করোনা ভাইরাস: নেপাল সীমান্তে আটকা পড়েছে শত শত ভারতীয় শ্রমিক

  • অমিতাভ ভট্টশালী
  • বিবিসি, কলকাতা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে নেপালে কাজ করতে যাওয়া কয়েক'শো শ্রমিক তাদের পরিবার ও শিশু সহ দুই দেশের সীমান্তে আটকিয়ে আছেন

ছবির উৎস, পর্বত পোর্তেল

ছবির ক্যাপশান,

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে নেপালে কাজ করতে যাওয়া কয়েক'শো শ্রমিক তাদের পরিবার ও শিশু সহ দুই দেশের সীমান্তে আটকিয়ে আছেন

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে নেপালে কাজ করতে যাওয়া কয়েক'শো শ্রমিক তাদের পরিবার ও শিশুসহ দুই দেশের সীমান্তে আটকে আছেন। তিন চার দিন ধরে তারা রাস্তাতেই থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের খাবার যোগাচ্ছে স্থানীয় কিছু সংগঠন। ভারত-নেপাল সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে আছে যে এসএসবি বাহিনী, তারাই ওই শ্রমিকদের পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে দিতে অস্বীকার করছে বলে অভিযোগ আটকে পড়া শ্রমিকদের।

নেপালের সীমান্ত শহর কাকরভিটায় আটকে পড়া এক ভারতীয় নারী মল্লিকা খাঁ। তার স্বামী পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর থেকে নেপালের ধারাণে কাজে গিয়েছিলেন। করোনা সংক্রমণের জের লকডাউন হয়ে যাওয়ায় কাজ হারিয়েছেন, তাই কড়াকড়ি শিথিল হতেই দেশে ফেরার চেষ্টা করছেন।

কাঁদতে কাঁদতে বিবিসিকে বলছিলেন, "রাস্তায় পড়ে আছি তিন দিন ধরে। আমার বাচ্চাটা দুদিন দুধ খেতে পায় নি।"

মিসেস খাঁ যেখান থেকে এসেছেন, সেই নেপালের ধারাণ থেকে সীমান্ত অবধি পৌঁছিয়ে আটকে গেছেন পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক কৃষ্ণ মন্ডল, বা হুগলী জেলার আখতার মল্লিক।

আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, পর্বত পোর্তেল

ছবির ক্যাপশান,

এই শ্রমিকদের অনেকেই নেপালের ধারাণে কাজে গিয়েছিলেন। করোনা সংক্রমণের জের লকডাউন হয়ে যাওয়ায় কাজ হারিয়েছেন, তাই কড়াকড়ি শিথিল হতেই দেশে ফেরার চেষ্টা করছেন।

"লকডাউনের ফলে আমাদের হাতে কাজ নেই। এতদিন পর নেপাল সরকার আমাদের দেশে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। সেজন্যই বর্ডার অবধি এসে দেখছি আমাদের পুলিশই দেশে ঢুকতে দিচ্ছে না। আমরা তো যা টেস্ট করতে বলবে, যেখানে কোয়ারেন্টিনে রাখবে, তাতেই রাজী। কিন্তু দেশে যেতে দেওয়া হোক আমাদের," বলছিলেন মি. মন্ডল।

আখতার মল্লিকের কথায়, "তিন দিন ধরে এভাবে পড়ে আছি আমরা। বেশ কয়েকজন গর্ভবতী আছেন, বাচ্চারা আছে। কখনও ভীষণ গরম, কখনও বৃষ্টি হচ্ছে। কী দোষ করেছি আমরা যে এভাবে ভুগতে হবে আমাদের?"

এত মানুষকে কোথাও আশ্রয় দেওয়ার উপায় নেই ওই ছোট শহরে। তাই মঙ্গলবার থেকে কাকরভিটার বেশ কিছুটা আগেই ভারতীয় শ্রমিকদের সীমান্তে বয়ে নিয়ে আসা বাসগুলি আটকে দেওয়া হচ্ছে।

কাকরভিটায় যারা পৌঁছেছেন, তাদের স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তিনবেলা খাবার দিচ্ছে। কিন্তু মেদিনীপুরের শ্রমিক অমিয় আদকের মতো যারা কাকরভিটা শহরে আসতে পারেন নি, তাদের সারাদিন কিছুই জোটেনি।

সমাজকর্মী সুভদ্রা ভট্টরাই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রায় সাড়ে আটশো মানুষের খাবার রান্নার তদারক করতে করতেই জানালেন, "কী অবস্থায় মানুষগুলো রয়েছে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। নেপাল সরকার বা আমরা তো যতটা পারছি করছি।"

"এত মানুষকে কোনও ছাদের নীচে যে আশ্রয় দেব, সে উপায় নেই! ছোট জায়গা এটা। অনেকে তো খোলা সীমান্ত পেরিয়ে রাতের দিকে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ধরা পড়লেই লাঠি দিয়ে মেরে আবার ফেরত পাঠাচ্ছে ওদেশের বাহিনী। বুঝতে পারছি না পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেন এদের ফেরত নিচ্ছে না!"

এখন নেপাল সীমান্তে শয়ে শয়ে ভারতীয় শ্রমিক আটকে আছেন, আর এর আগে বাংলাদেশের নির্মীয়মাণ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কাজ করতে যাওয়া ভারতীয় শ্রমিকদের দেশে ফেরার জন্য আন্দোলন করতে হয়েছিল।

ছবির উৎস, পর্বত পোর্তেল

ছবির ক্যাপশান,

আটকে পড়া শ্রমিকদের খাবারের ব্যবস্থা করছে নেপাল সরকার ও স্বেচ্ছাসেবীরা

তার পরে অবশ্য সেখান থেকে তিন দফায় ৫৮৮ জন ভারতীয় শ্রমিককে ফিরিয়ে এনেছে ভারত। আরও প্রায় ১২শ শ্রমিক ফেরার অপেক্ষায় আছেন।

পরিযায়ী শ্রমিকদের সহায়তা দিচ্ছে যেসব সংগঠন, সেগুলিরই অন্যতম বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ অভিযোগ করছে নেপাল বা বাংলাদেশে গরীব শ্রমিকদের যখন রাস্তায় রাত কাটাতে হচ্ছে বা দেশে ফেরার জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে, তখনই ধনী ভারতীয়দের জন্য বিমান বা জাহাজের ব্যবস্থা করছে সরকার।

ওই সংগঠনটির প্রধান সামিরুল ইসলাম বলছিলেন, করোনা সংক্রমণ নিয়ে বেবেই এই দ্বিচারিতা দেখা যাচ্ছে

"আমরা এই লকডাউনের প্রথম থেকেই দেখছি সরকারের দুরকম ব্যবস্থা। বিদেশ থেকে বিমানে করে ধনীদের নিয়ে আসা হল, কিন্তু এই গরীব মানুষগুলোকে এখন নেপালে আটকে থাকতে হচ্ছে। আবার দেশের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে বড়লোকদের জন্য বিমান চালু হল, অন্যদিকে রোজ পায়ে হেঁটে বা যে কোনও ভাবে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরতে গিয়ে মৃত্যুর কবলে পড়ছেন। আবার এই গরীব শ্রমিকদের দিকেই আঙ্গুল তোলা হচ্ছে যে তারাই বাড়ি ফিরে করোনা ছড়াচ্ছেন," বলছিলেন মি. ইসলাম।

নেপাল প্রশাসন বলছে তাদের দিক থেকে আটকে পড়া ওই শ্রমিকদের ছেড়ে দিতে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু ভারতীয় প্রশাসনের সবুজ সঙ্কেত না পেলে তারা এদের ছাড়তে পারবেন না।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক সিনিয়র কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে বিবিসিকে জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে ফেরার পরে ১৪ দিন হোটেলে বা সরকারি ব্যবস্থায় বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশ জারি হয়েছে।

নেপালের সীমান্তবর্তী ছোট্ট জায়গা পানিট্যাঙ্কিতে শয়ে শয়ে মানুষের জন্য সেই ব্যবস্থা কী করে করা যাবে!

তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার দিল্লির সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে যে ওই নির্দেশ শিথিল করা যায় কী না, তা নিয়ে। চেষ্টা করা হচ্ছে খুব দ্রুত একটা সমাধান বার করতে।