করোনা ভাইরাস: কোভিড শনাক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে হুগলীতে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা বাধালো কারা?

  • অমিতাভ ভট্টশালী
  • বিবিসি বাংলা, কলকাতা
তেলেনিপাড়ার ঘরবাড়ি

ছবির উৎস, Sajid Pervez

ছবির ক্যাপশান,

চটকল এলাকায় দাঙ্গায় মূলত বহিরাগতরাই অংশ নিয়েছে বলে অভিযোগ

ভারতে পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় এ সপ্তাহের গোড়ার দিকে যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হয়েছে, তাতে মূলত বহিরাগতরাই অংশ নিয়েছিলেন বলে স্থানীয় মানুষরা অভিযোগ করছেন। মুখে কাপড় ঢেকে কারা সেদিন দোকান-বাড়িতে ভাঙচুর আর আগুন দিয়েছিল, তা অবশ্য বলতে পারেন নি দাঙ্গা কবলিত এলাকার মানুষরা।

হুগলী জেলার চটকল এলাকা তেলেনিপাড়ায় করোনা সংক্রমিত কয়েকজন মুসলমানের কোয়ারেন্টিনে না যেতে চাওয়া নিয়ে যে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল রবিবার, তা সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে পরিণত হয় মঙ্গলবার দুপুরে।

সেদিন হিন্দু আর মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষেরই বাড়ি-দোকানে ভাঙচুর চালানো হয়, আগুন দেওয়া হয় - বোমা পড়ে অজস্র।

সেদিনের ওই দাঙ্গায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৩০ জনেরও বেশি মানুষকে।

কিন্তু স্থানীয় মানুষরা বলছেন, যারা সেদিন দাঙ্গা বাধিয়েছিল, তারা বেশিরভাগই বহিরাগত দুষ্কৃতি, যদিও কিছু স্থানীয় যুবকও দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে ছিল।

এ নিয়ে বেশিরভাগ স্থানীয় বাসিন্দাই মুখ খুলতে চাইছেন না - বিশেষত হিন্দু ধর্মাবলম্বী যতজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি, তাদের প্রায় কেউই ফোনে মতামত দিতে চান নি, অথবা এড়িয়ে গিয়েছেন।

তবে একজন স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছিলেন, "মঙ্গলবার দুপুরে যখন গন্ডগোল লাগল, আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওখানে যাই। দেখছিলাম যারা বাড়ি ভাঙছিল বা আগুন দিচ্ছিল, তাদের অনেককেই চিনি না। ওদের দলে এলাকার কিছু কম বয়সী ছেলে ছিল, তবে আসল যারা আগুন দেওয়া বা দোকান বা বাড়ি ভাঙা- এগুলো করছিল, তারা বেশিরভাগই বাইরের ছেলে।"

"যেরকম ভাবে তারা বোমা ছুঁড়ছিল বা ভাঙচুর করছিল, তাতে বোঝাই যাচ্ছিল ওরা পেশাদার লোক," বলছিলেন তেলেনিপাড়ার ওই বাসিন্দা।

ছবির উৎস, Sajid Pervez

ছবির ক্যাপশান,

দাঙ্গায় ঘরবাড়ি হারিয়ে অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে এলাকার কয়েকশ মুসলিম ও হিন্দু পরিবার

আরেক প্রবীণ মুসলিম বাসিন্দা বলছিলেন যে তার বাড়ির দিকে এগিয়ে আসা এক দল যুবকের বেশিরভাগেরই মুখ কাপড়ে ঢাকা ছিল - তাই তারা কারা সেটা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারেন নি।

তার কথায়, "দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ হল্লা করতে করতে আমাদের পাড়ার দিকে আসতে থাকে অনেক ছেলে। প্রায় আমার বাড়ির সামনে চলে আসে। আমাকে চড় থাপ্পড়ও মারে। যারা এসেছিল হামলা করতে, ওদের মুখ ঢাকা ছিল। তাই চিনতে পারি নি কারা তারা।"

"পাশের হিন্দু প্রতিবেশী দুধ বিক্রেতরাই এগিয়ে আসে আমাদের বাঁচাতে। ওরাও মার খেয়েছে আমাদের রক্ষা করতে গিয়ে। ওরাই বলছিল যে ওই ছেলেগুলো সব বাইরে থেকে এসেছে, আমাদের এলাকার লোক নয় তারা," জানাচ্ছিলেন চটকলের চাকরি থেকে অবসর নেওয়া ওই প্রবীণ ব্যক্তি।

তার প্রতিবেশি এক হিন্দু নারী বলছিলেন, "এই পাড়ায় আমরা হিন্দু - মুসলমান সবাই একসঙ্গেই থাকি। পাড়ায় অনেক বয়স্ক মানুষ আছেন - আমার বাবাও বয়স্ক আর খুবই অসুস্থ। আমরা প্রথম থেকেই ঠিক করেছিলাম, অন্য যেখানে যা হয় হোক, আমাদের পাড়ায় কোনও গন্ডগোল হতে দেব না। সেই হিসাবেই প্রতিবেশী কাকুদের বাড়িটা বাঁচাতে আমাদের বাড়ি থেকে সবাই এগিয়ে গিয়েছিল।"

তিনিও বলছিলেন যে কারা সেদিন হামলা করতে এসেছিল, সেটা সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারেন নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের এই অভিযোগ প্রসঙ্গে চন্দননগরের পুলিশ কমিশনার হুমায়ূন কবীর জানিয়েছেন যে তারাও এই তথ্য পেয়েছেন যে বাইরে থেকে আসা দুষ্কৃতিরাই মূলত আগুন লাগানো - ভাঙচুর বা বোমাবাজিতে যুক্ত ছিল।

নানা সূত্র থেকে তারা খোঁজ খবর করতে শুরু করেছে যে কারা ওই হামলায় জড়িত ছিল সেদিন।