করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতদের দাফন নিয়ে জটিলতা

খিলগাঁও তালতলা কবরস্থানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কবর না দেয়ার ব্যাপারে নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছে এলাকাবাসী
Image caption খিলগাঁও তালতলা কবরস্থানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কবর না দেয়ার ব্যাপারে নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছে এলাকাবাসী

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে তার মৃতদেহ ঢাকার খিলগাঁও তালতলার একটি কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে রাজধানীর দুটো সিটি কর্পোরেশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কিন্তু খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দাদের প্রতিবাদের মুখে সেই সিদ্ধান্ত থমকে গেছে। ফলে করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের দাফন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

তাদের প্রতিবাদের মুখে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত একজনের মৃতদেহ ওই কবরস্থানের নিয়ে গিয়েও দাফন করা যায়নি। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় তাকে অন্য আরেকটি কবরস্থানে দাফন করা হয়।

খিলগাঁওয়ের একজন বাসিন্দা ইশতিয়াক বাবলা বিবিসিকে বলছেন, "গত সোমবার রাতে দেখি এলাকার অনেক মানুষ মিছিল করে কবরস্থানে যাচ্ছে। জানতে পারলাম, করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া কাউকে এই কবরস্থানে কবর দেয়ার বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ করছেন।"

''কবরস্থানে কাউকে মাটি দিতে দেয়া হবে না, এটাই আমার কাছে আশ্চর্য লাগে। যে কেউই তো আক্রান্ত হতে পারেন। তাহলে কোথায় কাকে মাটি দেয়া হবে? এটা সম্পূর্ণ হুজুগের একটা ব্যাপার। কিন্তু এটা নিয়ে কথা বলার মতো পরিবেশ এখানে নেই।''

তিনি বলেন, ''স্থানীয় মানুষজনের আশঙ্কা, যেহেতু এই কবরস্থানের ভেতর দিয়ে তারা হাঁটাচলা করেন, এখানে করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া কাউকে কবর দেয়া হলে, তাদের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।''

তিনি জানান, কবরস্থানের সামনে একটি ব্যানারও টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে যে, করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া কাউকে এই কবরস্থানে কবর দেয়া যাবে না। তাকে যেন অন্যখানে কবর দেয়া হয়।

ব্যানারটিতে লেখা রয়েছে, ''সাধারণ জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে 'করোনা ভাইরাসে' আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিদের লাশ খিলগাঁও তালতলা কবরস্থানের পরিবর্তে ঢাকার বাইরে বা অন্য স্থানে নিরাপদ স্থানে দাফন করার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।''

করোনাভাইরাস এলো কোত্থেকে, ছড়ালো কিভাবে- যতসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে কেন অন্যের থেকে দু'মিটার দূরে থাকবেন

করোনাভাইরাস নিয়ে যেসব ভিত্তিহীন পরামর্শে আদৌ কান দেবেন না

করোনাভাইরাস গাইড: আপনার প্রশ্নের উত্তর

করোনাভাইরাস: বর্তমান অবস্থা শেষ হতে কত সময় লাগবে?

করোনাভাইরাস ঠেকাতে যে সাতটি বিষয় মনে রাখবেন

নিজেকে যেভাবে নিরাপদ রাখবেন করোনাভাইরাস থেকে

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া একজন ব্যক্তিকে সোমবার রাতে এখানে দাফন করার জন্য নিয়ে আসা হয়। কিন্তু এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে সেটি হয়নি। পরে পুলিশ মৃতদেহটি অন্যত্র নিয়ে যায়। পরে ঢাকার অপর একটি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

খিলগাঁও-তালতলা কবরস্থানের সামনে ঝোলানো ওই ব্যানারটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকেও। অনেকেই এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

আরিফুর রহমান নামের একজন লিখেছেন, 'মৃতদেহ দাফন করায় বাধা, কোনভাবেই এটা ধর্মীয়ভাবে মেনে নেয়া যায় না।''

মমিনুল হক নামের একজন লিখেছেন, ''করোনাভাইরাস তো যে কারো মধ্যেই ছড়াতে পারে। আপনারা যারা ওই এলাকার বাসিন্দা, আপনাদের কারো মৃত্যু হলে কোথায় দাফন হবে?''

সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকায় দুই সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে মোট নয়টি কবরস্থান রয়েছে। অন্যান্য কবরস্থানগুলো পুরনো ও বড়, যেখানে প্রতিদিনই একাধিক মৃতদেহ দাফন করা হয়। খিলগাঁও তালতলার কবরস্থানটি নতুন এবং চাপ কম থাকে।

এ কারণে গত ১৯শে মার্চ দুই সিটি কর্পোরেশন মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যে, করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের এখানে দাফন করা হবে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের একজন কর্মকর্তা তাজিনা সারোয়ার বিবিসিকে বলেন, ''করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের এই কবরস্থানে দাফন করার সিদ্ধান্ত এখনো বহাল আছে। তবে এলাকাবাসী এ নিয়ে আপত্তি করেছেন বলে আমরা শুনেছি। তাদের সঙ্গে আলাপ করে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।''

সিটি কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রিত কবরস্থানে স্থানীয় জনতার নামে ব্যানার টাঙানো যায় না বলেও তিনি জানান।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৩৯জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

Image caption করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে যা করতে হবে

মৃতদেহ সৎকার বা দাফনের জন্য যেসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন কেউ মারা গেলে, মৃতদেহ সরানো, পরিবহন, সৎকার বা দাফনের আগে অবশ্যই রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর)কে জানাতে হবে।

এ ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী একটি প্রটোকল তৈরি করেছে আইইডিসিআর।

আইইডিসিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তিকে পরিষ্কার করা, ধোয়া বা নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ছাড়া স্পর্শ করা যাবে না। চার সদস্যের একটি দল সুরক্ষা পোশাক করে মৃতদেহ সৎকার বা দাফনের জন্য প্রস্তুত করবে। যেখানে তিনি মারা গেছেন, সেখানে প্লাস্টিকে মুড়িয়ে মৃতদেহ রাখতে হবে। মৃত ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে আলাপ করে তাদের কোন অনুরোধ থাকলে জেনে নিতে হবে।

ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধে মরদেহ গোছল করানো যাবে না। তবে মরদেহ গোছলের পরিবর্তে তৈয়াম্মুম বা পানি ছাড়া ওজু করানো যাবে।

সেলাইবিহীন সাদা সুতির কাপড় কাফনের কাপড় হিসাবে ব্যবহার করা যাবে। কাফনের কাপড় প্লাস্টিকের ব্যাগে রেখে তার ওপর মরদেহ রাখতে হবে এবং ব্যাগের জিপার বন্ধ রাখতে হবে। এ সময় যারা মরদেহ উঁচু করে ধরবেন, তাদের অবশ্যই সুরক্ষা পোশাক পরে থাকতে হবে।

মৃতদেহ সৎকারের জন্য মৃতদেহের সব ছিদ্রপথ (নাক, কান, পায়ুপথ) তুলা দিয়ে ভালো করে বন্ধ করে দিতে হবে, যাতে কোন তরল গড়িয়ে না পড়ে। এরপর সংক্ষিপ্ত রুটে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মৃতদেহ সমাধিস্থলে নিয়ে যেতে হবে। দাফনের পর মৃতদেহ বহনকারী ব্যাগটি কখনোই খোলা যাবে না।

দাফনের পর কবর বা সমাধিস্থানটি ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার গভীর মাটির স্তর দিয়ে ঢাকার পাশাপাশি দাফন করা স্থানের আশপাশ উপযুক্ত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে। এছাড়াও মৃত ব্যক্তি যে স্থানে মারা গেছেন, সেই স্থানটিও যত দ্রুত সম্ভব জীবাণুমুক্ত করা ও মৃতদেহ দাফনের পর সেই স্থান ভালোভাবে ঘিরে রাখতে বলা হয়েছে।

নিদর্শনায় বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মৃতদেহ ময়নাতদন্ত করা যাবে না এবং মৃতদেহ পোড়ালে দেহাবশেষ বা ছাই থেকে করোনাভাইরাস ছড়ায় না।