যুক্তরাষ্ট্রের বিক্ষোভ কেন ছড়িয়ে পড়ছে অস্ট্রেলিয়ায়?

অস্ট্রেলিয়ার বিক্ষোভকারীরা বলছেন, তাদের দেশেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক বৈষম্যের ঘটনা ঘটছে

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান,

অস্ট্রেলিয়ার বিক্ষোভকারীরা বলছেন, তাদের দেশেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক বৈষম্যের ঘটনা ঘটছে

যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে আরেক মহাদেশ অস্ট্রেলিয়াতেও। যেখানে পুরো দেশ জুড়েই 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।

তবে অস্ট্রেলিয়ার এই বিক্ষোভকারীরা শুধুমাত্র যে যুক্তরাষ্ট্রের আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছেন, তাই নয়, বরং এই আন্দোলনকে তারা দেশটিতে হেফাজতে আদিবাসীদের মৃত্যুর ঘটনায় তাদের ক্ষোভ প্রকাশের একটা সুযোগ হিসাবে নিয়েছেন।

শনিবার সিডনিতে 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। পাঁচ বছর আগে কারাগারে একজন আদিবাসী ডেভিড ডাংগে মারা যাওয়ার ঘটনায়, তার মা লিটোনা ডাংগে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।

এখনকার পরিস্থিতি তাহলে কী?

অস্ট্রেলিয়ায় হেফাজতে কতো আদিবাসীর মৃত্যু ঘটেছে?

তিন দশক আগে এসব ঘটনায় একটি বড় ধরনের তদন্ত শুরু হওয়ার পরেও, এখনো এই ক্ষেত্রে সহজলভ্য কোন তথ্য-উপাত্ত নেই।

১৯৮৭ সালে 'কমিটি টু ডিফেন্ড ব্ল্যাক রাইটস' দেখতে পায় যে, প্রতি ১১দিনে একজন আদিবাসীর হেফাজতে মৃত্যু হচ্ছে।

এর ফলে ১৯৯১ সালে একটি রাজকীয় কমিশন গঠিত হয়, যেটি কারাবাসে থাকা আদিবাসী এবং ৯৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করতে শুরু করে।

সেই অনুসন্ধান শেষে তিনশোর বেশি সুপারিশ করা হয়, যদিও তার বেশিরভাগের বাস্তবায়ন হয়নি। সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় সেগুলোকে অপর্যাপ্ত বা বিভ্রান্তিমূলক বলে সমালোচনাও করা হয়েছে।

গার্ডিয়ান পত্রিকার বিশ্লেষকরা দেখতে পেয়েছেন, ওই তদন্তের পরবর্তীতে অন্তত ৪৩২ জন আদিবাসীর হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে।

আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

সিডনিতে বিক্ষোভকারীরা আদিবাসীদের মৃত্যুর ঘটনাগুলো তুলে ধরছেন

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের কি অহেতুক কারাগারে আটকে রাখা হচ্ছে?

এক কথায় বলতে গেলে, ব্যাপকভাবে। অস্ট্রেলিয়ার পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে মোট বন্দীর ৩০ শতাংশই আদিবাসী, যদিও মোট জনসংখ্যার বিচারে তারা মাত্র তিন শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে যতো আফ্রো-আমেরিকান বন্দী রয়েছে, এটি তার তুলনায় চারগুণ বেশি।

এখানে আমলে নেয়ার মতো আরো কিছু বিষয় রয়েছে। গত বছর একটি কমিটির শুনানিতে বেরিয়ে আসে যে, নর্দার্ন টেরিটরিতে আটকাবস্থায় থাকা প্রতিটি শিশুই হচ্ছে আদিবাসী।

সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানরা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি কারাগারে বন্দী মানুষ-যদিও এর লেখক জানিয়েছেন, বিশ্বের অনেক কারাগারের তথ্য গবেষণায় পাওয়া যায়নি।

এর আগে কবে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে?

অস্ট্রেলিয়ায় অতীতে হেফাজতে আদিবাসীদের মৃত্যুর ঘটনায় বিক্ষোভ হয়েছে। এরকম আলোচিত কয়েকটি ঘটনা হলো:

  • কুমানজাভি ওয়াকার, ১৯-গত বছর নভেম্বর মাসে একটি প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রেপ্তার করার সময় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
  • তানইয়া ডে, ৫৫- মদ্যপান করে ট্রেনে ঘুমিয়ে পড়ার অভিযোগে ২০১৭ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশি হেফাজতে মারাত্মক আহত হন।
  • ডেভিড ডাংগে, ২৬- সিডনির একটি কারাগারে পাঁচজন পুলিশ অফিসার তাকে চেপে ধরার পর তিনি মারা যান। সে সময় তিনি বারবার কান্না-জড়িত গলায় বলছিলেন, 'আমি শ্বাস নিতে পারছি না'।
  • মিস ডাউ,২২- ২০১৪ সালে পুলিশ হেফাজতে থাকার সময় সেপটিসেমিয়া এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে একজন ময়নাতদন্তকারী জানান, পুলিশ অফিসারদের অমানবিক আচরণের কারণে তিনি এতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

২০০৪ সালে সিডনির রেডফার্ন শহরতলী এলাকায় ১৭ বছর বয়সী টিজে হিকির মৃত্যুর ঘটনায় দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের একটি অভিযানের সময় ওই কিশোরের মৃত্যু হয়েছিল।

একই বছর ক্যামেরন ডোমাডগে পুলিশি হেফাজতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মারা যাওয়ার পর কুইন্সল্যান্ডের পাম আইল্যান্ডে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

টিজে হিকির মা, গেইল, ২০১৪ সালের একটি স্মরণসভায়

পরবর্তীতে কি ঘটেছে?

অস্ট্রেলিয়ায় হেফাজতে আদিবাসীদের মৃত্যুর ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন পুলিশ কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হয়নি।

কুমানজাভি ওয়াকারকে হত্যার অভিযোগ বর্তমানে একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচার চলছে। একটি আদালতে কনস্টেবল জাচারে রোলফ নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। আরেকজন অফিসার, আইনগত কারণে যার নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না, তিনি ২৯ বছর বয়সী একজন আদিবাসী নারী জয়েস ক্লার্ককে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় দেশটিতে পদ্ধতিগত বর্ণবাদ অন্যান্য মৃত্যুর একটি উপাদান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০১৮ সালে কুইন্সল্যান্ড সরকার পাম আইল্যান্ডের আদিবাসী বাসিন্দাদের ৩০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়, যখন সেখান একটি আদালত রায় দেয় যে, পুলিশ ২০০৪ সালের দাঙ্গা দমনে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে।

ভিডিওর ক্যাপশান,

`কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান হিসেবে আমি আতঙ্কিত`

রাজনৈতিক নেতারা কি বলছেন?

গত সোমবার অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেছেন, যদিও অস্ট্রেলিয়ার অনেক ক্রুটি রয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে যেরকম লুটপাট আর অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, সেই হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার মত একটা চমৎকার দেশে থাকতে পেরে তিনি ধন্য।

তিনি আরো বলেন, তা সত্ত্বেও, তিনি দেশটিতে হেফাজতে আদিবাসীদের মৃত্যুর ঘটনাকে খাটো করে দেখছেন না।

কিন্তু তার এই মন্তব্য নিয়ে অনেক আদিবাসী ও মানবাধিকার কর্মী বিদ্রূপ করেছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, তাদের সমস্যা সমাধানে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে না।

জাতীয় আদিবাসী ও টোরেস স্ট্রেইট আইল্যান্ডার লিগ্যাল সার্ভিসেসের সদস্য নেরিটা ওয়েট বলছেন, ''অন্য আরো অনেকের মতো, এই প্রধানমন্ত্রীও হেফাজতে আদিবাসীদের মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে উপেক্ষা করছেন।''

এ ধরণের অনেক ঘটনা গণমাধ্যম বা জনগণের মনোযোগ কাড়তে ব্যর্থ হয়েছে। সমালোচকরা বলেন যে, অস্ট্রেলিয়ায় যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, এখন এখানে তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মি. ফ্লয়েডের মৃত্যু। তবে তারা এটাও মনে করেন, অস্ট্রেলিয়ার পুলিশিং ব্যবস্থার প্রতি এটা এখন বেশি মনোযোগ কেড়েছে। এই সপ্তাহেই সিডনিতে এক আদিবাসী কিশোরের গ্রেপ্তারের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।