করোনা ভাইরাস: শত মাইল হেঁটে বাড়ি ফেরা ভারতীয় শ্রমিক আবার কাজে ফিরতে চান

  • অমিতাভ ভট্টশালী
  • বিবিসি, কলকাতা
দিল্লি থেকে পায়ে হেঁটে ঘরমুখো শ্রমিকের দল - ৯ই মে ২০২০

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

লকডাউনের সময় দিল্লি থেকে পায়ে হেঁটে নিজেদের বাড়ির দিকে যাচ্ছেন শ্রমিকরা (ছবি: ৯ই মে ২০২০)

ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে হঠাৎ করেই লকডাউন ঘোষণার ফলে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের দুর্দশা, তাদের অভুক্ত থাকার ছবি, শয়ে শয়ে কিলোমিটার পায়ে হেঁটে গ্রামে ফেরার কাহিনী এখন সারা বিশ্ব জানে।

কিন্তু ওই শ্রমিকদের একাংশ সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েও নিজেদের কাজের জায়গায় ফিরতে চাইছেন।

তারা বলছেন গ্রামে কোনও রোজগার নেই, চাষ বা মাটি কাটার কাজও পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিবার প্রতিপালনের জন্য তাই মুম্বাই, গুজরাতের মতো করোনা হটস্পটগুলোতেই তাদের ফিরে যেতে হবে।

লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে মুম্বাইয়ের গোরেগাঁওতে একটা ছোট ঘরে আটকে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন বীরভূমের বাসিন্দা হাসি শেখ আর মিছু শেখ।

তারা রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন সেখানে।

কাজ বন্ধ, রোজগার নেই, এদিকে খাবার শেষ।

এদের মতো কয়েক কোটি পরিযায়ী শ্রমিক মুম্বাই, গুজরাত, দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর বা তামিলনাডুতে আটকে পড়ে ছিলেন প্রায় দুমাস।

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান,

এপ্রিলে লকডাউনের শুরুতে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় বহু শ্রমিক পথেই মারা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছিল

লক্ষ লক্ষ শ্রমিক অবশ্য নিজেরাই বাড়ি ফেরার জন্য পা বাড়িয়েছিলেন রাস্তায় - স্ত্রী, সন্তানদের নিয়েই।

পথেই মারা গেছেন বহু মানুষ।

মে মাসের গোড়া থেকে শ্রমিকদের ঘরে ফেরানোর জন্য ট্রেনের ব্যবস্থা করেছিল সরকার।

সেই সব 'শ্রমিক স্পেশ্যাল' ট্রেনে যারা বাড়ি ফিরেছেন, তারা মাসখানেকের মধ্যেই ভাবতে শুরু করেছেন যে আবার ফিরতে হবে কাজের জায়গায়।

হাসি শেখ আর মিছু শেখ বলছেন গ্রামে ফিরে এসে সংসার চালানোটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েও মুম্বাইতে ফিরে যেতে চাইছেন এরা।

"গ্রামে বসে থাকলে তো না খেয়ে মরতে হবে। তাই ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই," বলছিলেন হাসি শেখ।

যদিও পশ্চিমবঙ্গ সরকার বলছে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প, যা '১০০ দিনের কাজ' বলে পরিচিত, তার অধীনে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজের ব্যবস্থা রেখেছে। গ্রামে ফিরে আসা শ্রমিকদের রেশনও দেওয়া হচ্ছে।

হাসি শেখের কথায়, "মাঠে চাষের কাজ এখন শেষ। কাজকর্ম নেই। গ্রামে যদি কাজ পেতাম, তাহলে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতেই হত না। কিন্তু কোনও কাজই তো নেই।"

"এতদিন ধরে বসে আছি। সংসার তো চালাতে হবে! মুম্বাইয়ের যা অবস্থা, তাতে কি আর কেউ নিজের থেকে সেখানে যেতে চায়! কিন্তু কী করব, ঝুঁকি নিয়েই ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছি," জানালেন মিছু শেখ।

বীরভূমেরই বাসিন্দা আতাউল শেখও চাইছেন দ্রুত কাজে ফিরতে।

চাষের কাজ শেষ, সরকারি ১০০ দিনের কাজও বিশেষ পাওয়া যাচ্ছে না। অতএব ফিরতেই হবে তাকে মুম্বাই। কিন্তু সেখানে করোনা সংক্রমণ যে ব্যাপক হারে ছড়িয়েছে, তাতে দুশ্চিন্তাও হচ্ছে।

ছবির উৎস, পর্বত পোর্তেল

ছবির ক্যাপশান,

নেপাল সীমান্তে আটকে পড়া ভারতীয় শ্রমিক

"চিন্তা তো হবেই। ওখানকার যা অবস্থা। কিন্তু এদিকে তো শোচনীয় অবস্থা, সংসার চালানোই যাচ্ছে না। ছেলে মেয়েগুলো পড়াশোনা করে, তাদের খরচ আছে! ওখানে যে মালিকের কাছে কাজ করতাম, তার সঙ্গে কথা হয়েছে। বলছে ফিরে যেতে। আর যদি এখন কাজ নাও হয়, তবুও বেতন দেবে তো বলেছে," বললেন আতাউল শেখ।

ট্রেন এখনও চলছে না। তাই কোনও কোনও মালিক, বিশেষত নির্মান শিল্পে জড়িত শ্রমিকদের কাজের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে দূরের রাজ্যগুলি থেকে বাস পাঠিয়ে দিচ্ছেন। বেশ কিছু শ্রমিক ইতিমধ্যে পাড়িও দিয়েছেন সেভাবেই।

লকডাউন চলার মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের সহায়তা দিচ্ছিল যেসব সংগঠন, তাদেরই অন্যতম বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ। সংগঠনটির প্রধান সামিরুল ইসলাম বলছিলেন, "লকডাউনের সময়ে আমাদের সঙ্গে প্রায় ৭৫ হাজার বাঙালী শ্রমিক যোগাযোগ করেছিলেন। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা বলছেন যে তাদের মধ্যে অনেকেই ফিরে যেতে চাইছেন। কিছু মানুষ ইতিমধ্যেই ফিরেও গেছেন। মুম্বাইতে কয়েকটি শ্রমিকের গ্রুপ ফিরে গেছে বলে জানতে পেরেছি। এদের কথা হচ্ছে, করোনায় মরলে মরব, বাঁচলে বাঁচব। কিন্তু রোজগার তো করতে হবে।"

এরা কাজে ফেরার জন্য উদগ্রীব হলেও এখনই সেই ঝুঁকি নিতে নারাজ মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা মনোরঞ্জন মন্ডল। কেরালা থেকে শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ট্রেনে করে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি।

"আমার সঙ্গে মালিকের কোনও যোগাযোগ হয় নি এখনও। কিন্তু আমি ওখানে ফেরার কথা এখনও ভাবি নি। ওষুধ, ভ্যাক্সিন কিছুই এখনও বেরয় নি। এই অবস্থায় কাজে ফেরা যাবে না অন্তত আরও দু তিন মাস অপেক্ষা করি, তারপর ভেবে দেখব," বললেন মনোরঞ্জন মন্ডল।

যে সরকারি প্রকল্পের অধীনে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়, তাতে কাজ পাওয়ার আবেদনও খুবই কম জমা পড়েছে। যেখানে প্রায় দশ লক্ষ শ্রমিক ভিন রাজ্য থেকে ফিরে এসেছেন, তার মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার মানুষ ওই কাজের জন্য আবেদন করেছেন। এর একটা কারণ অবশ্য গ্রামীন কর্মসংস্থান প্রকল্পে দিনে ২০২ টাকা পাওয়া যায়, যেখানে অন্য রাজ্যে শ্রমিকের কাজে রোজগার করা যায় দিনে ৫ থেকে ৭শো টাকা।