রোহিঙ্গা ট্রলারডুবি: নিখোঁজ ৫০ জনকে জীবিত পাওয়ার আশা ত্যাগ করেছেন উদ্ধারকর্মীরা

রোহিঙ্গা, ট্রলারডুবি, টেকনাফ, কক্সবাজার। ছবির কপিরাইট বাংলাদেশ নৌবাহিনী
Image caption উদ্ধার হওয়াদের একাংশ

বাংলাদেশের সেন্টমার্টিনে রোহিঙ্গা বোঝাই ট্রলার ডুবে যাওয়ার ঘটনায় নৌবাহিনীর উদ্ধারকারীরা এখন জীবিত কাউকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন।

নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখনও ৫০জনের মতো নিঁখোজ রয়েছে। এখন তাদের অন্তত মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

ওদিকে, কক্সবাজারের পুলিশ অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ৮জন মানব-পাচারকারীকে আটক করেছে।

সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের চেষ্টার অভিযোগ এনে ১৯জনকে অভিযুক্ত করে মামলা করা হয়েছে।

সেন্টমার্টিনে ট্রলারডুবির ঘটনার প্রায় ২৪ ঘন্টা পর গত মধ্যরাতে একজন যাত্রী সাঁতরে ফিরে আসেন। এনিয়ে এই ট্রলারের উদ্ধার হওয়া জীবিত যাত্রীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩জনে।

এখনও যে ৫০ জনের মতো নিঁখোজ রয়েছে, তাদের মধ্যে আর কাউকে জীবিত উদ্ধারের আশার করছেন না উদ্ধারকারিরা।

উদ্ধার অভিযানে থাকা নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জাহিদুল ইসলাম বলছিলেন, যাতে অন্তত মৃতদেহ পাওয়া যায় এখন সেই চেষ্টা তারা করছেন।

"কাউকে জীবিত উদ্ধারের আশা খুব ক্ষীণ। যদি কাউকে পাওয়া সম্ভবও হয়, সেটা কারও লাশ ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ এতক্ষণ সমুদ্রে টিকে থাকা খুব কঠিন।"

ছবির কপিরাইট বাংলাদেশ নৌবাহিনী
Image caption ডুবে যাওয়া ট্রলারটি গত মঙ্গলবারই উদ্ধার করা হয়েছে।

সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের চেষ্টার সময় গত মঙ্গলবার ভোররাতে এই ট্রলার ডুবে যাওয়ার পর যে ১৫ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের ১১জনই রোহিঙ্গা নারী এবং বাকিরা শিশু।

জীবিত উদ্ধার হওয়াদের মধ্যেও রোহিঙ্গা নারীর সংখ্যা বেশি।

এছাড়া নিঁখোজদেরও বেশিরভাগই রোহিঙ্গা নারী বলে পুলিশ ধারণা করছে।

টেকনাফের একটি ক্যাম্পের বসবাসকারি রোহিঙ্গা নারী শাহেদা বেগমের ১৫ বছর বয়সী মেয়ে তার সাথে রাগ করে বিয়ের জন্য এই ট্রলারের যাত্রী হয়ে মালয়েশিয়া যেতে চেয়েছিল। শাহেদা বেগম বলেন, ট্রলার ডুবে যাওয়ার সময় তার মেয়ে অন্য একজন যাত্রীর মোবাইল ফোন থেকে তাকে ফোন করে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল। সেসময় তিনি শুধু মানুষের বাঁচার জন্য চিৎকার শুনেছিলেন। শাহেদা বেগম এখন অন্তত তার মেয়ের মৃতদেহ চাইছেন।

"আমার মেয়ের ১৫ বছর বয়স। সে খুব ছোট। এখন আমি পৃথিবীর আর কিছু চাই না। আমি শুধু আমার মেয়ের লাশ চাই। আমার মেয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। আপনারা সহযোগিতা করেন, আমার মেয়ের লাশ উদ্ধার করে দেন।"

তিনি জানিয়েছেন, তিনিসহ আরও অনেকে স্বজনের মৃতদেহ পাওয়ার জন্য শরণার্থী ক্যাম্পের অফিস এবং পুলিশসহ বিভিন্ন জায়গায় ধর্ণা দিচ্ছেন।

৮ 'দালাল' আটক

জীবিত উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে পুলিশ প্রথমে দু'জনকে আটক করেছিল। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ অব্যাহত অভিযানে ছয়জনকে আটক করার কথা জানিয়েছে।

ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ১৯জনের নাম দিয়ে মানব-পাচারের চেষ্টার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে।

কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেছেন, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে তারা মানব পাচারকারি একটি চক্রকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন।

মি: হোসেন আরও বলেছেন, মানবপাচারিরা কয়েকস্তরে ভাগ হয়ে কাজ করে বলে তারা প্রমাণ পেয়েছেন।

"পাচারিদের কেউ মালয়েশিয়ায় থাকা লোকজনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে যে কিভাবে এখান থেকে লোক পাঠাবে, এক গ্রুপ কথা অনুযায়ী লোকজনকে জড়ো করে। আরেক গ্রুপ জড়ো করা লোকজনকে পাহাড়-জঙ্গল বা গোপন জায়গায় নিয়ে যায়। ভিন্ন গ্রুপ লোকজনকে ছোট নৌকায় করে বড় নৌকার দিকে নিয়ে যায়। এমন স্তরগুলোকে আমরা চিহ্নিত করেছি।"

পুলিশ সুপার বলেন, নৌকাও কয়েকবার বদল করা হয়- এমন তথ্যও তারা পেয়েছেন।

"প্রথমে ছোট নৌকায় করে ২০থেকে ৩০ মিনিটের দূরত্বে যাওয়া যায়, এরকম দূরত্বে গিয়ে বড় নৌকায় উঠিয়ে দেয়। বড় নৌকায় আবার ৫থেকে ৬ ঘন্টা যাওয়ার পর আরেকটা বড় নৌকায় যাত্রীদের তুলে দেয়া হয়। এরপর সেই নৌকা সরাসরি মালয়েশিয়া যায়।"

জীবিত উদ্ধার হওয়াদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য তাদের এখনও পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। আর নিহতদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে এবং ময়না তদন্তের পর মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত বিষয়