রোহিঙ্গা শরণার্থী: বাংলাদেশের ভাসানচরে শরণার্থীদের মারধর এবং নির্যাতনের অভিযোগ

  • কাদির কল্লোল
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ভাসানচর, বাংলাদেশ, রোহিঙ্গা।

নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশের ভাসানচরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের রাখার প্রতিবাদে তারা সেখানে অনশন এবং বিক্ষোভ করলে নৌবাহিনীর একদল সদস্য বিক্ষোভকারীদের মারধর ও নির্যাতন করেছে।

সংস্থাটি বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সেই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার বলেছে, মারধর এবং নির্যাতনের অভিযোগ ভিত্তিহীন।

ভাসানচর থেকে শরণার্থীদের কয়েকজন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ভাসানচর থেকে তাদেরকে শরণার্থী শিবিরগুলোতে আত্নীয়স্বজনের কাছে ফিরিয়ে আনার দাবিতে তারা টানা চারদিন অনশন এবং মিছিল করলে তখন তাদের নির্যাতন করা হয়।

৩০৬ জন রোহিঙ্গাকে নোয়াখালী জেলার ভাসানচরে নেয়া হয় গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে। তাদের বেশিরভাগই নারী এবং শিশু।

সে সময় এই রোহিঙ্গারা নৌকায় করে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করলে তাদের ধরার পর ভাসানচরে পাঠানো হয়েছিল।

ভাসানচরে রাখা এই রোহিঙ্গারা তাদের সেখান থেকে সরিয়ে আনার দাবি তুলে অনশন এবং মিছিল করেছে গত ২২শে সেপ্টেম্বর।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করেছে, সেই প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ করার কারণে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের মারধর এবং নির্যাতন করা হয়েছে।

সংস্থাটির একজন মুখপাত্র মিনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মারধর করার ঘটনার ছবি তারা পেয়েছেন।

"যারা ভাসানচরে আছে, তাদের সেখানে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল দু'সপ্তাহের জন্য। কিন্তু এখনও তাদের ফেরত আনা হয়নি। সেজন্য তারা হাঙ্গার স্ট্রাইক করেছিল। এরপর তারা মিছিল করে, সেখানে যে নেভি অফিসার ছিলেন কয়েকজন, তারা রেগে গিয়ে রোহিঙ্গাদের মারপিট করেছেন। তারা সেই ছবি আমাদের পাঠিয়েছে।"

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মিনাক্ষী গাঙ্গুলী আরও বলেছেন, "বাংলাদেশ সরকারতো রোহিঙ্গাদের এই জন্যে আশ্রয় দিয়েছেন যে, তাদের (মিয়ানমারের) সিকিউরিটি ফোর্সের লোকেরা মেরেছিল এবং তাদের ওপর খুবই অত্যাচার হয়েছিল। সেই অত্যাচার যদি আবার বাংলাদেশে অফিসাররা করেন, সেটাতো বাংলাদেশের জন্য খুব বিব্রতকর একটা ব্যাপার। এখন আমাদের মতে, ভাসানচরে থাকা রোহিঙ্গাদের সেখান থেকে ফেরত নিয়ে যাওয়া উচিত।"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির ক্যাপশান,

মানচিত্রে ভাসানচরের অবস্থান

ভাসানচরে যে রোহিঙ্গাদের রাখা হয়েছে, তাদের কয়েকজন বলেছেন, কয়েকমাস ধরে তারা আত্নীয়স্বজনের সাথে কোন যোগাযোগ করতে পারছেন না।

তারা আরও বলেছেন, কিছুদিন আগে টেকনাফ এবং উখিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে ৪০ জন প্রতিনিধিকে সেখানে পরিবেশ দেখানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের কাছে তারা তাদের আত্নীয়স্বজনের কাছে ফেরত নেয়ার জন্য আবেদন জানানোর কথা বলেছিলেন।

ভাসানচর থেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন রোহিঙ্গা বলছেন, তারা বাধ্য হয়ে চারদিন অনশন করার পর গত ২২শে সেপ্টেম্বর মিছিল করেছিলেন।

তিনি আরও বলেছেন, "আমরা এখানে মিছিল করেছি। খাওয়া দাওয়া করি নাই চারদিন ধরে। আমরা এখানে থাকতে চাই না। এতদিন ধরে আমাদের আত্মীয়স্বজনের সাথে কোন যোগাযোগ নাই। আমরা নদীর পারে বেড়িবাঁধে চলে গিয়ে মিছিল করেছিলাম। তখন আমাদের লাঠি দিয়ে মেরেছে এবং নির্যাতন করেছে।"

তবে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের মারধর বা নির্যাতনের অভিযোগ যা তোলা হয়েছে, তা ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট বলে বর্ণনা করেছে কর্তৃপক্ষ।

আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালক কর্ণেল আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ বলেছেন, "বিষয়টি অবাস্তব, অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক এবং মিথ্যাচারের শামিল। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যরা ভাসানচরে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের জনগণের স্বাচ্ছন্দ্যমূলক জীবন যাপন নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সাথে একসাথে এই রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও যৌথভাবে পালন করে আসছে।"

ছবির ক্যাপশান,

বিমান থেকে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি আবাসন

বাংলাদেশ সরকার ভাসানচরে বসবাসের অবকাঠামো নির্মাণ করে সেখানে এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে বেশ আগে।

রোহিঙ্গাদের সাহায্যকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলে আসছে, ভাসানচর বসবাসের উপযোগী কিনা-তা পরীক্ষা না করে এবং জোর করে সেখানে শরণার্থীদের পাঠানো ঠিক হবে না।

সেই প্রেক্ষাপটে সরকার বিভিন্ন শরণার্থী শিবির থেকে যে ৪০ জন রোহিঙ্গা প্রতিনিধিকে ভাসানচর ঘুরিয়ে এনেছেন, তাদের মধ্যে একজন জহুরা বেগম বলছিলেন, "আমরা সেখানে পরিবেশ ভাল দেখেছি। পরিবেশ ভালই। কিন্তু সেখানে যাদের রাখা হয়েছে, তারা বলেছে, তাদের অনেকে স্বামী ছাড়া এবং অনেকে বাবা মা ছাড়া সেখানে আটকা আছে। তারা সেখানে থাকতে চায় না।"

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা: মো: এনামুর রহমান বলেছেন, "ভাসানচরে যেহেতু এক লাখ রোহিঙ্গা পরিবারকে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে, সেজন্য সেখানে এখন যাদের রাখা হয়েছে, তাদের ফেরত আনা হবে না।"

তিনি আরও জানিয়েছেন, ভাসানচরের পরিবেশ দেখানোর জন্য শরণার্থী শিবিরগুলো থেকে রোহিঙ্গাদের ৫০ জন প্রতিনিধিকে আবারও সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে।

ভিডিওর ক্যাপশান,

ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর: ভাসানচরে থাকা রোহিঙ্গারাই আর সেখানে থাকতে চান না