করোনাভাইরাস: চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে

  • কাদির কল্লোল
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ঢাকার একটি হাসপাতাল-

ছবির উৎস, NURPHOTO

ছবির ক্যাপশান,

ঢাকার একটি হাসপাতাল- ফাইলফটো

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত যেসব রোগী শনাক্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে ১৫ শতাংশই চিকিৎসক এবং নার্স সহ স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন বলে জানিয়েছে চিকিৎসকদের একটি সংগঠন।

বাংলাদেশ চিকিৎসক ফাউন্ডেশন নামের এই সংগঠনটি বলেছে, এই হারে স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হলে এবং তাদের সংখ্যা কমে গেলে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।

চিকিৎসকরা তাদের সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং আবাসন সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তাদের উদ্বেগ তুলে ধরছেন।

সরকার বলছে, স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট যাতে না হয়, সেভাবে কৌশল ঠিক করে কাজ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ২০৫ জন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়াও আক্রান্ত হয়েছেন ১০০ জনের বেশি নার্স।

বাংলাদেশ চিকিৎসক ফাউন্ডেশন সারাদেশের তথ্য সংগ্রহ করে শনাক্ত হওয়া এই স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি তালিকা তৈরির কথা জানিয়েছে।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে এখন সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ৭৫ হাজার চিকিৎসক রয়েছেন এবং নার্সের সংখ্যা ৩২ হাজারের মতো হবে।

চিকিৎসক ফাউন্ডেশনের প্রধান সমন্বয়কারী ডা: নিরুপম দাস বলছিলেন, এখন যে হারে চিকিৎসক সহ স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাতে স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট দেখা দিতে পারে।

"বাংলাদেশে চিকিৎসকদের মধ্যে আক্রান্তের হার ১৩শতাংশের কাছে। আর নার্স সহ হিসাব করলে আক্রান্ত ১৫ শতাংশ হবে। এখন স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্তের যদি এই হার অব্যাহত থাকে, তাহলে ১৫ থেকে ২০দিন পর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়বে।"

তিনি আরও বলেছেন, "আমরা সরকারের কাছে দাবি করেছিলাম, কোয়ালিটি পিপিই দেয়ার জন্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে মানের কথা বলছে, আমরা সেই মানের পিপিই চাচ্ছি।

"প্রথমদিকে (পিপিই) সেই মানের ছিল না। আমরা আমাদের এক জরিপে দেখলাম, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ৯৯শতাংশ চিকিৎসকই সুরক্ষার কোনো সরঞ্জাম পাননি।"

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকের মাঝে তাদের সুরক্ষার প্রশ্নে এখনও উদ্বেগ রয়েছে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শুরুর দিকে চিকিৎসক সহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা পোশাক এবং মাস্ক না পাওয়ার ব্যাপক অভিযোগ ছিল।

সেই প্রেক্ষাপটে সরকার পর্যাপ্ত পিপিই এবং মাস্কের ব্যবস্থা করার কথা তুলে ধরে। কিন্তু সেগুলোর মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

শুধু করোনাভাইরাসের চিকিৎসা নয়, অন্য রোগের চিকিৎসা দিতে গিয়েও অনেক স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে সব ধরণের চিকিৎসা সেবা স্থবির হয়ে পড়েছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের গাইনি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তৃপ্তি দাস বলেছেন, "পিপিই বলতে আমি বলতে চাচ্ছি, সম্পূর্ণ সুরক্ষা। আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমরা সব জায়গায় সঠিকভাবে সুরক্ষিত না।

''আমরা আউটডোর থেকে শুরু করে ইনডোরে কাজ করি। প্রতিটি জায়গাতে মনে হচ্ছে আমরা ঐভাবে সুরক্ষিত না। সব কিছু মিলিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই," বলছেন তৃপ্তি দাস।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক একজন পরিচালক ডা: বে-নজীর আহমেদ বলেছেন পরিকল্পনার অভাবের কথা।

"বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে চিকিৎসক এবং নার্স সহ স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কম। সেখানে তাদের আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে সংকট বাড়বে। চিকিৎসক সহ স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কমে গেলে বিকল্প কী হবে-অথবা স্বাস্থ্যকর্মীরা যাতে নিরাপদ থেকে সেবা চালু রাখতে পারেন, এসব বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা নেই বলে আমার মনে হয়।"

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ এসব অভিযোগ মানতে রাজি নন।

তিনি দাবি করেছেন, সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে।

"অবশ্যই সরকারের কৌশল আছে। আমরা বলেছি যে ডাক্তারদের এমনভাবে ভাগ করে দায়িত্ব দিতে হবে, সেটা হলো, তারা ১৪দিন কাজ করবেন। এরপর তারা ১৪দিনের কোয়ারেন্টিনে যাবেন। তারপর তারা পরিবারের সাথে সময় কাটাবেন। আর এই সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যাচটা কাজ করে কোয়ান্টিন যাবে। তাদের পরিবারের সাথে সময় কাটানোর শেষে আগের ব্যাচটি আবার কাজে ফিরে আসবে। এই ভাবে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।"

অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ আরও বলেছেন, স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কমে গেলে অবসরে যাওয়া বা ব্যক্তিগতভাব প্রাকটিস করা চিকিৎসকদের কাজে লাগানোর চিন্তাও রাখা হয়েছে।

তবে ঢাকা এবং জেলা শহরগুলোতে চিকিৎসক সহ স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন হাসপাতালে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সেবা দিতে যাচ্ছেন, তখন তাদের থাকার ব্যবস্থা নিয়েও সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, আবাসন সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।