মুজিব জন্মশতবার্ষিকী: অন্যদের ছাপিয়ে কিভাবে একচ্ছত্র নেতা হয়ে উঠলেন শেখ মুজিবুর রহমান

শেখ মুজিবুর রহমান ছবির কপিরাইট IAN BRODIE
Image caption শেখ মুজিবুর রহমান

১৯৬০'র দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠেন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৬৬ সালের ছয়দফা প্রস্তাব থেকে শুরু করে ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং এরপরে ৭০-এর নির্বাচন - এসব রাজনৈতিক পরিক্রমার ভেতর দিয়ে শেখ মুজিব হয়ে উঠেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একচ্ছত্র নেতা।

মাত্র পাঁচ বছরে রাজনৈতিক দৃশ্যপট ব্যাপকভাবে বদলে যায়। তখনকার সময় আরো সুপরিচিত রাজনীতিবিদরা থাকলেও শেখ মুজিব তাদের ছাপিয়ে সামনের কাতারে চলে আসেন।

ছয়দফা আন্দোলন

১৯৬২ সালে আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির মৃত্যুর পর বেশ দ্রুত মাত্র আট বছরের মধ্যেই শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে উঠেন এই অঞ্চলের একচ্ছত্র রাজনৈতিক নেতা।

ইতিহাসবিদদের মতে ১৯৬৬ সালের ছয়দফা দফা দাবি উত্থাপন শেখ মুজিবকে একবারে সামনের কাতারে নিয়ে আসে।

ছয়দফার মূল বিষয় ছিল পাকিস্তানকে একটি ফেডারেশনে পরিণত করা, যেখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে।

ছবির কপিরাইট সিআরআই
Image caption ছয়দফার দাবি উত্থাপন করে রাজনীতির মাঠে এগিয়ে যান শেখ মুজিব

এছাড়া বলা হয়, ফেডারেল সরকারের হাতে শুধু প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক থাকবে।

বাকি সবকিছু থাকবে রাজ্যসমূহের হাতে। শেখ মুজিবুর রহমান এসব দাবির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সোনিয়া নিশাত আমিন বলেন, ছয়দফার মাধ্যমে শেখ মুজিব গ্রাম এবং শহরের মানুষকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে ছয়দফা দাবি উত্থাপন করেন ১৯৬৬ সালে ৫ই ফেব্রুয়ারি।

এর কয়েক মাস পরেই মে মাসে শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।

অভিযোগ ছিল তিনি ছয় দফার মাধ্যমে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছেন। সেই থেকে প্রায় তিনবছর কারাগারেই কেটেছে শেখ মুজিবের।

কারাগারে থাকা শেখ মুজিবকে রাজনৈতিকভাবে আরো শক্তিশালী করে তোলে। এ সময়ের মধ্যে তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়।

তখন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন আমির হোসেনে আমু। তার মতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি শেখ মুজিবের রাজনীতির জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়।

আমির হোসেন আমু বিবিসি বাংলাকে বলেন, " তখন ছয়দফা ছাড়া অন্য কোন পলিটিক্স এখানে ছিলনা। ছয়দফার কারণেই বঙ্গবন্ধু ক্রমান্বয়ে একক নেতা হয়েছে।"

গণ আন্দোলনের সূচনা

শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে থাকা অবস্থায় ১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাসে ছাত্র অসন্তোষকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন।

দ্রুত সে আন্দোলন ছড়িয়ে যায় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্রলীগ মিলে গঠন করা হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।

সেখানে তুলে ধরা হয় ১১ দফা দাবি, যার মধ্যে ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থাপিত ছয়দফা দাবিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তখন থেকেই শেখ মুজিবের মুক্তি এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিও প্রাধান্য পায়।

ছবির কপিরাইট সিআরআই
Image caption ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে যাবার পথে শেখ মুজিব।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা আসাদুজ্জামান আসাদ নিহত হলে প্রতিবাদ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

এর চারদিন পরে ২৪ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউর নিহত হলে পরিস্থিতি আইয়ুব খান সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

আন্দোলন চলতে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ তারিখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হক আটকাবস্থায় ক্যান্টনমেন্টে গুলিতে নিহত হয়।

এর তিনদিন পরে ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা নিহত হলে হাজার-হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।

কোনভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এক পর্যায়ে আইয়ুব খান ঘোষণা করেন যে তিনি পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেবেন না।

তখন শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তদের মুক্তি দেয়া হয়।

১৯৬৯ সাল সংগঠিত গণঅভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম তোফায়েল আহমেদ। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভিপি।

মি. আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সেই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইয়ুব খানের ভিত তছনছ হয়ে যায়।"

মি. আহমেদ বলেন, ১৯৬৯ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং ২৩শে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক সমাবেশে শেখ মুজিবকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি দেয়া হয় ছাত্রদের পক্ষ থেকে।

অন্য নেতাদের চেয়ে শেখ মুজিব কেন এগিয়ে গেলেন

শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়াও তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং কমিউনিস্ট নেতা মনি সিংহ ও মোজাফফর আহমেদ।

শেখ মুজিব কারাগারে থাকার সময় তার মুক্তির দাবিতে রাস্তায় তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি।

কিন্তু রাজনীতির মাঠে শেখ মুজিবুর রহমান তাদের ছাপিয়ে সামনে চলে আসেন।

সে সময়ের রাজনীতি যারা প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের মতে, তিন বছর কারাগারে থাকলেও বাইরের রাজনীতি শেখ মুজিবকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।

ব্যাপক আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের আইয়ুব খান সরকার শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

তখন বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৎকালীন ছাত্রী মাখদুমা নার্গিস।

তিনি বলছেন, আইয়ুব খান সরকার যখন শেখ মুজিবের মুক্তি দিতে বাধ্য হলো তখনই মূলত রাজনীতির ময়দানে অনেক চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যায়।

মাখদুমা নার্গিস বিবিসি বাংলাকে বলেন, "৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে তিনি যখন কারাগার থেকে বের হলেন, তখন ইলেকশন পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার হয়নি। তখনই তিনি একক নেতা হয়ে গেলেন। এর ফলাফল দেখা গেছে ১৯৭০-এর নির্বাচন। তখন অন্য কোন নেতার অস্তিত্বই থাকলো না।"

১৯৭০'র নির্বাচন ও শেখ মুজিব একক নেতা হয়ে ওঠা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমান একচ্ছত্র নেতা হয়ে উঠার পেছনে আরেকটি বড় ঘটনা ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচন।

শেখ মুজিব জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আইয়ুব খানের ডাকা গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেবার কথা ঘোষণা দেন।

অন্যদিকে মাওলানা ভাসানী গোলটেবিল বৈঠক প্রত্যাখ্যান করেন। সেই গোলটেবিলে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে কিছু দাবি আদায় করেন।

আওয়ামী লীগ নেতা আমীর হোসেন আমু বলছিলেন, মাওলানা ভাসানী নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিব নির্বাচনে যাবার যে সিদ্ধান্ত নেন।

এই সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল সেটি পরবর্তীতে প্রমাণ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন আমির হোসেন আমু।

মাওলানা ভাসানীসহ আরো কিছু রাজনৈতিক দলের নেতারা ইয়াহিয়া খানের শামরিক শাসনের অধীনে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব নির্বাচনে যাবার ঘোষণা দিলেন।

ছবির কপিরাইট সিআরআই
Image caption ১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলনের মাধ্যমে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর শেখ মুজিব হয়ে অনেক প্রভাবশালী ওঠেন

"বঙ্গবন্ধু ছয়দফাকে রেফারেন্ডাম হিসেবে ঘোষণা করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেন। তিনি বললেন, বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলার অধিকার কার আছে সেটা প্রমাণিত হবে," বলছিলেন মি. আমু।

নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ছয়দফার পক্ষে প্রচারণা চালায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একচেটিয়া বিজয় শেখ মুজিবকে অন্য রাজনীতিবিদদের চেয়ে আরো উচ্চতায় নিয়ে যায়।

তিনিই যে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিলমোহর দিয়ে দিল ১৯৭০ সালের সেই নির্বাচন।

ষাটের দশকের বামপন্থী ছাত্রনেতা এবং এখন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, " ঐ সময়টায় ঐতিহাসিকভাবে জাতির সামনে যা প্রয়োজন, সে প্রয়োজনীয়তা পূরণ করার জন্য মাওলানা ভাসানী বলি আর অন্য কোন নেতাই বলি, পরিপূর্ণভাবে দায়িত্ব নিয়ে ভূমিকা পালন করতে পারে নাই। "

"এই পটভূমিতে যখন নির্বাচন আসলে তখন জনগণ তার স্বাভাবিক বুদ্ধিতে বুঝলো যে এইবার আর ভুল করা যাবেনা। আমাদের বাঙালীর ভেতরে একক নেতা লাগবে। অতীতে অভিজ্ঞতায় তারা দেখেছে একজনের বেশি হলেই পাকিস্তানী শাসকরা নানারকম খেলায় লিপ্ত হয়।"

মি. সেলিম বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান নৈতিক, রাজনৈতিক এবং আইনগতভাবে বাঙালি জাতীর মুখপাত্র হবার স্থান অর্জন করে নিলেন।