ খামেনি। শেষবার তিনি এ ধরণের ভাষণ দিয়েছিলেন ২০১২ সালে দেশটির ইসলামি বিপ্লবের ৩৩ বছর পূর্তিতে।

ওয়াশিংটন ইন্সটিটিউট ফর নেয়ার ইস্ট পলিসির মেহদি খালাজি বলেন, রাজধানীতে শুক্রবারের নামাজের ইমামতি করার আলাদা গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। সাধারণত তখনই এটি করা হয়, যখন ইরানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ কোন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে চান।

ঐতিহাসিকভাবে, ইরানের নেতারা সাধারণত অনুগত আলেম যারা ভাল বক্তৃতা দিতে পারেন- এমন আলেমদের ইমামতি করার দায়িত্ব দিয়ে থাকেন।

সামরিক বাহিনীর পক্ষে সাফাই ছাড়াও আয়াতোল্লাহ আরো যা বলেন তা হলো:

•যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের "অশুভ" প্রশাসনের সমালোচনা করেন এবং প্রেসিডেন্টকে তিনি "ভাঁড়" বলে উল্লেখ করেন।

•ইরানের জনগণকে সমর্থন দেয়ার ঘটনাকে ওয়াশিংটনের "মিথ্যা" বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র "তার বিষাক্ত ছুরি দিয়ে তাদের আঘাত করবে"

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption কাসেম সোলেইমানির ছবির নিচে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেয় হাজার হাজার মানুষ।

•ইরাকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যুক্তরাষ্ট্রের "মুখে থাপ্পড় মারা"র সামিল

•ইরানের এলিট কুদস বাহিনী সম্পর্কে বর্ণনা করেন- যাকে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী সংগঠন বলে উল্লেখ করে থাকে, তিনি একে "মানবিক মূল্যবোধের মানবিক সংস্থা" বলে উল্লেখ করেন।

•সোলেইমানির শেষকৃত্য এবং ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়াকে "ইতিহাসের মোড় ঘুড়িয়ে দেয়া" ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।

•২০১৫ সালের পারমানবিক চুক্তিরে বিষয়ে বিদ্যমান বিবাদটিকে আরো বেশি উস্কে দেয়ার জন্য জার্মানি ও ফ্রান্সের সাথে সাথে ব্রিটিশ সরকারকে "খারাপ" বলে উল্লেখ করেন।

এর প্রতিক্রিয়ায়, ইরান বিষয়ক মার্কিন সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি ব্রিয়ান হুক বলেন, ইরান ততদিন একঘরে হয়ে থাকবে যতদিন তারা "বিশ্বকে হুমকির মুখে রাখবে।"

বিমান বিধ্বস্তের তদন্তের কি অবস্থা?

তদন্তের বিষয়ে আলোচনা করতে ওমানের মাসকটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করবেন কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া ফিলিপ শ্যাম্পেন

শুক্রবার এক ভাষণে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো অভ্যন্তরীণ ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়ে বলেন যে, বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত কানাডার নাগরিক কিংবা স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বজনকে ১৪ হাজার ৭০০ পাউন্ড করে দেয়া হবে।

তিনি বলেন, কানাডা আশা করে যে, ইরান নিহতদের স্বজনদেরকে আর্থিকভাবে ক্ষতিপূরণ দেবে।

"আমি তাদের সাথে দেখা করেছি এবং তারা সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করতে পারবে না। তাদের এখন সহায়তা দরকার," অটোয়াতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

লন্ডনে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্যাম্পেন, অন্য চারটি দেশ- বিমান বিধ্বস্তে যাদের নাগরিক মারা গেছে এমন চার দেশের মন্ত্রীদের সাথে এক বৈঠকের পর এই ঘোষণা আসলো।

সম্পর্কিত বিষয়