সিলেট এমসি কলেজে ধর্ষণ, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা আর রিফাত হত্যা মামলার রায় নিয়ে প্রশ্ন

  • সাবির মুস্তাফা
  • সম্পাদক, বিবিসি নিউজ বাংলা
সিলেটের এম সি কলেজ হোস্টেলে ধর্ষণের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের বিক্ষোভ।, ২৭-০৯-২০২০।

ছবির উৎস, SOPA Images

ছবির ক্যাপশান,

সিলেটের এম সি কলেজ হোস্টেলে ধর্ষণের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের বিক্ষোভ।

গত সপ্তাহে সিলেটের মুরারি চাঁদ কলেজ এলাকায় স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে একজন নারী গণধর্ষণের শিকার হন। এই ঘটনা সারা বাংলাদেশের মানুষকে প্রচণ্ড ভাবে নাড়া দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

আজ শুরু করছি সে বিষয়ে কয়েকটি চিঠি দিয়ে, প্রথমটি লিখেছেন রংপুরের কাউনিয়া থেকে বিলকিস আক্তার:

''সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ এলাকায় গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূর স্বামী, নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, যারা সকলেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলে আমরা গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি। এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দীর্ঘ সাত দশকের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সারাদেশের মানুষের অভিযোগের কোন অন্ত নেই।

''সমাজে সাধারণত যেসব অন্যায়-অপকর্ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটে, তার মধ্যে নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য হচ্ছে ধর্ষণ। নারী নির্যাতন রোধে বিভিন্ন আইন ও তাতে শাস্তির বিধান থাকলেও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে নারীর ওপর সহিংসতা দিনদিন বাড়ছেই। ছোট-বড় সব নারীর সম্মান রক্ষা করা সমাজের নৈতিক দায়িত্ব এবং নারীর ওপর সহিংসতা বন্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

''এমসি কলেজে গণধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের দলীয় পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধী হিসেবে যথাযথ বিচারের সম্মুখীন করা হোক।''

জন সচেতনতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আমারও মনে হয় মিস আক্তার। তবে এখানে জরুরি হচ্ছে তরুণদের মাঝে নারীর অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা। একই সাথে , আইন এবং তদন্ত আর বিচার প্রক্রিয়া সংস্কার করা প্রয়োজন বলে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন। কারণ, বর্তমানে যেভাবে তদন্ত এবং বিচার হয়, তাতে নারীরা অভিযোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে উৎসাহী হন না। এর ফলে বেশির ভাগ ধর্ষণের ঘটনার কোন বিচারই হয় না।

ছবির উৎস, এমসি কলেজ ওয়েবসাইট

ছবির ক্যাপশান,

এমসি কলেজে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত দুইজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ

পরের চিঠিটিও রংপুর থেকে, লিখেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহাম্মদ শাহিন আলম:

''চারিদিকে যে লোমহর্ষক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, এতে জোর দিয়ে বলতে পারি যে নারীরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। এমনকি তার স্বামী ও তার নিজের বাবা-মার কাছে থেকেও সে নিরাপদ নয়। এর জন্য আমি এ দেশের বিচার ব্যবস্থাকে দায়ী করবো। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা ও সঠিক শাস্তি না হওয়ায় দিন দিন এসব ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার মতে ধর্ষণের বিচার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে এবং দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে উন্মুক্ত জায়গায় তার শাস্তি কার্যকর করা দরকার। তাহলে এ দেশ আর কোন ধর্ষণকারী থাকবে না।''

অনেকেই সেরকম সেন্টিমেন্ট প্রকাশ করেছন মি. আলম। তবে সর্বোচ্চ শাস্তি বলতে আপনি যদি মৃত্যুদণ্ড বোঝান, তাহলে আমি বলবো এমন কোন প্রমাণ নেই যে মৃত্যুদণ্ড হলেই অপরাধ প্রবণতা কমে যাবে। তবে আপনি ঠিকই বলেছেন যে, ধর্ষণকারীদের বিচারের মুখোমুখি না করলে অপরাধ প্রবণতা কমানো যাবে না। বিচার বিলম্ব হলে ন্যায় বিচারের সম্ভাবনা ক্রমশ: কমতে থাকে।

ছবির উৎস, SOPA Images

ছবির ক্যাপশান,

প্রতিবাদ: ঢাকায় ধর্ষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের বিক্ষোভ।

বিবিসি বাংলায় এই ঘটনার রিপোর্টিং নিয়ে অভিযোগ করে লিখেছেন রাজশাহী থেকে মোহাম্মদ ফাতিউর রহমান রাকিব:

''সেপ্টেম্বরের ২৬ তারিখ শনিবারের প্রবাহে বিবিসি বাংলায় সিলেটের এমসি কলেজে গধর্ষণের খবর বিশ্লেষণ শুনে আমি হতবাক। সেখানে রাকিব হাসনাত সরাসরি বলতে চাইছেন না যে এই ঘটনার সাথে ছাত্রলীগ জড়িত। যেখানে বাংলাদেশের প্রায় সকল বেসরকারি টেলিভিশনে সরাসরি বলছে ছাত্রলীগ জড়িত। বিবিসি বাংলার কাছ থেকে আমরা সত্য ও সঠিক খবরটা প্রচার শুনতে চাই।''

সঠিক খবর দেয়াই আমাদের কাজ মি. রহমান, সেজন্য আমরা শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কোন তথ্য দেয়া থেকে বিরত থাকি। দেরি হলেও আমর নিশ্চিত হতে চাই। অন্যদিকে, যাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, তারা প্রথমত অভিযুক্ত। ছাত্রলীগের কর্মী বা সমর্থক হলেই কিন্তু তাদের চরিত্র পাল্টে যায় না। তবে সংগঠন যদি তার কর্মীদের অপরাধ ধামাচাপা দেবার জন্য প্রশাসন এবং পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগ করে, তবেই তাদের রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং তখন বিবিসি বাংলার রিপোর্টিং-এ সেই পরিচয়কে অবশ্যই প্রাধান্য দেয়া হবে।

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশে ধর্ষণের খুব কম ঘটনাতেই দোষীদের সাজা হয়।

আরেকটি অভিযোগ করে লিখেছেন জার্মানির মিউনিখ থেকে ফয়সাল আহমেদ, যিনি ২৬ তারিখ শনিবারে মেইলটি পাঠিয়েছেন:

''আশা করি ভাল আছেন। কিন্তু আমি ভাল নেই, ব্যক্তিগতভাবে অনেক ক্ষুব্ধ দেশের চলমান অরাজকতার জন্য, পাশাপাশি বিবিসি বাংলার উপরেও আমি ক্ষুব্ধ। গতকালের একটি ঘটনা এমসি কলেজে ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে ছাত্রলীগ নেতাদের গধর্ষণ, অথচ আপনাদের মিডিয়া একটি নিউজ করতে পারলো না। আমি বরাবরই দেখেছি, আপনাদের মিডিয়া ছাত্রলীগের অপকর্ম নিয়ে নির্লিপ্ত।''

আপনার অভিযোগ আমি মানতে পারলাম না মি. আহমেদ। ছাত্রলীগের অপকর্ম নিয়ে বিবিসি বাংলায় অসংখ্য রিপোর্ট এবং বিশ্লেষণ অতীতে হয়েছে। সিলেটের ঘটনা ঘটেছে শুক্রবার ২৫শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। খবরটি নিশ্চিত করতে আমাদের একটু দেরি হয়েছিল, সেটা ঠিক, কিন্তু আমরা নিউজ করিনি সেটা ঠিক না। শনিবারে আমরা খবরটি পরিবেশন করি এবং পরবর্তীতে আরো বিস্তারিত খবর দেয়া হয়। এখানে অভিযুক্তরা ছাত্রলীগ না অন্য কোন দলের সমর্থক, তা বিবেচ্য বিষয় না।

ছবির উৎস, রুদ্র রোহান

ছবির ক্যাপশান,

আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি ছিলেন মামলার প্রধান সাক্ষী। পরে অভিযুক্ত করা হয় তাকে।

এই প্রসঙ্গে ফিরবো একটু পরে। তার আগে আরেকটি চাঞ্চল্যকর এবং ভয়ংকর আরেকটি অপরাধের বিচারের রায় নিয়ে লিখেছেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেনহাজুল ইসলাম তারেক:

''বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত। এটা যদিও যুগান্তকারী রায়, তবে রায় দেওয়াটা বড় কথা নয়, রায় দ্রুত কার্যকর করাটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা আশা করি, উচ্চ আদালতে এ রায় বহাল থাকবে এবং প্রতিটি অপরাধের এভাবে সাজা হবে। বিচার বিভাগ স্বাধীন হলে দেশের প্রতিটি নাগরিক এরকম ন্যায়বিচার পাবে এবং তাতে অপরাধ অনেক কমে আসবে বলেই মনে করি।''

রিফাত হত্যার বিচার হয়েছে দেখে আপনার মত অনেকেই স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলবেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই মি. ইসলাম। হয়তো হত্যাকাণ্ডটির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কারণেই আসামীদের শনাক্ত করে তাদের দোষ আদালতে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই মৃত্যুদণ্ড বিবাদী পক্ষ অবশ্যই আপিল করবে। দ্রুত বিচার অবশ্যই কাম্য কিন্তু মৃত্যুদণ্ড দ্রুত কার্যকর করা উচিত কি না, তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক রয়েছে। একজন মানুষের জীবন নেয়ার আগে অনেক ভাবতে হবে। না হলে, হত্যাকারীর সাথে রাষ্ট্রের কী তফাৎ থাকবে?

এবারে অপরাধ জগত থেকে শিক্ষা জগত নিয়ে একটি চিঠি। লিখেছেন চট্টগ্রামের বায়তুস শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসার ছাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ:

''আমি একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থী। গত ৬ মাস থেকে আমাদের পরীক্ষা স্থগিত হয়ে আছে। পরীক্ষার জন্য যা প্রস্তুতি নিয়ে ছিলাম সব ভুলতে বসেছি, এমতাবস্থায় আমরা কী করবো? যদি স্বাস্থ্য বিধি মেনে সব সম্ভব হয়, তাহলে পরীক্ষা কেন নয়? আপনারা অবগত আছেন কওমি মাদ্রাসা অনেক আগেই খুলে দেওয়া হয়েছে এবং সকলেই স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে , কিন্তু আমরা পিছিয়ে পড়ছি।

''আমাদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার অনুরোধ করছি। বিবিসির কাছে প্রার্থনা এই যে, আপনারা এমন কোন প্রতিবেদন তৈরি করুন যার দ্বারা আমার মত ১৫ লক্ষ শিক্ষার্থী একটি চূড়ান্ত সিদ্ধন্ত পেতে পারে।''

অনেকেই আশা করেছিলেন মি. আজাদ, যে বুধবার শিক্ষামন্ত্রী কোন একটি সিদ্ধান্ত দেবেন, বিশেষ করে যেহেতু বাংলাদেশের অন্য কোন খাতে লকডাউন বলতে কিছু আর নেই। পরে জানা গেল সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অক্টোবরের ৩১ তারিখ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তবে ধারনা করা হচ্ছে আগামী সপ্তাহের কোন এক সময় এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ঘোষণা আসতে পারে। দেখা যাক।

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান,

বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনায় বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানিসহ মোট ৩২জন অভিযুক্তকে আদালত অব্যাহতি দিয়েছে

ভারত নিয়ে একটি চিঠি, লিখেছেন আসামের ডিগবয় থেকে শান্তনু রায়চৌধুরী:

''আমার দেশের আইনি ব্যবস্থা ও সরকারের প্রতি সশ্রদ্ধ বিশ্বাস ও পূর্ণ সমর্থন রেখেই বলছি, বাবরি মসজিদ মামলার রায় আমাকে কিছুটা বিচলিত করেছে। মামলায় অভিযুক্ত কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করা যায় নাই। বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়েছে একথা নির্মম সত্য, কিন্তু দুষ্কৃতিকারীদের খুঁজে না পাওয়াটা কি তদন্তকারী সংস্থার উদ্দেশ্যমূলক ভুল?

''যেমনটি প্রশ্ন জাগছে গত বুধবার, উত্তরপ্রদেশে ধর্ষিতা দলিত কন্যার শব পরিবারের আপত্তির মধ্যেই জোর করে সরকারি উদ্যোগে সৎকার করে ফেলার যৌক্তিকতা নিয়ে। আর, কারণ যাই থাকুক না কেন, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর, এই দ্বৈত ঘটনার প্রাক মুহূর্তে ভারত থেকে বহিষ্কৃত হওয়া। সব মিলিয়ে ব্যবস্থা আর নিয়মের প্রতি আস্থাটা একটু যেন টালমাটাল হয়ে গেছে।

''দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রশ্নগুলো এভাবে তুলে ধরাটা স্বদেশ বিদ্বেষী কাজ নয়তো?''

যে কোন মিডিয়াতে আপনার মতামত তুলে ধরা আপনার গণতান্ত্রিক অধিকার মি. রায়চৌধুরী, সেটা দেশি হোক বা বিদেশী। আপনি ভারতের মঙ্গল চান বলেই এ'ধরণের ঘটনায় বিচলিত। তবে হ্যাঁ, যারা আপনার বক্তব্য পছন্দ করে না এবং আপনার কণ্ঠ রোধ করতে চায়, তারাই আপনার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। তবে এ'কথা ঠিক, ভারত একটি পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, ভারতের আদর্শগত মূল্যবোধ নিয়ে দেশে একটি মেরুকরণ তৈরি হয়েছে যেটা অতীতে আমরা দেখি নাই। এই মেরুকরণের পরিণতি কী হবে, সেটা বলার সময় এখনো আসে নি।

আবার ফিরে যাচ্ছি সিলেটের এমসি কলেজ হোস্টেলে ধর্ষণের বিষয়ে।

অভিযুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে আরেকটি চিঠি, লিখেছেন খুলনার দাকোপ থেকে মুকুল সরদার:

''একজন ধর্ষককে ধর্ষক হিসেবেই দেখা উচিৎ। ধর্ষক কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য সেটি বিবেচ্য নয়। কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে, এসব অপরাধীরা রাজনৈতিক রং মেখে বরাবরই সুবিধা নিয়ে থাকে। আমরা প্রত্যাশা করবো, সিলেটের এমসি কলেজ হোস্টেলের এই ধর্ষকদের কোনো রাজনৈতিক দল যেন তাদের দলের কর্মী বলে ধর্ষণের ঘটনাকে আড়াল করার চেষ্টা না করে।''

আগেই যেটা বলেছি মি. সরদার, অভিযুক্তরা কোন দলের সাথে সম্পৃক্ত তা গুরুত্ব পাবে তখনি যখন ঐ দল তদন্ত কাজে বাধা দেবে। কাজেই, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ যদি এই ভয়ংকর অপরাধের সাথে সংগঠনের নাম সম্পৃক্ত করতে না চায়, তাহলে পুলিশকে নির্বিঘ্নে কাজ করতে দেয়াই তাদের জন্য মঙ্গল হবে।

বিচারহীনতা ধর্ষণ প্রবণতার একটি কারণ বলে লিখছেন ঢাকার গেণ্ডারিয়া থেকে মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান:

''আইন ও সালিশ কেন্দ্রের উদ্যোগে ঢাকা জেলার পাঁচটি নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রায় ১৫ বছরে (২০০২-১৬) আসা ধর্ষণ সংক্রান্ত পাঁচ হাজারের মতো মামলার পরিস্থিতি অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের এ ব্যাপকতার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, মূল্যবোধের অবনতি আর অপরাধীর যথাযথ শাস্তি না হওয়া।

''আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততাও এজন্য কোন অংশে কম দায়ী নয়। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনকারীরা বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যায়। এই প্রায় বিচারহীনতার পরিবেশের অবসান ঘটাতে না পারলে ধর্ষণের প্রবণতা রোধ করা অসম্ভব।''

এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় মি. রহমান, কেন এত কম সংখ্যক নারী ধর্ষকের পরিচয় জেনেও পুলিশের কাছে যায় না। গোটা বিচার প্রক্রিয়াটাই মনে হয় ভুক্তভোগীর বিপক্ষে। শুরুর দিকে যা বলেছি, এখানে আইনের সংস্কারের যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি পুলিশের দক্ষতা বাড়ানো এবং বিচার প্রক্রিয়াকে ভিকটিম-বান্ধব করা দরকার বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এবারে ভিন্ন প্রসঙ্গ কিন্তু এখানেও হত্যা বিতর্ক জড়িত। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লিখেছেন মোহাম্মদ মাসুদ রানা:  

''বাংলাদেশ -ভারত সীমান্ত সমস্যার গোড়াপত্তন ১৯৪৭ সালে হলেও, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। সীমান্ত এখন প্রায় সারা বছরই উত্তপ্ত থাকে। সীমান্তে উত্তেজনা, বাঙ্কার খনন, রেড এলার্ট, ফাঁকা গুলি এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো ভাবেই সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশী নাগরিকদের গুলি, হত্যা ও ধরে নিয়ে আটক বা আহত করা বন্ধ হচ্ছে না। তাহলে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বা 'বিএসএফ' কি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সম্মেলন করে? এ বিষয়ে 'বাংলাদেশ - ভারত ' বিজিবি-বিএসএফ' কি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারবে?''

খুব জটিল প্রশ্ন করেছেন মি. রানা। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত যে একটি ভয়ংকর সীমান্ত, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। যে দু'দেশের মধ্যে কোন সংঘাত নেই, যে দু'দেশ নিজেদের বন্ধু প্রতিম বলেই মনে করে, সে দু'দেশের সীমান্ত কেন এত বিপজ্জনক, কেন এত মৃত্যু? এই প্রশ্ন অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন। দু'দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চায়, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রায় সব হত্যাই যেহেতু ভারতীয় বাহিনীর হাতেই হচ্ছে, তাই মৃত্যু সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার জন্য তাদেরই বেশি সচেষ্ট হতে হবে।

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান,

সীমান্তে আনুষ্ঠানিকতা: পেট্রাপোলে বিএসএফ এবং বিজিবি'র যৌথ পতাকা অনুষ্ঠান।

সীমান্ত নিয়ে আরেকটি চিঠি। বিএসএফ-এর সাথে গুরু চোরাকারবারিদের যোগসাজশের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এবং তা নিয়ে অনেক তথ্য বিবিসি বাংলায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। সে বিষয়ে লিখেছেন ঝিনাইদহ থেকে কাজী সাঈদ:

''সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার চক্রে বিএসএফ -এর কয়েকজন পদস্থ প্রাক্তন ও বর্তমান কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, কাস্টমস ও পুলিশের একাংশের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। মজার ব্যাপার হল, এত দিন যারা গরু চোরাকারবারি হিসেবে নিহত হয়েছে তারা এই বিএসএফ এর হাতেই মরেছে। মানে দাঁড়াচ্ছে সেগুলোও কম বেশি সাজানো ছিল। বিষয়টি এমন হলে এতদিন যারা বিনা বিচারে সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের শিকার হল, সে বিচার এবং ক্ষতিপূরণের ব্যাপারটিও এসে যায় বৈকি। আরেকটি কথা, বিবিসির প্রতিবেদনে শুধু সীমান্তের এক পাশের বিবরণ দেখলাম।''

শুধু এক পাশের বিবরণ ছিল কারণ তদন্তটা করছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই, এবং তারা শুধু তাদের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর সদস্যদেরই তদন্ত করছে। সীমান্তের এপারে তারা কোন সহযোগিতা বা তথ্য চেয়েছিল কি না, তা আমাদের জানা নেই। আর বাংলাদেশে তাদের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি নিয়ে কোন তদন্ত হচ্ছে বলেও আমাদের জানা নেই।

ভিডিওর ক্যাপশান,

ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর: ভাসানচরে থাকা রোহিঙ্গারাই আর সেখানে থাকতে চান না

এবার যাই অন্য এক সীমান্তে। সম্প্রতি মিয়ানমার - বাংলাদেশ বর্ডারের আবহাওয়া একটু গরম হয়ে উঠেছে। এ'নিয়ে লিখেছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে মোহাম্মাদ আব্দুল মাতিন:

''সম্প্রতি মিয়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশের সৈন্য সমাবেশ করছে বলে মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবির কর্মকর্তাদের দাবি সীমান্তে সৈন্য বাড়ানো হয়নি। এছাড়া অস্ত্র সমাগমের যে অভিযোগ মিয়ানমার তুলেছে, সেটিও সত্য নয় বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ যাবত উভয় দেশের সীমান্ত নিয়ে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের উদ্দেশ্য কী? ভবিষ্যৎ দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত নয় কি? আমরা চাই উভয় দেশ সীমান্ত নিয়ে সমঝোতায় আসুক।''

আমি নিশ্চিত মি. মাতিন, কেউ সংঘাত চায় না এবং সবাই সমঝোতার আশা করছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মিয়ানমার তার দেশের ১০ লক্ষ মানুষকে বাংলাদেশে পালাতে বাধ্য করেছে এবং এখন ফেরত নিতে অস্বীকার করছে। অন্তত তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গারা নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে সাহস পাচ্ছে না। সীমান্ত স্থিতিশীল রাখতে এবং সংঘাতের সম্ভাবনা এড়াতে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ অধিকার নিয়ে নিরাপত্তার মধ্যে দেশে ফিরে যাওয়া অত্যাবশ্যক বলে মনে হয়।

ছবির ক্যাপশান,

শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকলেও নুরুল হক সবচেয়ে পরিচিতি পান কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের প্রাক্তন নেতা নুরুল হক নূরকে নিয়ে প্রশ্ন করেছেন মাগুরার শ্রীপুর থেকে রিপন বিশ্বাস:

''সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরকে নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এর মাঝেই তাকে নিয়ে সরকারের মাঝে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, এমন পরিস্থিতিতে হয়ত দারুণ কোন পরিবর্তন আসবে আর না হয় নূর ভাইকে আমরা হারাবো। বিবিসি বাংলার কি ধারনা?''

সে'রকম কোন ভবিষ্যদ্বাণী করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয় বলে আমি মনে করি মি. বিশ্বাস। তবে নূরকে হারাবেন বলে আপনি কী বোঝাচ্ছেন, তা আমার কাছে পরিষ্কার না। মি. হক ছাত্র রাজনীতিতে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে উঠে এসেছেন, অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তার জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতায় কোন ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পরের ধাপ, অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন সেটাই দেখার বিষয়।

প্রতিষ্ঠিত কোন দলে যোগ দিলে তিনি দ্রুত নেতা হয়ে উঠবেন, কিন্তু তখন তরুণদের মাঝে তার গ্রহণযোগ্যতায় ফাটল ধরতে পারে। তিনি যদি নতুন কোন দল সৃষ্টি করেন, তাতে পুরনো দলগুলোর ব্যর্থতার দায় তাকে নিতে হবে না। কিন্তু দল গড়ে তোলার জন্য, কর্মী জোগাড় করার জন্য, অর্থের জন্য কত দূর আপোষ করবেন? নাকি, সম্পূর্ণ নতুন ধরনের রাজনীতির পথ তৈরি করবেন? তার সামনে এখন অনেক পথ আছে, তিনি কোনটা বেছে নেন সেটাই বলে দেবে তিনি দারুণ কোন পরিবর্তন আনবেন নাকি হারিয়ে যাবেন।

এবারে কিছু চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করা যাক:

মোহাম্মদ মুজাহিদ মোল্লা, দিঘলিয়া, খুলনা।

শাহিন তালুকদার, মৌকরন, পটুয়াখালী।

তন্ময় কুমার পাল, ফকিরহাট,বাগেরহাট।

দীপক চক্রবর্তী, দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড়।

শামীম উদ্দিন শ্যামল, ধানমন্ডি, ঢাকা।

সোহরাব হোসেন, সাতক্ষীরা।

বৃত্তি রায়, মোহাম্মদপুর,ঠাকুরগাঁও।

মুহাম্মদ শামিমুল হক মামুন, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম।

শওকত হোসেন বিদ্যুৎ, কানুহরপুর হাজী আলী আক্কাস দাখিল মাদ্রাসা, ঝিনাইদহ।

এম আলম, পূর্ব কাফরুল, ঢাকা সেনানিবাস।

পলাশ চন্দ্র রায়, বোদা, পঞ্চগড়।

দেলোয়ার হোসাইন জুয়েল, মনোহরগঞ্জ, কুমিল্লা।