সিরিজ বোমা হামলা: ১৫ বছরে জঙ্গীরা 'কলাকৌশলে আরও বিপজ্জনক এবং আধুনিক হয়ে উঠেছে'

  • কাদির কল্লোল
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে সিরিজ বোমা হামলার পর ১৫ বছরে জঙ্গীরা যে কৌশল পাল্টিয়েছে, পুলিশও এর পাল্টা কৌশল নিয়ে কাজ করার কথা বলছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশে সিরিজ বোমা হামলার পর ১৫ বছরে জঙ্গীরা যে কৌশল পাল্টিয়েছে, পুলিশও এর পাল্টা কৌশল নিয়ে কাজ করার কথা বলছে।

বাংলাদেশে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনার পরবর্তী বছরগুলোতে ধর্মীয় চরমপন্থীদের সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা একদিকে যেমন বহুগুন বেড়েছে, সেই সঙ্গে তাদের হামলার কলাকৌশল ক্রমশ আরও বেশি বিপজ্জনক এবং আধুনিক হয়ে উঠেছে।

এরকম এক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকেও ঢেলে সাজাতে হয়েছে এরকম ধর্মীয় জঙ্গীদের সন্ত্রাসবাদী হামলা এবং তৎপরতা মোকাবেলায়।

পনের বছর আগে ২০০৫ সালে যখন দেশে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে জঙ্গীরা তাদের অস্তিত্বের জানান দিয়েছিল, পুলিশ বলেছে, সেই সময়কার জঙ্গী তৎপরতায় মূলত এক শ্রেনির মাদ্রাসা এবং সমাজের অস্বচ্ছ্ল মানুষের জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। ফলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে টার্গেটও ছিল এক শ্রেনির মাদ্রাসা।

জঙ্গী দমনের জন্য গঠিত পুলিশের বিশেষ ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, জঙ্গীদের কর্মী সংগ্রহের চেষ্টা এখন সমাজের কোন একটা অংশ বা শ্রেনির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

তিনি মনে করেন, বিশ্বব্যাপীই জঙ্গী তৎপরতায় একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে। বিশ্বের এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও জঙ্গীরা তাদের কৌশল পাল্টিয়েছে।

"মাদ্রাসা কিংবা শুধু দাড়ি টুপি পড়া লোকজনই, অথবা যারা অস্বচ্ছল বা অশিক্ষিত-তারাই জঙ্গী তৎপরতায় জড়াচ্ছে - সেটা ঠিক নয়। এখন আর সুনির্দিষ্ট কোন বয়স বা কোন শ্রেনি, অর্থনৈতিক বা শিক্ষাগত অবস্থা, এসব দিয়ে নির্ধারিত করা যাবে না।"

তিনি আরও বলেছেন,"সামগ্রিকভাবেই একটা পরিবর্তন এসেছে। যেহেতু ইন্টারনেট এবং সামাজিক মাধ্যমের বিকাশ হয়েছে। সেজন্য টেকনোলজিকে তারা তাদের অন্যতম একটা প্লাটফর্ম হিসাবে ব্যবহার করছে।"

ছবির উৎস, সাইট

ছবির ক্যাপশান,

গুলশানে হলিআর্টিজানে হামলার পর ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠী তাদের বার্তা সংস্থা 'আমাক' এ পাঁচ হামলাকারীর ছবি প্রকাশ করে।

পুলিশ কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, সিরিজ বোমা হামলার ১০ বছর পর ২০১৬ সালে ঢাকার হলি আর্টিজানে বড় ধরণের যে জঙ্গী হামলা হয়, সেই ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে ধনী পরিবারের এবং ইংরেজি মাধ্যমের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীও ছিল।

এই ঘটনার পর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ধারণা এবং নজরদারিতে বড় ধরণের পরিবর্তন এনেছে বলে কর্মকর্তারা বলেছেন।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক মাধ্যমের সুযোগ নিয়ে জঙ্গীরা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সাথেও যোগাযোগ সৃষ্টি করে।

তাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, জঙ্গীরা আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভিত্তিতে বিদেশি অস্ত্র এবং বিপজ্জনক বিস্ফোরক ব্যবহার করছে। হলি আর্টিজানের হামলায় আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে জঙ্গীরা তার প্রমাণ দিয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খন্দকার ফারজানা রহমান বলেছেন, "প্রথমদিকে যে টেরোরিজম বা ইসলামিক মিলিটারিজম ছিল, তারা মূলত হোমগ্রোন (ঘরে তৈরি) বোমা বা অস্ত্র ব্যবহার করতো। ২০০৫ সালে ৬৩টি জেলার ৫০০টি জায়গায় যে বোমা হামলা করা হয়েছিল, তাতে বেশিরভাগই হাতে তৈরি বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল।"

"কিন্তু এখন যেটা হচ্ছে, হলি আর্টিজানের হামলাতেও যা দেখা গেছে, অস্ত্রের চালান বাইরে থেকে আসছে। যেটাকে আমরা অবৈধ অস্ত্র বলছি।"

খন্দকার ফারজানা রহমান মনে করেন, জঙ্গীদের কর্মী সংগ্রহের কাজেও বড় ধরণের পরিবর্তন হয়েছে।

"এখন আসলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে জঙ্গী নিয়োগ বা রিক্রুট করা হয়।"

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান,

২০১৬ সালে হলিআর্টিজানে জঙ্গী হামলার পর প্রায় বারো ঘন্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান ঘটেছিল সেনাবাহিনীর এক কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে।

সম্পর্কিত খবর:

পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামও বলেছেন, "রিক্রুটমেন্টের ধরনও পাল্টে গেছে। কারণ যেহেতু এখন জঙ্গীদের সাংগঠনিক শক্তি বা তৎপরতা সেভাবে নাই। সেজন্য সাংগঠনিকভাবে কর্মী সংগ্রহ এখন সেভাবে নেই। ইনডিভিজ্যুয়ালি কেউ বা সেল্ফ র‍্যাডিক্যালাইজড কেউ যদি নিজে থেকে উগ্র তৎপরতায় নামে, তখন জঙ্গীরা সেটাকে উৎসাহিত করে।"

কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০০৫ সালের পরের কয়েক বছরে জঙ্গীদের আরও কিছু বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও কৌশল পাল্টাতে হয়।

২০১০ সালের পর জঙ্গী দমনে পুলিশের বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়। সেই ইউনিটকে সম্প্রতি আরও আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করা হয়েছে।

এই কাউন্টার টেরোরিজম অ্যাণ্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলামের বক্তব্য হচ্ছে, জঙ্গীরা যেভাবে পরিবর্তিত কৌশল পাল্টাচ্ছে, তার সাথে বিশ্ব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কৌশল ঠিক করেছে।

তিনি জানিয়েছেন, শুধু আইনগত ব্যবস্থাই নয়, এর পাশাপাশি জঙ্গীদের বক্তব্যের পাল্টা যুক্তি তুলে ধরে মানুষকে সচেতন করার কর্মসূচি তারা নিয়েছেন। এই কৌশলে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি উল্লেখ করেছেন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক মাধ্যমেও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অনেক বাড়ানো হয়েছে।

"আমরা কৌশল ঠিক করেছি। তাতে ম্যানুয়েল পদ্ধতির পাশাপাশি টেকনোলজিক্যাল পদ্ধতি নিয়েছি। এর মাধ্যমে আমরা জঙ্গীদের নজরদারি করি বা ফলো করি। তার ভিত্তিতেই জঙ্গীদের বিরুদ্ধে যে ধরণের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন হয়, সেটা আমরা নেই।"

তিনি আরও বলেছেন, "ইন্টারনেটে আমরা দেখি, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নলেজ ট্রান্সফার, টেকনোলজি ট্রান্সফার বা প্রশিক্ষণ ট্রান্সফার-এগুলো আসলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে হয়। এগুলো আমরা মোকাবেলা করার চেষ্টা করি। এগুলো কারা গ্রহণ করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করি।"

মি. ইসলাম উল্লেখ করছেন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কৌশল এবং পদক্ষেপের কারণে জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ বা আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের মতো জঙ্গী সংগঠনগুলোর তৎপরতা নেই এবং বড় কোন হামলা চালানোর শক্তি নেই।

এদের বাইরে নব্য জেএমবির কিছু তৎপরতা চালানোর চেষ্টা থাকলেও তাদের সাংগঠনিক শক্তি নেই।