মুজিব জন্মশতবার্ষিকী: মোদীর ঢাকা সফর সফল করতে উদগ্রীব ভারত

  • শুভজ্যোতি ঘোষ
  • বিবিসি বাংলা, দিল্লি
দিল্লিতে দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদী। অক্টোবর, ২০১৯

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

দিল্লিতে দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদী। অক্টোবর, ২০১৯

বাংলাদেশে মুজিব বর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যোগদানের বিরুদ্ধে সে দেশে কিছু কিছু বিক্ষোভ প্রতিবাদ শুরু হলেও ভারত কিন্তু এই সফরকে সফল করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই নিশ্চিত করেছে যে এই সফর বাতিল হচ্ছে না - এবং সফরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।

দিল্লিতে পর্যবেক্ষকরাও বলছেন, নাগরিকত্ব আইন বা এনআরসি-র মতো ইস্যুতে বাংলাদেশে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা প্রশমিত করতে এবং 'একাত্তরের চেতনা'কে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদী ঢাকায় তার আসন্ন সফরকে ব্যবহার করতে উৎসুক।

বস্তুত, আগামী সপ্তাহেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ব্রাসেলসে যাওয়া স্থির ছিল, কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে সে সফর বাতিল হয়েছে।

অথচ তার ঠিক চার দিন পরেই তাঁর বাংলাদেশে পা রাখার কথা, সেই সফরকে সফল করার জন্য ব্যাপক তৎপরতা চলছে দিল্লির সাউথ ব্লকে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার

এই সফর যে বাতিল করার প্রশ্নই ওঠে না, সেটা জানিয়ে দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার বলেন, "বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে এসে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানিয়ে গিয়েছিলেন।"

"তিনি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণও করেছেন, বাংলাদেশের জাতির পিতার স্মরণে সেই অনুষ্ঠানে সামিলও হচ্ছেন। এই সফরে একটা দ্বিপাক্ষিক অংশও থাকবে, যার বিস্তারিত অবশ্য আমরা এখনই জানাচ্ছি না।"

ফলে বাংলাদেশের কিছু ইসলামপন্থী ও বামপন্থী গোষ্ঠী যে নরেন্দ্র মোদীর সফরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, স্পষ্টতই ভারত সেটাকে আমলে নিতে চাইছে না।

দিল্লিতে বাংলাদেশ-বিষয়ক গবেষক শ্রীরাধা দত্ত মনে করছেন, ভারতের নাগরিকত্ব আইন বা এনআরসি বাংলাদেশে যে সব প্রশ্ন বা অস্বস্তি তৈরি করেছে সেগুলো দূর করার জন্য নরেন্দ্র মোদী এই সফরটাকে কাজে লাগাতে চাইছেন।

ছবির উৎস, শ্রীরাধা দত্ত/ফেসবুক

ছবির ক্যাপশান,

শ্রীরাধা দত্ত

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

ড: দত্ত বিবিসিকে বলছিলেন, "সিএএ বা ভারতের এই ধরনের নীতিগুলো নিয়ে আমাদের নেইবারহুডে যে উদ্বেগের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, আমার ধারণা প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় গিয়ে সরাসরি সেটা নিজে অ্যাড্রেস করতে চান। সেই জন্য ভাইরাস বা অন্য কোনও অজুহাতে এ সফর বাতিল করা হচ্ছে না।"

"ভারত সব সময় চায় বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা স্ট্রং আর পারপাসফুল থাকুক। কিন্তু দিল্লি এটাও জানে, প্রধানমন্ত্রী হাসিনারও একটা ডোমেস্টিক কনস্টিটিউয়েন্সি আছে - যেখানে তাঁরও ব্যাখ্যা করার দায় আছে ভারতের মতো বন্ধুপ্রতিম দেশ এই ধরনের নীতিগুলো কেন নিচ্ছে!"

"এই পটভূমিতে ভারতের নিজস্ব কোনও নীতি নিয়ে প্রতিবেশী কোনও দেশের বিচলিত হওয়ার কারণ নেই, এটা তাদের নিশানা করে নয় - ঢাকায় গিয়ে এই জোরালো বার্তাটা নিজে দিতে চান বলেই মোদী এই সফরে যাচ্ছেন।"

থিঙ্কট্যাঙ্ক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য আবার বলছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় দুদেশের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলাও এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য।

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান,

জয়িতা ভট্টাচার্য

মিস ভট্টাচার্যর কথায়, "একাত্তরের যুদ্ধে ভারত যে স্পিরিট দেখিয়েছিল, আজ দুটো দেশ মিলে সেই চেতনাকেই কিন্তু পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে।"

"হ্যাঁ, সে দেশে একটা অংশ তখনও ভারতের বিরোধিতা করেছিল - কিন্তু গণতন্ত্রে তো সেটাই স্বাভাবিক! তাই বলে দুটো দেশের সরকারের মধ্যে সম্পর্ক কিন্তু ছিল বরাবরই অটুট, আমরা যার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের দিকে এগোচ্ছি!"

"আর একটা কথা মনে রাখতে হবে, মোদী এই সফরে যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। ব্যক্তি মোদী নন, তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে সেখানে যাচ্ছেন - বাংলাদেশও নিশ্চয় সেভাবেই এই সফরকে মর্যাদা দেবে।"

প্রায় পাঁচ বছর পর বাংলাদেশ সফরে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী, আর তার এই সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সমঝোতারও প্রস্তুতি চলছে দিল্লি ও ঢাকার ভেতরে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

পাঁচ বছর আগে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী মোদীকে স্বাগত জানানোর আয়োজন। জুন, ২০১৫

শ্রীরাধা দত্ত বলছিলেন, "কদিন আগেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলাও ঢাকায় গিয়ে আভাস দিয়ে এসেছেন পানি ভাগাভাগি নিয়ে সফরে হয়তো কোনও সমঝোতা বা চুক্তি হবে। যদিও তিনি তিস্তার কথা উল্লেখ করেননি।"

"কিন্তু তার কথা থেকে আভাস মিলেছে, তিস্তা না-হলেও অন্য নদী নিয়ে এবং হয়তো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছু সমঝোতা এই সফরে হবে।"

"আর যখন পররাষ্ট্র সচিব নিজে প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে সে দেশে ঘুরে আসেন, তখন বোঝাই যায় সেই সফরের একটা আলাদা গুরুত্ব থাকে", বলছিলেন তিনি।

কোনও চুক্তি বা সমঝোতা বাংলাদেশে মোদী-বিরোধীদের শান্ত করতে পারবে কি না তা অবশ্য পরের কথা।

কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে সম্প্রতি যে অস্বস্তির উপাদানগুলো তৈরি হয়েছে এই সফরে তা দূর করার জন্য ভারত কোনও চেষ্টাই বাদ দিচ্ছে না, তা স্পষ্ট।