করোনাভাইরাস: বাংলাদেশে 'মুভমেন্ট পাস' চালুর উদ্যোগ, যা দরকার হবে লকডাউনের সময় বাইরে বের হতে

  • মুন্নী আক্তার
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
জরুরী প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দিতে তৈরি করা হয়েছে এই টুলটি।
ছবির ক্যাপশান,

জরুরী প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দিতে তৈরি করা হয়েছে এই টুলটি।

করোনাভাইরাস মহামারির সময় লকডাউনে জরুরী প্রয়োজনে বাইরে বের হতে নাগরিকদের চলাচলের জন্য মুভমেন্ট পাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।

এই মুভমেন্ট পাস নিতে হবে বাইরে বের হবার উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে, অনলাইনে আবেদন করে

এরই মধ্যে অনলাইনে আবেদনের একটি ডেমো ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে পুলিশ।

অবশ্য এটি কার্যকর হতে আরো কয়েকদিন সময় লাগবে, জানাচ্ছেন পুলিশের মুখপাত্র সোহেল রানা।

মি. রানা বলেন, "এটি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। পরীক্ষামূলকভাবে শুধু পুলিশ কমান্ডারদের জন্য চালু করা হয়েছে"।

যেভাবে আবেদন করতে হবে মুভমেন্ট পাসের:

এর আগে জানানো হয়, https://movementpass.police.gov.bd এই ঠিকানায় গিয়ে মুভমেন্ট পাসের জন্য আবেদন করা যাবে।

বাংলাদেশ পুলিশের আইসিটি বিভাগ এই পুরো প্রক্রিয়াটির ব্যবস্থাপনায় রয়েছে।

বলা হচ্ছে যে, জরুরি প্রয়োজনে এই টুলটির সাহায্যে পুলিশের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে লকডাউন পরিস্থিতিতে বের হওয়ার অনুমতি নেয়া যাবে।

তবে প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়ার পর শর্তসাপেক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই অনুমতি দেয়া হবে।

সেখানে মুভমেন্ট পাসের আবেদন বাটনে ক্লিক করলে আবেদনকারীর মোবাইল নম্বর চাওয়া হয়। সেটি প্রবেশ করালে ওই নম্বরে একটি ওটিপি বা ক্ষুদে বার্তায় চার অঙ্কের একটি নম্বর চলে আসে। এই নম্বরটি দিলে মুভমেন্ট পাসের আবেদন করার জন্য একটি পেইজ আসবে যেখানে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আবেদন করা যাবে।

মুভমেন্ট পাসের আবেদনের জন্য আবেদনকারীর নাম, লিঙ্গ, বয়স, ছবি, পরিচয়পত্র ছাড়াও কোন থানা এলাকা থেকে কোন থানা এলাকায় যাবেন, যাওয়ার কারণ, পাস ব্যবহারের তারিখ ও সময়, পাসের মেয়াদ শেষের তারিখ ও সময় ইত্যাদি তথ্য সন্নিবেশিত করতে হয়।

যাওয়া এবং আসার জন্য আলাদা আলাদা পাসের জন্য আবেদন করতে হবে। এছাড়া প্রতিবার যাতায়াতের জন্য পাস নিতে হবে এবং একটি পাস একবারই ব্যবহার করা যাবে।

এই পাসটি মোবাইল ফোনেই পাঠানো হবে।

এই পাসে আপনি কতবার পাস নিয়েছেন, আপনার বয়স, আইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর, আপনার পাস নেয়ার কারণ, বের হয়ে জরুরী কাজ শেষ হতে কত সময় লাগবে ইত্যাদি তথ্য দেয়া থাকে।

যেসব কারণে বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া যাবে সেগুলো হচ্ছে, মুদি মালামাল কেনাকাটা, কাঁচা বাজার, ওষুধ কেনা, চিকিৎসা, চাকরি, কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ, ত্রাণ বিতরণ, পাইকারি বা খুচরা ক্রয়, পর্যটন, মৃতদেহ সৎকার, ব্যবসা এবং অন্যান্য কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কেমন প্রতিক্রিয়া আসছে?

মুভমেন্ট পাসের বিষয়টিকে বেশ ইতিবাচকভাবেই দেখছেন গৃহিনী ফারজানা খালিদ। তিনি বলছেন, পুলিশ যদি এ বিষয়টি সঠিকভাবে কার্যকর করতে পারে তাহলে এই ব্যবস্থা খুবই ভাল হবে।

মানুষকে লকডাউনের সময় অনেকবার বলেও ঘরে রাখা যায়নি। তার মতে, এই পাস চালু হলে মানুষকে হয়তো বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়াটা আটকানো যাবে।

"মানুষ আধা কেজি ডাল কিনতে বাইরে বের হয়। জিজ্ঞেস করলে বলে জরুরি কাজে বের হয়েছি। মানুষ আসলে ঘরে থাকতে থাকতে বোর হয়ে গেছে। একটা উসিলা পেলেই মানুষ বের হচ্ছে।"

এটা খুবই ভাল হইছে এই কারণেই। কিন্তু এটা কার্যকর না হলে কোন লাভ হবে না।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আইটি সাপোর্ট বিভাগে কাজ করেন মো. হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, এরইমধ্যে এই পাস পেতে আবেদন করতে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

মি. কবির বলেন, "যারা টেকনিক্যাল টিমে কাজ করে তাদের তো বাইরে যেতে হয় কারণ তারা অপটিক্যাল ফাইবার নিয়ে কাজ করে। সামনে যেহেতু লম্বা ছুটি, তখন সাপোর্ট দিতে হবে বলেই এই আবেদনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।"

তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ ইতিবাচক। কারণ এতে করে যারা অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যেতো তাদেরকে ঘরে রাখা যাবে।

মুভমেন্ট পাস কি আসলেই দরকার?

এদিকে, মুভমেন্ট পাস এমন এক সময় আসছে যখন লকডাউন শিথিলের পথে যাচ্ছে সরকার। বিভিন্ন ধরণের কারখানা, দোকান-পাট খোলার পাশাপাশি ঈদের আগে সীমিত পরিসরে মার্কেট খোলা রাখারও ঘোষণা এসেছে।

এমন পরিস্থিতিতে মুভমেন্ট পাস কি আসলেই দরকার কিনা এমন প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন বলেন, এটা খুবই আশ্চর্যজনক বিষয়।

তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, বাংলাদেশে কি আসলেই কখনো লকডাউন ছিল?

মানুষকে বের হতে হলে পাস নিতে হবে কিন্তু মার্কেট, ব্যাংক খোলা রাখা হচ্ছে। এটা হয়রানিমূলক।

"একদিকে সব খুলে দিবো, আর মানুষকে বলবো তোমরা ঘর থেকে বের হতে পারবা না। এই দ্বৈততা আসলে হয় না। সরকারকে এটা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।"

তিনি বলেন, সরকার লকডাউন বলছে না। সাধারণ ছুটি বলা হচ্ছে। এখন ঈদের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, তাহলে মানুষ বের হবেই।

এছাড়া রাষ্ট্র এমন কোন ব্যবস্থা করেনি যাতে মানুষ ঘরে থাকলে তার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঘরে থেকেই পেতে পারে। ফলে মানুষকে জীবন-জিবীকার জন্য বের হবেই।

এছাড়া যে পাস নিতে বলা হচ্ছে সেটিও নিতে হবে ইন্টারনেট এবং মোবাইলে। কিন্তু যাদের কাছে এই সুবিধা নেই, সে কিভাবে পাস নেবে সে বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

"সবার তো ইন্টারনেট ডেটা কেনার মতো অবস্থা নেই। তাহলে সে কিভাবে পাস নেবে আর কয়বার নেবে?"

তিনি বলেন, এ ধরণের হয়রানিমূলক পদক্ষেপ না নিয়ে বরং সহজ কথাটি সহজভাবে বলতে হবে। আর সেটি হচ্ছে, সরকারকে ঘোষণা করতে হবে যে লকডাউন চলছে, বের হওয়া যাবে না।

"সরকারকে বলতে হবে, আমরা একটা পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি, এটা আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে, আপনার নিজের এবং প্রিয়জনদের জীবন বাঁচানোর জন্য ঘরে থাকুন।"

এটার জন্য কোন পাসের দরকার নেই বলে মনে করেন ড. কাবেরী গায়েন।

বিবিসি বাংলার আরো খবর পড়ুন: