করোনাভাইরাস: ফ্যাশন ব্রান্ড প্রাইমার্কের ব্যবসায় ধস কেন বাংলাদেশের জন্য দুঃসংবাদ?

  • মোয়াজ্জেম হোসেন
  • বিবিসি বাংলা, লন্ডন
ইউরোপের হাইস্ট্রীটে সবচেয়ে ব্যবসা সফল ব্রান্ডগুলোর একটি প্রাইমার্ক

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান,

ইউরোপের হাইস্ট্রীটে সবচেয়ে ব্যবসা সফল ব্রান্ডগুলোর একটি প্রাইমার্ক

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন যে তীব্র ঝড়ের মুখে পড়েছে, সেটা বুঝতে হলে একটি ফ্যাশন ব্রান্ডের উদাহারণই যথেষ্ট- প্রাইমার্ক।

যদি ইউরোপ বা আমেরিকার যে কোন শহরে প্রাইমার্কের যে কোন স্টোরে ঢুকে যে কোন একটি পোশাক হাতে তুলে নেন, এমন সম্ভাবনাই বেশি যে সেটি বাংলাদেশে তৈরি।

একেবারে সস্তা শ্রমে তৈরি পোশাক সস্তায় বিক্রি করে এই ব্রান্ডটি খুবই জনপ্রিয়তা পায় পশ্চিমা ভোক্তাদের কাছে।

করোনাভাইরাস মহামারির আগে প্রাইমার্কের স্টোরগুলোতে প্রতিমাসে বিক্রি হতো ৮০ কোটি ডলারের পণ্য। আর গত এক মাসে? একেবারে শূন্য।

প্রাইমার্কের মালিক এসোসিয়েটেড ব্রিটিশ ফুডের প্রধান নির্বাহী জর্জ ওয়েস্টন মঙ্গলবার নিজেই এই তথ্য জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি ছয় মাসের লাভ-ক্ষতির যে হিসেব প্রকাশ করেছেন, তাতে বলেছেন, “প্রতিমাসে যেখানে আমাদের বিক্রি ছিল ৬৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের (৮০ কোটি ডলার), গত ২২শে মার্চ সব স্টোর বন্ধ করে দেয়ার পর এখন তা একদম শূন্যে নেমে এসেছে, আমরা কিছুই বিক্রি করিনি।”

বিশ্বের ১২টি দেশে প্রাইমার্কের আছে ৩৭০টি স্টোর। এই ব্রান্ডের পোশাকের একটি বড় অংশ তৈরি হয় বাংলাদেশের বিভিন্ন কারখানায়।

কিন্তু গত একমাস ধরে তাদের সব স্টোর বন্ধ। এমনকি অনলাইনেও বেচাকেনা বন্ধ করে দিয়েছে প্রাইমার্ক। তাদের ওয়েবসাইটে এখন পরামর্শ মিলছে আপনার আলমারির পুরোনো পোশাক কিভাবে নতুন করে ব্যবহার করবেন, কিভাবে ঘর সাজাবেন আর এই লকডাউনের মধ্যে একা একা জন্মদিন পালন করবেন, সেরকম নানা বিষয়ে।

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান,

প্রাইমার্কের ব্যবসায় ধস সরাসরি আঘাত হানবে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে

প্রাইমার্কের পতন কেন বাংলাদেশের জন্য দুঃসংবাদ?

প্রাইমার্ককে মনে করা হয় যুক্তরাজ্যের হাইস্ট্রীটের সবচেয়ে ব্যবসা সফল একটি ব্রান্ড হিসেবে। এদের পুরো বিজনেস মডেল গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সস্তা শ্রমকে পুঁজি করে। সেই সঙ্গে তাদের আছে দারুণ দক্ষ এক সাপ্লাই চেইন। ফাস্ট ফ্যাশন বলে যে কথাটা এখন চালু পোশাক শিল্পে, প্রাইমার্ক তার অন্যতম পথিকৃৎ এবং সুবিধাভোগী।

ফাস্ট ফ্যাশন মানে হচ্ছে নতুন ডিজাইনের এমন পোশাক, যা এত সস্তায় কেনা যাবে যে এক মৌসুম পরেই তা ছুঁড়ে ফেলে দেয়া যাবে। পোশাকের মানের চেয়ে কত সস্তায় তা তৈরি করা যায়, সেটাকেই প্রাধান্য দেয় প্রাইমার্কের মতো ব্রান্ড।

প্রাইমার্কের মোট কর্মী সংখ্যা ৬৮ হাজার। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান স্বীকার করছেন যে, যদি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকার আর্থিক সাহায্য না দিতো, তাদের বেশিরভাগ কর্মী এতদিনে ছাঁটাই এর শিকার হতো।

প্রাইমার্ক এরই মধ্যে বাংলাদেশে তাদের সব অর্ডার বাতিল করে দিয়েছে। তাদের স্টকে অবিক্রিত রয়ে গেছে বিপুল পরিমান পোশাক। প্রাইমার্ক দাবি করছে যেসব অর্ডারের পণ্য এরই মধ্যে সরবরাহ করা হয়ে গেছে, সেগুলোর দাম তারা পরিশোধ করে দিয়েছে।

কোম্পানিটি আরও বলছে, যেসব কারখানায় প্রাইমার্কের পোশাক তৈরি হয়, সেই শ্রমিকদের জন্য ‘বিশেষ তহবিল’ গঠন করা হবে।

প্রাইমার্ক আশা করছে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আসার পর তারা আবার দোকান খুলতে পারবে। কিন্তু তখনো সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং এর যেসব নিয়ম মানতে হবে, তার ফলে যে বেচা-বিক্রি আগের মতো থাকবে না, সেটা তারা স্বীকার করছে।

এর মানে লকডাউন উঠে গেলেও সংকট কাটছে না।

আজ মঙ্গলবার লন্ডনের শেয়ার বাজারে প্রাইমার্কের মালিক এবি ফুডসের দর আরও ৪ দশমিক ২ শতাংশ পড়ে গেছে। এই কোম্পানির বাজার মূল্য এখন ১ হাজার ৫শ কোটি পাউন্ড। গত ফেব্রুয়ারিতে তাদের শেয়ারের দাম যেখানে ছিল ২৭ পাউন্ডের বেশি, এখন তা নেমে এসেছে ১৯ পাউন্ডে।

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান,

প্রাইমার্কের তিনশোর বেশি স্টোর গত এক মাস ধরে বন্ধ।

ব্রিটেনের হাইস্ট্রীটে অন্য ব্রান্ডের তুলনায় প্রাইমার্ককে খুবই সফল ব্যবসা বলে গণ্য করা হয়। তাদেরই যখন এই অবস্থা, তখন অন্য ব্রান্ডগুলোর জন্য আরও ভয়ংকর দুঃসংবাদ দেখতে পাচ্ছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

ইন্টারএ্যাকটিভ ইনভেস্টর নামের একটি প্রতিষ্ঠানের রিচার্ড হান্টার বলেন, প্রাইমার্কের এই ব্যবসায়িক ক্ষতি, তা যত ক্ষণস্থায়ীই হোক না কেন, এটি এক বিরাট ধাক্কা।”

পোশাক শিল্প খাতের সব বড় বড় ব্রান্ডে এই একই কাহিনিই শোনা যাচ্ছে।

অনেক ব্রান্ডই তাদের পোশাক প্রস্তুতকারক এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আবেদন জানাচ্ছে, এখনই যেন দাম পরিশোধ করতে না হয়। অর্থ পরিশোধের সময়সীমা যেন একটু পিছিয়ে দেয়া যায়। আর এর পরিণামে বাংলাদেশের মতো দেশের পোশাক শিল্প এখন চরম সংকটে পড়েছে।

রুবানা হক: ‘আমাদের পায়ের নীচের মাটি সরে গেছে‌’

গত ১৯শে এপ্রিল বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র প্রেসিডেন্ট রুবানা হকের এক খোলা চিঠি প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। এতে রুবানা হক বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের পরিত্যাগ না করার জন্য আন্তর্জাতিক ব্রান্ডগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

খোলা চিঠিতে রুবানা হক বলেছেন, রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশে গার্মেন্টস মালিকরা যেসব নতুন ঝকঝকে কারখানা গড়ে তুলেছিলেন, সেগুলোর মেশিন আর চালু হবে কীনা সেটাই এখন তাদের চিন্তা।

“তাদের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেছে। পোষাক ব্রান্ডগুলো কারখানা মালিকদের অনুরোধে কোন সাড়াই দিচ্ছে না। তারা ক্রয় চুক্তির “অনিবার্য দুর্যোগের” ধারা দেখিয়ে দিয়ে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বা অর্ডার বাতিল করছে।”

রুবানা হক লিখেছেন, কেবল মার্চ মাসেই পোশাক রফতানি কমে গেছে ৩০ দশমিক ১৯ শতাংশ। এপ্রিল মাসে কমেছে ৭৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ। মার্চ হতে মে মাসের মধ্যে রফতানি কমে যাবে ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৪৯০ কোটি ডলার।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

প্রাইমার্কের অনেক পণ্য তৈরি হয় বাংলাদেশে।

এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১৪০টি কারখানা ৩১৭ কোটি ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছে। এর ফলে সরাসরি ক্ষতির শিকার হবে ২২ লাখ শ্রমিক।

রুবানা হক দাবি করছেন, শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ তাদের কাছে সবসময় অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার সব রফতানি খাতের জন্য যে ৫৮৯ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, তার প্রায় ৮৪ শতাংশ তৈরি পোশাক খাত পাবে।

কিন্তু পোশাক শিল্প খাতে প্রতি মাসে প্রায় ৪২৩ মিলিয়ন ডলারের বেতন দিতে হয়। কাজেই, তাঁর মতে সরকারি প্রণোদনায় বড় জোর এক মাসের বেতন চালানো যাবে। কাজেই যখন সব অর্ডার বাতিল হয়ে যাচ্ছে, রফতানি একদম বন্ধ, তখন বাংলাদেশের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ।

রুবানা হক বলেছেন, চাপে পড়ে কিছু ব্রান্ড তাদের পছন্দের সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে কথা বলছে। কিন্তু অন্য অনেক সরবরাহকারী বাদ পড়েছে। তিনি বলছেন, এটা কেবল অনৈতিক নয়, এটি সাপ্লাই চেইনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।

তিনি তার খোলা চিঠি শেষ করেছেন এভাবে, “এপ্রিল এখন বাংলাদেশের জন্য নিষ্ঠুরতম মাস। কিন্তু সামনে আছে আরও এক বিধ্বংসী গ্রীস্ম।”