করোনাভাইরাস: 'খদ্দের নেই, না খেয়ে মরার অবস্থা', বলছেন কলকাতার সোনাগাছির এক যৌনকর্মী

  • অমিতাভ ভট্টশালী
  • বিবিসি বাংলা, কলকাতা
যৌনকর্মীরা অপেক্ষা করছেন কখন কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের খাবার বিলি করতে আসবে।

ছবির উৎস, দূর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি

ছবির ক্যাপশান,

যৌনকর্মীরা অপেক্ষা করছেন কখন কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের খাবার বিলি করতে আসবে।

কলকাতার সোনাগাছি এলাকাকে এশিয়ার সবথেকে বড় যৌনপল্লী বলা হয়ে থাকে। এখানে সারা দিন, সারা রাত খদ্দেরদের আনাগোনা চলতেই থাকে। কিন্তু এখন উত্তর কলকাতার ওই অঞ্চলটি একেবারে শুনশান, নিস্তব্ধ। রাস্তায় কোনও নারী যৌনকর্মী খদ্দেরের অপেক্ষায় থাকছেন না এখন।

তারা এখন অপেক্ষা করছেন কখন কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের খাবার বিলি করতে আসবে।

ওই এলাকাতেই যৌনকর্মী হিসেবে তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন সীমা নামের এক নারী। তিনি টেলিফোনে বলছিলেন, "আমরা যে কী অবস্থায় পড়েছি, বিশ্বাস করতে পারবেন না। একটাও খদ্দের নেই আজ কয়েক সপ্তাহ। তাদের আসার উপায়ই তো নেই। একটা পয়সা রোজগার নেই - দুই ছেলে, পুত্রবধূ, তার দুটো বাচ্চাকে নিয়ে কী করে বাঁচব কে জানে! শুধু আমার না, হাজার হাজার মেয়েদের একই অবস্থা এখানে।"

করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার উপদেশ দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে সব বিশেষজ্ঞই।

কিন্তু মিজ সীমাদের পেশাটা এমনই, যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভবই নয়। কিন্তু তার মধ্যেও করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা চেষ্টা করেছেন কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে।

আবার তারা যখন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর কাছ থেকে শুকনো চাল-ডাল অন্যান্য রসদ নিচ্ছেন, তখনও তাদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, দূর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি

ছবির ক্যাপশান,

কলকাতার সোনাগাছি এলাকার যৌনকর্মীদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে সমস্যা তৈরি হয়েছে

মিজ সীমা বলছিলেন, "করোনা যখন থেকে শুরু হয়েছে, তখন থেকেই আমরা খদ্দের এলেই তাকে ওই সাবানের মতো কী একটা বেরিয়েছে (সম্ভবত হ্যান্ড স্যানিটাইজের কথা বোঝাচ্ছিলেন), সেটা দিয়ে হাত ধুইয়ে তার পরে ঘরে ঢোকাচ্ছিলাম।"

"আবার বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে আরও একবার হাত ধুয়ে তারপর বের হতে হচ্ছি। আর কারও যদি শরীর খারাপ থাকে, জ্বর, সর্দি-কাশি, তাহলে তাকে ঘরে আসতে দিচ্ছিলামই না। তবে এখন তো আর খদ্দের আসছেই না।"

সোনাগাছিসহ রাজ্যের নানা যৌনপল্লীর নারীদের নিজেদেরই একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে - দূর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি।

সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা স্মরজিৎ জানা বলছিলেন তারা কিছু কিছু খাদ্যদ্রব্য যোগাড় করতে পারছেন, সেটাই বিলি করা হচ্ছে সোনাগাছির বিভিন্ন অঞ্চলে।

"এক তো যৌনপল্লীতে খদ্দের আসছেন না, তাই যৌনকর্মীদের রোজগার শুন্যে নেমে এসেছে। তারা নিজেরা তো ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেনই। এছাড়া ৮০ শতাংশ যৌনকর্মীই তাদের এক বা দুজন সন্তানকে নিজের বাবা-মায়ের কাছে রেখে দেন পল্লীর বাইরে", বলছিলেন স্মরজিৎ জানা।

"এক-দুজন সন্তান অবশ্য মায়েদের সঙ্গে থাকে। বাবা-মায়ের কাছেও খরচ পাঠাতে পারছেন না যৌনকর্মীরা - তাই সেই সব পরিবারগুলোও বিপদের মুখে পড়েছে।"

তার কথায়, "পাড়ার কিছু ক্লাব বা কোনও সংগঠন এবং পুলিশের তরফ থেকেও মাঝে মাঝে রান্না করা খাবার দেওয়া হচ্ছে। আর আমরা রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রমের মতো সংগঠনগুলোর কাছ থেকে চাল-ডাল, আলু-পেঁয়াজ এসব যোগাড় করেছি। সেগুলোই প্যাকেট করে ওদের বিলি করছি যাতে অন্তত কাউকে না খেয়ে থাকতে না হয়।"

সংঘবদ্ধ যৌনপল্লীগুলির বাইরে যারা পথচলতি বা ভাসমান যৌনকর্মী, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। এদের প্রায় কেউই নিজের পরিচয় তুলে ধরতে চান না।

ছবির উৎস, দূর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি

ছবির ক্যাপশান,

পথচলতি বা ভাসমান যৌনকর্মীদের অবস্থা সংঘবদ্ধ ডৌনপল্লীদের কর্মীদের চেয়ে শোচনীয়।

এদের মধ্যে যেমন আছেন নারীরা, তেমনই আছেন রূপান্তরিত নারী, পুরুষ এবং হিজড়ারা।

রূপান্তরকামীদের একটি সংগঠনের প্রধান রঞ্জিতা সিনহা বলছিলেন, "প্রথম দিন থেকেই আমাদের কাছে সাহায্যের জন্য প্রচুর আবেদন আসছে, ফোন আসছে। কিন্তু আমরা তো সীমিত কিছু জায়গায়, কলকাতা আর আশপাশের অঞ্চলে যেতে পারছি।"

"রাজ্যের বাকি অঞ্চলে পরিস্থিতি ভয়াবহ। রূপান্তরকামী বা রূপান্তরিতদের তো আলাদা কোনও পেশা নেই - এরা বেশিরভাগই হয় যৌন পেশায় যুক্ত অথবা রাস্তায় ভিক্ষা করেন, অথবা হিজড়া প্রথায় জড়িত। লকডাউনের ফলে রোজগার পুরোপুরি বন্ধ এদের সকলের।"

যে সময়ে শারীরিকভাবে যৌনপেশা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না কারও পক্ষেই, অনেকেই সম্ভবত ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই পেশায় টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

যদিও কতজন অনলাইনে যৌনপেশা চালাচ্ছেন, তার কোনও পরিসংখ্যান এখনও তৈরি করতে পারে নি কোনও সংগঠনই।

তাদের কাছে এখন প্রাধান্য পাচ্ছে, যৌনকর্মীরা অন্তত যেন নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা পান।