পাকিস্তানে 'বাঙালি হওয়া একটা অপরাধ'

  • মোহাম্মদ হানিফ
  • লেখক এবং সাবেক সম্পাদক, বিবিসি উর্দূ
৬০ বছর বয়স্ক রিশিদা
ছবির ক্যাপশান,

অনেকেই নিজেদের পরিচয়পত্র করালেও নিজেদের কার্ড নিয়ে এখন সমস্যায় পড়ছেন বা সন্তানদের কার্ড করাতে পারছেন না।

দক্ষিণ করাচীর লিয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ ফাইনার বর্ষের শিক্ষার্থী উসমান। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে সে তার পরিচয় গোপন রাখে।

আমাদের বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষের বেশি ঝোঁক মাদ্রাসা শিক্ষার দিকে। কিন্তু গত দশ বছর থেকে তারা সাধারণ শিক্ষাক্রমের ব্যাপারেও কিছু আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। আমার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল মাদ্রাসায়। আমি কোরান হাফেজ। আমার বয়স যখন ৯ তখনই আমি কোরান মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। একই সঙ্গে আমি একজন ক্বারী । কিন্তু এর পাশাপাশি আমি সাধারণ শিক্ষাও নিয়েছি।

আমার বয়স যখন ১৪ কি ১৫ তখন আমি নিজেই মাদ্রাসায় পড়াতাম। এখনও আমি অনলাইনে কোরান পড়াই। আমার ছাত্র আছে ক্যানাডা আর ইংল্যান্ডে। এদের কেউ কেউ সপ্তাহে তিনদিন আবার কেউ সপ্তাহের পাঁচদিন কোরানের পাঠ নেন। আমি ম্যাট্রিক পাশ করি মুবাশির শিশু অ্যাকাডেমি এবং তারপর হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট নিই হাজী আবদুল্লাহ হারুণ কলেজ থেকে।

আমার লেখাপড়ার সব খরচ আমি নিজেই জুগিয়েছি। আমার আব্বার অনেক বয়স, ফলে আমার লেখাপড়ায় একটা ছেদ পড়েছিল। এখন আমি লিয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ফাইনাল বর্ষের ছাত্র। আমি আশা করছি দ্বিতীয় ডিভিশনে আমি স্নাতক পাশ করতে পারব।

১৯৭১ সালে করাচী শিক্ষা বোর্ড থেকে আমার আব্বা ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। সে কারণে আমার পরিচয়পত্র পেতে অসুবিধা হয়নি। কিন্তু আমার ভাই যখন পরিচয়পত্র করাতে গেল, তখন গোয়েন্দা বিভাগের কাছে তার কেসটা পাঠানো হয়েছিল। পরে গোয়েন্দা দফতর থেকে ছাড়পত্র দেবার পর তার পরিচয়পত্র হয়।

আমি যখন গত বছর আমার বোনের পরিচয়পত্র করাতে গেলাম, ওরা বলল ওই ম্যাট্রিকের সার্টিফিকেট ভুয়া। ২০০৬ সালে ওরা যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া চালিয়ে দেখেছিল আমার আব্বা কোন্ কোন্ জায়গায় কীধরনের কাজ করেছিলেন এবং তখন সেসব যাচাই করে নিশ্চিত করা হয়েছিল।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ছবির ক্যাপশান,

পরিচয়পত্রের জন্য তদন্ত প্রক্রিয়া অনেক সময় বাঙালিদের জন্য দীর্ঘ করা হয় বলে অভিযোগ।

এখন তারা করাচীর সেকেন্ডারি শিক্ষা বোর্ডের কাছ থেকে এর সত্যতা যাচাই করতে চাইছে। এই সত্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ওরা একমাস সময় নিয়েছিল। কিন্তু যে কর্মকর্তাকে চিঠি লিখে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে হয়েছিল, তিনি কিন্তু দেড় ঘন্টায় কাজটি করতে পারতেন। কিন্তু তার ভয় ছিল একজন বাঙালি সম্পর্কে এত সহজে একটা সার্টিফিকেট ইস্যু করে দিলে তাকে নিয়েই তদন্ত শুরু করা হবে। এখানে সমস্যা একটাই - আমরা 'বাঙালি'।

এখানে বাঙালিদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কোন অভাব নেই। বরং তাদের কাছে ভুরিভুরি দলিল আছে। আমরা যখন ন্যাশানাল ডেটাবেস অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অফিস বা নাডরা-তে যাই, তখন তাদের চোখ কপালে উঠে যায়- বাপরে- আবার একজন বাঙালি এসে হাজির!

আমাদের চতুর্থ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এখানেই জন্মেছে, এখানেই বড় হয়েছে। আমরা তো এখানেই আটকে গেছি। আর আমরা হলাম 'বাঙালি'। তাই আমাদের নিয়ে করার কিছুই নেই।

যে কারণে বাংলাদেশের জন্ম, সে কারণটা কিন্তু রয়েই গেছে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি বলিনি যে আমি বাঙালি। সেকথা জানলে আমার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হতো। আমরা নিজের ভাষায় কথা বলতে পারি না। এটা যে কতবড় মানসিক যন্ত্রণা বলে বোঝানো কঠিন। আমার কথাবার্তা শুনে কেউ বুঝবে না যে আমি আসলে বাঙালি।

আমার মাতৃভাষা ও বাঙালি পরিচয় গোপন রাখতে পারলে তবেই একমাত্র আমার পক্ষে জীবনে দাঁড়ানো সম্ভব। যে মুহূর্তে আমি বলব আমি বাঙালি, আমার বিরুদ্ধে খোঁজখবর নেয়া, তদন্ত করা শুরু হয়ে যাবে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

বাঙালি বংশোদ্ভুত তরুণরা বলছেন তাদের বাপ দাদারা তেমনভাবে সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে না পারাটাও তাদের জন্য অসুবিধার একট কারণ।

অনেক পরিবার আছে যাদের সব দলিলপত্র ঠিকঠাক আছে, কোথাও কোন সমস্যা নেই। তারা অনেকের পরিচয়পত্র এমনভাবে আটকে দেয়, যাতে ১৯৭১ সালের পরের কাগজপত্র আপনাকে দেখাতে হবে। বাঙালি হওয়া এখানে একটা অপরাধ। আমাদের বয়স্করা কিছু সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য কিছু চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সেসব খুবই নগণ্য। আমাদের সাহায্য করার জন্য কেউকেটা কেউ নেই। কোন দপ্তরে উঁচু পদে কেউ নেই। সমাজের অভিজাত শ্রেণিতে কেউ নেই।

আর আপনার কার্ড যদি না হয়, তাহলে আপনাকে তো আপনার আসল পরিচয় গোপন করতে হবে। না হলে আপনি চাকরি জোগাড় করবেন কীভাবে, আপনি জীবনে এগোবেন কীভাবে?

মাচ্চার কলোনিতে আমরা দু-তিন হাজার মানুষ থাকি। এখানে স্নাতকের সংখ্যা আঙুলে গোণা যায়। এখানে স্নাতক আমাকে নিয়ে মাত্র পাঁচ কি ছয়জন। আর মেয়েদের কথা তো বলাই বাহুল্য! মেয়েদের মধ্যে হয়ত মাত্র একজন, বড়জোর দুজন ম্যাট্রিক বা ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছে। তারা তো বুদ্ধিমতী হয়েও পড়াশোনায় এগোতে পারছেন না। এ কারণে শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ মাছ ধরা শিল্পে বা কারখানায় শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন।

কিন্তু আমি তো আমার মাতৃভাষা, আমার পিতৃপরিচয় গোপন করে জীবনে এগোতে চাই না। আমি যে বাঙালি সেটা আমি গোপন করতে আসলে চাই না। আমি ঊর্দু বলি, আমি পাকিস্তানি, কিন্তু আমি যে বাঙালি সেটা আমি কিন্তু গোপন করতে চাই না।

ইমরান খান বলেছিলেন আমাদের নাগরিকত্ব দেয়া হবে। মৃত্যু পথযাত্রী তৃষ্ণার্ত মানুষ পানি দেখলে যেমন বাঁচার স্বপ্ন দেখে তেমনি আমাদের মধ্যেও তিনি একটা আশা জাগিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর ব্যাপারটা সবাই ভুলে গেছে।

আপনিই বলুন বাঙালি সম্প্রদায়ের কোন মানুষ কি কখনও পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়েছে? কেউ কি পাকিস্তানে বাস করে পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছে? তাহলে কেন আমরা এখানে মাথা উঁচু করে আর পাঁচজনের মত থাকতে পারছি না?

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন: