খালেদা জিয়ার মুক্তির চেষ্টায় বিএনপি কেন নাজুক অবস্থানে

২০১৮ সালে যখন খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল তখনকার ছবি ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ২০১৮ সালে যখন খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল তখনকার ছবি

বাংলাদেশে বিরোধীদল বিএনপির সূত্রগুলো স্বীকার করছে যে তাদের নেত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দাবি নিয়ে দলটি এক নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে।

দুর্নীতির মামলায় কারাভোগরত খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কোন জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি। এই ব্যর্থতার পর গত কিছুকাল ধরে তাকে প্যারোলে মুক্ত করার চেষ্টাও দলটিকে ফেলেছে এক বিব্রতকর অবস্থায়।

এরই মধ্যে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে তার পরিবার এবং বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝেও উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে।

তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের কর্তৃত্ববাদী শাসনের মুখে বিএনপি তাদের নেত্রীকে মুক্ত করার জন্য নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই এগুচ্ছে।

দুই বছর ধরে জেলে আছেন খালেদা জিয়া, কিন্তু তাঁর মুক্তির ব্যাপারে সরকারকে চাপে ফেলার মতো কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি তার দল - এনিয়েও মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা রয়েছে।

অন্যদিকে আইনগত লড়াইয়েও সফল হতে পারেনি দলটি । দুর্নীতির একটি মামলায় বিএনপি নেত্রীর জামিনের আবেদন উচ্চ আদালতে নাকচ হয়েছে মাস দুয়েক আগে।

এর মধ্যে কয়েকবার পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়াকে দেখে এসে বলছেন, তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে পড়েছে। দল এবং পরিবার এখন বলছে, তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নততর চিকিৎসা করাতে হবে।

কিন্তু কীভাবে তাকে কারাগার থেকে বের করা সম্ভব - এই প্রশ্নে দলটি একটা নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে বলে বিএনপির নেতাদের অনেকে বলেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, বিএনপি সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তাদের নেত্রীর প্যারোলে মুক্তির বিষয়কে পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।

"নিঃসন্দেহে বিএনপি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে তারা একমত বা এক হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তাদের মধ্যে একতা বা ঐকমত্য নেই। বোঝা যাচ্ছে তাদের মধ্যে নানা জনের নানা মত, ফলে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এবং সিদ্ধান্তগুলি কন্ট্রাডিক্টরি (পরস্পরবিরোধী)"।

এ বিষয়ে বিবিসি বাংলায় আরো খবর:

'উঠে বসতে পর্যন্ত পারছেন না খালেদা জিয়া'- বড় বোন

বন্দী খালেদা জিয়ার মাথায় যত মামলা ও দণ্ড

খালেদা জিয়ার মুক্তি: এখন প্যারোলেও রাজি পরিবার

'আদালতে দেয়া রিপোর্টের সাথে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার মিল নেই'

ছবির কপিরাইট বিএনপি
Image caption খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানাচ্ছেন তার বোন সেলিমা ইসলাম

তিনি বলেছেন, "একজন লিডার, আনকোয়েশ্চেনেবল (প্রশ্নের উর্ধ্বে) লিডার, তার মুক্তির ব্যাপারটা পরিবারের ওপরে চাপিয়ে দেয়াটা আমি তো মনে করি বিএনপির লিডারশীপের জন্য লজ্জার"।

কিছুদিন আগে হাসপাতালে বিএনপি নেত্রীকে দেখে আসার পর তাঁর বোন সেলিমা ইসলাম বলেছিলেন, খালেদা জিয়া এতটাই অসুস্থ যে এখন প্যারোলে হলেও তাঁর মুক্তি তারা চান।

গত মঙ্গলবার বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, প্যারোলে মুক্তি চাওয়ার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেবে তার পরিবার।

বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, খালেদা জিয়া নিজে প্যারোলে মুক্তি চাইবেন না বলে দলটির নেতৃত্ব ধারণা করে।

দলটি সবসমই তাদের নেত্রীর এক 'আপোষহীন ভাবমূর্তি' তুলে ধরে এসেছে।

ফলে প্যারোলে মুক্তি নেয়া হলে রাজনৈতিক দিক থেকে তা পরাজয়ের শামিল হবে, এমন আলোচনা বিএনপি শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে রয়েছে।

কিন্তু দলটির মধ্যম সারির এবং মাঠ পর্যায়ের নেতাদের অনেকের মধ্যে এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেত্রী নিলুফার চৌধুরী বলছিলেন, অন্য কোনো বিষয় বিবেচনা না করে এখন জীবন বাঁচানোর জন্যই খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রয়োজন।

"এই মুহুর্তে খালেদা জিয়ার বাইরে বের হওয়া দরকার, তার চিকিৎসা দরকার। এই চিকিৎসার জন্য বিএনপির কী হবে, কী ইজ্জত যাবে, এটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলা - প্রতিহিংসামূলকভাবে তাকে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানেতো এখন প্যারোল ছাড়া আর কোন রাস্তা নাই। "

"এখানে স্বীকার বা অস্বীকার করার যেমন কিছু নাই, তেমনি সম্মানহানিরও কিছু নাই" - বলেন নিলুফার চৌধুরী।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption আদালতে হাজিরার সময় খালেদা জিয়া

তবে বিএনপির বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দল এবং পরিবার আলাদাভাবে সরকারের সাথে উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে।

খালেদা জিয়ার পরিবারের একটি সুত্র জানিয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার জন্য মুক্তি চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেয়া হতে পারে।

অন্যদিকে বিএনপি আবারও হাইকোর্ট জামিনের আবেদন করেছে। সরকারের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদেরকে নমনীয় করে আইনগত প্রক্রিয়াতেই মুক্ত করা যায় কিনা, সেই চেষ্টা করছেন দলটির কয়েকজন নেতা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাদের দলের নাজুক অবস্থা বা বিব্রতকর পরিস্থিতির কথা মানতে রাজি নন।

তিনি বলেছেন, "এখনতো একটা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক সরকার এদেশে নেই। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাঁকে এভাবে বেআইনীভাবে আটক করে রাখা হয়েছে। উপরন্ত তিনি এতো বেশি অসুস্থ এবং এত বয়স্ক মানুষ, দুর্ভাগ্য আমাদের যে আমরা সুপ্রিমকোর্ট থেকে জামিন পাইনি।"

"অন্যদিকে সরকার যে তাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আটক করে রেখেছে, সেজন্য তাকে অন্য রাস্তাতেও চিকিৎসার জন্য বাইরে পাঠানো বা মুক্তির বিষয়টা জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে"।

মি. আলমগীর আরো বলেছেন, "আমরা বিএনপি একটা লিবারেল বা উদার ডেমোক্রেটিক দল হিসেবে অহিংস আন্দোলন করছি, আমাদের আইনজীবীরা চেষ্টা করছেন। আমাদের এই তৎপরতাগুলো চলছে"।

তবে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অনেকে বলছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবির ব্যাপারে তাদের দলের নেতৃত্ব কোন সুনির্দিষ্ট উপায় পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারছে না।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন :

কেন কাসাবের পকেটে ছিল হিন্দু ছাত্রের আইডি?

ভাইরাসের আস্তানায় পরিণত জাহাজ থেকে নামছেন যাত্রীরা

মার্চের পর অধিনায়ক থাকবেন না মাশরাফী- বিসিবি সভাপতি