আমেরিকার 'আমিষ' খাওয়া গরুর দুধ নিয়ে আপত্তি ভারতে আরএসএস-এর শাখার

ভারতে দুগ্ধ সমবায় ছবির কপিরাইট ARKO DATTA
Image caption ভারতে এক লক্ষ স্থানীয় দুগ্ধ সমবায় আছে

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করার ব্যাপারে ভারত সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের শাখা স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ।

মি. ট্রাম্পের এই সফরে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বড়সড় কোনও বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র যেসব পণ্যের জন্য ভারতের বাজার ধরতে আগ্রহী, তার মধ্যে আছে দুগ্ধজাত পণ্যও।

স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ বলছে যুক্তরাষ্ট্রের গবাদি পশুদের আমিষ খাদ্য দেওয়া হয়।

তাই সেই দুধ ভারতে এলে নিরামিষাশীরা তা খাবেন না এবং পূজাতেও তা ব্যবহার করা যাবে না।

যদিও আমিষ খাদ্য খেলে সেই দুধের মান কোনোভাবে বদলে যায় না বলছেন পশুখাদ্য বিশেষজ্ঞরা।

আপত্তি কোথায়?

স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশী পণ্য আমদানির বদলে দেশীয় পণ্য উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলে আসছে।

ছবির কপিরাইট AFP Contributor
Image caption ভারতে দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এক কোটি মানুষ

সংগঠনটির জাতীয় সমন্বয়ক অশ্বিনী মহাজন বিবিসি বাংলাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি শুরু হলে ভারতে যে কোটি কোটি মানুষ গবাদি পশু পালন করেন আর দুধের ব্যবসায় জড়িত, তারা কী করবেন!

"এরা তো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো বড় কর্পোরেট সংস্থা নয়, ছোট ব্যবসায়ী বা কৃষক। তাদের স্বার্থহানি ঘটবে, সেটা সরকারকে জানানো হয়েছে।"

মি. মহাজন বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রে দুধের আরেকটা সমস্যা আছে, ওখানে মাংস আর রক্তের উপাদান দিয়ে তৈরি পশুখাদ্য খাওয়ানো হয় গরুদের। সেই দুধ যদি ভারতে আসে, তাহলে যে বহুসংখ্যক মানুষ নিরামিষাশী, তারা সেই দুধ খেতে অস্বস্তি বোধ করবেন - তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে। আবার পূজাতেও দুধ ব্যবহার হয় - সেটাও করা যাবে না।"

ভারতে পশুখাদ্যে মাংসজাত খাদ্য খাওয়ানো আইনত নিষিদ্ধ।

পশুখাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশীয় বা শঙ্কর প্রজাতির গরুরা ভারতে যে পরিমাণ দুধ দেয়, তাতে মাংসের উপাদান থেকে তৈরি পশুখাদ্য দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী?

গরুকে যে খাদ্যই দেওয়া হোক, দুধ আমিষ বা নিরামিষ - এই তত্ত্বের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলেই মনে করেন পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎসবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুখাদ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক বরুণ রায়।

তিনি বলেন, "দেশীয় যেসব গরু দৈনিক ৫-১০ লিটার দুধ দেয়, তাদের এমনি ঘাসেই পুষ্টি হয়ে যায়। আর যেসব গরু কিছুটা বেশী দুধ দেয়, আর শঙ্কর প্রজাতির গরু, তাদের খাদ্যে ঘাসের সঙ্গে আর কিছু পুষ্টিকর উপাদান মেশাতে হয়। আমাদের দেশের গরুর এর থেকে বেশী দুধ সংরক্ষণ করা সম্ভবও নয়।"

"কিন্তু দৈনিক ৫০-৬০ এমনটি ৮০ বা ১০০ লিটারও দুধ দেবে, এমন গরুকে সেরকম পুষ্টিও দিতে হবে। তবে খাদ্যের পরিমাণ তো নির্দিষ্ট। তাই খাদ্যের মধ্যে পুষ্টিকর উপাদান মেশাতে হয়। বিদেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ছাঁট মাংস থেকে প্রক্রিয়াজাত উপাদান খাওয়ানো হয়।"

আরো পড়তে পারেন:

'ষড়যন্ত্র তত্ত্ব' নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার চাপান-উতোর

বেসামাল দ.কোরিয়া, সন্দেহের কেন্দ্রে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী

এক মা বলছেন তার ধর্ষণকারীরা ছাড়েনি তার মেয়েকেও

উচ্চশিক্ষায় অনুবাদ গ্রন্থের সঙ্কট, সমাধান কোথায়?

বরুণ রায় বলেন, খাদ্য যাই দেওয়া হোক, তাতে দুধের মানের পরিবর্তন হয় না। দুধটা দুধই থাকে।

"এখন যদি কেউ মনে করেন আমিষ খাদ্য খেয়েছে বলে সেই গরুর দুধ আমিষ হয়ে গেছে - এটা তো কাউকে যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায় না! তার নিজের বিশ্বাসের ব্যাপার সেটা।"

অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরাও বলছেন যেকোনো ক্ষেত্রেই আমদানি বন্ধ করলেই যে দেশের স্বার্থ রক্ষিত হবে, তা নয়।

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউটের অর্থনীতির অধ্যাপক অভিরূপ সরকার মনে করেন, স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ সবসময়েই মুক্ত বাণিজ্যের বিরুদ্ধে, এবং তাদের যুক্তি যে সেটা দেশীয় উৎপাদনকে ক্ষতি করবে।

"অর্থশাস্ত্র দিয়ে এর বিচার করলে এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে যারা দেশের উৎপাদনকারী, তারা গুণমান উন্নত করুন না - লোকে এমনিই কিনবে তাদের পণ্য। একটা শুল্কের দেয়াল কেন তুলে দেওয়া হবে!"

"এছাড়াও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির ব্যাপারে তারা আবার ধর্মবিশ্বাসকেও টেনে এনেছে! যুক্তরাষ্ট্রের গরু আমিষ খেল না কী খেল - সেসব প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। আমার মতে এটা আরও আপত্তিকর," বলছিলেন মি. সরকার।

ভারতে দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার

ভারতে দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার ২০১৯ সালে এক হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়ে গেছে। এ খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এক কোটি মানুষ।

এছাড়াও প্রায় এক লক্ষ স্থানীয় দুগ্ধ সমবায় আছে, যারা আবার বড় সমবায় সমিতিগুলিকে দুধ বিক্রি করে।

২০১৯ সালে সারা বিশ্বে দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার যেখানে বছরে প্রায় দুই শতাংশ হারে বেড়েছে , সেখানে ভারতে এই বাজার বেড়েছে প্রায় সাড়ে ছয় শতাংশ হারে।

সম্পর্কিত বিষয়