ধর্ষণ নিয়ে ক্ষোভ, ক্রসফায়ার নিয়ে বিতর্ক আর রোহিঙ্গা নিয়ে প্রশ্ন

  • সাবির মুস্তাফা
  • সম্পাদক, বিবিসি নিউজ বাংলা
ঢাকায় প্রতিবাদ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী, ০৭-১০-২০২০।

ছবির উৎস, Barcroft Media

ছবির ক্যাপশান,

ন্যায় বিচারের দাবী: নোয়াখালীতে নারী নির্যাতন-এর প্রতিবাদে ঢাকায় বিক্ষোভ।

আপনারা অনেকেই নিশ্চয়ই জানেন, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে একজন নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা এবং তার ওপর নির্যাতন চালানোর ভিডিও এই সপ্তাহে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

এই ঘটনা অনেক শ্রোতা-পাঠককে বিচলিত করেছে, বিক্ষুব্ধ করেছে। সে বিষয়ে চিঠি দিয়ে আজ শুরু করছি, প্রথমে লিখেছেন খুলনার দাকোপ থেকে মুকুল সরদার:

''বেগমগঞ্জে গৃহবধূকে চরমভাবে নির্যাতন করা হয়েছে কেবল তাই নয়, ঘটনার একমাস পর সেই নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী আত্মগোপনে থাকা ভিকটিমকে উদ্ধার করেছে এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে আটকও করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় একটি ঘটনা দীর্ঘ এক মাসেও কেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজরে এলো না? কিন্তু যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে সরকার কি তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবে, না কি আইনের ফাঁক গলিয়ে বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা বেরিয়ে যাবে?''

সেটাই বড় প্রশ্ন মি. সরদার। পুলিশ এত দিন নির্লিপ্ত ছিল নাকি ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিল না? যারা কাজটি করেছে তারা গোপনীয়তা রক্ষা করেই করেছে আর ভুক্তভোগী নারীও প্রাণের ভয়ে পুলিশের কাছে না যেয়ে লুকিয়ে ছিলেন বলেই মনে হচ্ছে। যাই হোক, মূল কথা হলো ভিকটিম রক্ষা পেয়েছেন এবং পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছে। এখন সবাই আশা করছেন তদন্ত কাজে কোন গাফিলতি থাকবে না এবং ভিকটিম আদালতে ন্যায় বিচার পাবেন।

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান,

ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড দাবি করে বিক্ষোভ

আরো লিখেছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে মোহাম্মদ আব্দুল মাতিন:

''সম্প্রতি নোয়াখালীর নারী নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর, সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে 'ক্রসফায়ার' ব্যবহারের পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরণের বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন, গত কয়েক বছর গুম,হত্যা,ধর্ষণ আগুনে পুড়িয়ে মারা, সন্দেহজনকভাবে ছেলে ধরা মনে করে মারা, গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ আবরার ফাহাদ এর মত একজন মেধাবী ছাত্রকে নির্মম ভাবে হত্যা করা, এধরনে সকল বিষয় থেকে ন্যায় বিচার কি পেয়েছি? পাওয়ার আশাও কি আছে? একের পর এক ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা উদ্ঘাটন হচ্ছে আর পূর্বের গুলো সব লুকিয়ে যাচ্ছে।''

ক্রসফায়ার বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংবিধান পরিপন্থী একটি কাজ মি. মাতিন, এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। ক্রসফায়ারই যখন একটা অপরাধ তখন আপনি কীভাবে একটি অপরাধ দিয়ে অন্য একটি অপরাধ দমন করবেন? আপনি ঠিকই বলেছেন যে আবরার হত্যার মত অনেক অপরাধের কোন বিচার না হওয়ায় জনমনে অবিশ্বাস এবং অনাস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। আমার মনে হয় সব অপরাধের বিচার আইনের মাধ্যমে সম্পন্ন করে দোষীকে আইন সম্মত শাস্তি প্রদান করা প্রয়োজন।

ছবির ক্যাপশান,

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে ২০০২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন বাহিনীর হাতে প্রায় চার হাজার বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে।

ক্রসফায়ারের বিষয়ে লিখেছেন ঢাকার গেণ্ডারিয়া থেকে মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান:

''অপরাধ যত বড় বা হিংস্রই হোক না কেন, ক্রসফায়ার কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য কোন সমাধান নয়। আদালতের দায়িত্ব যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়, তবে নগণ্য হলেও নির্দোষ মানুষ এর শিকার হবেই। বিগত বছরগুলো থেকে আমরা তা দেখে আসছি। এটা ভিন্নমত দমনের একটা হাতিয়ারও বটে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যতই অস্বীকার করুক না কেন, এর অপব্যবহার হবেই। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব এটি বন্ধ করা হবে, ততই মঙ্গল। প্রয়োজনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। ''

শুধু অপব্যবহারই যে হচ্ছে তা নয় মি. রহমান, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ধারণাটাই আইনের শাসনের পরিপন্থী। এ'ধরণের হত্যাকাণ্ডকে 'ক্রসফায়ার'-এর মত নাম দিলেই তা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। বাংলাদেশে এমন কোন আইন আছে কি, যেটা সরকারকে বিনা বিচারে দেশের নাগরিককে হত্যা করার অধিকার দেয়? আমার জানা মতে নেই।

নোয়াখালীর ঘটনা নিয়ে সোমবার সন্ধ্যার রেডিও পরিবেশনা ভাল লেগেছে জানিয়ে লিখেছেন অনুতম বণিক, তবে তিনি কোথা থেকে লিখেছেন তা বলেন নি:

''বেগমগঞ্জ-এর ন্যক্কারজনক ঘটনা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও সময়োপযোগী একটি প্রতিবেদন শুনে অনেক ভালো লাগল। আরও বেশি ভাল লাগল জাকারিয়া স্বপনের সাক্ষাৎকারে এ সম্পর্কিত আরও একটি সম্পূরক প্রতিবেদন শুনে। আশাকরি এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হবে।''

আপনাকেরও ধন্যবাদ মি. বণিক। অনুষ্ঠান আপনার ভাল লেগেছে জেনে আমাদেরও ভাল লাগলো।

ছবির উৎস, Vladimir Komissarov / BBC

ছবির ক্যাপশান,

নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে বহু মানুষ শরণার্থী হয়ে পড়েছেন।

এবার বহির্বিশ্ব নিয়ে একটি চিঠি। আযেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মধ্যে চলমান যুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ:

''চলমান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া দুটি দেশের ভবিষ্যৎ ফলাফল কোনদিকে মোড় নিচ্ছে? ইতোপূর্বে ঘটে যাওয়া নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে বহুল আলোচিত দ্বন্দ্ব এখনো বিদ্যমান। তবে বিবিসির কাছে আমার প্রশ্ন এ দুটি দেশের মধ্যে এ পরিস্থিতির জন্য কারা দায়ী?''

নাগোর্নো-কারাবাখ-এর যে অংশ নিয়ে বিবাদ, তার অধিকাংশ নাগরিক আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত। কিন্তু প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই এলাকাকে আজারবাইজানের অন্তর্ভুক্ত করে। নাগোর্নো-কারাবাখ ইসলাম এবং ক্রিশ্চিয়ানিটি, দু'ধর্মের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে নাগোর্নো-কারাবাখ আর্মেনিয়া যোগ দেবার ঘোষণা করে এবং কয়েক লক্ষ আজেরিকে বের করে দেয়। রাশিয়ার মধ্যস্থতায় প্রথম দফা যুদ্ধ অমীমাংসিত ভাবে শেষ হয়, কিন্তু এখন আজারবাইজান তুরস্কের সহায়তায় তাদের হারানো জমি উদ্ধারের জন্য চরম লড়াই শুরু করেছে। তাহলে কে দায়ী? হয়তো ইতিহাস দায়ী।

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশের কক্সবাজারে একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির।

সম্প্রতি রোহিঙ্গা বিষয়ে বেশ কিছু খবর আমাদের পরিবেশনায় ছিল, বিশেষ করে ভাসানচরে যাওয়া নিয়ে বিতর্ক। সে বিষয়ে দু'একটি চিঠি, প্রথমে লিখেছেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থেকে তানসু দাশ:

''সেই ২০১৭ সালে এক বিরাট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আসলেও আজকে তিন বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও এর কোনো ফলপ্রসূ সমাধান হলো না। রোহিঙ্গারা প্রতি বছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম দিয়ে এক বিরাট জনসংখ্যা সৃষ্টি করে চলেছে যা আগামীতে আরো ভয়ানক রূপ ধারণ করতে পারে। যেহেতু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই তাই তারা ধীরে ধীরে বিভিন্ন অন্যায় কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। এসব বিষয় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে এটা নির্মূল করার কতটা কঠিন হয়ে উঠবে সরকারের জন্য? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কী প্রভাব পড়তে পারে?''

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব হয়তো খুব বেশি পড়বে না মি. দাশ, যদি না জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যরা মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করার জন্য একমত হয়। সে'রকম ঐক্যমত্যের কোন সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। তবে বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সমস্যা যে ক্রমশ একটি সঙ্কটে পরিণত হচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ক্যাম্পে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার যেভাবে গড়িমসি করছে, বাংলাদেশ সরকারের জন্য নিশ্চয়ই সেটাই বড় চিন্তার বিষয়।

ছবির উৎস, Gallo Images

ছবির ক্যাপশান,

বিচ্ছিন্ন জীবন: রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি আবাসন (লাল ছাদ) সহ ভাসানচর, স্যাটেলাইট থেকে তোল ছবি।

পরের চিঠি লিখেছেন বগুড়ার সোনাতলা থেকে আশরাফুল আলম সিদ্দিকি:

''বিবিসি রোহিঙ্গাদের বিষয়ে খুবই ভালো ভূমিকা পালন করছে। তাদের কথা চিন্তা করে আমার খুব চিন্তা হয়। তারা এভাবে আর কতদিন থাকবে। এভাবে তো আর এত মানুষের জীবন চলতে পারে না। তাদেরও তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। ভারত বলেন আর চীন বলুন বা অন্য কেউ, সবাই মুখে বুলি আওড়াচ্ছে কেউ গায়ে মাখতে চাইছে না। কিসের ভয়ে আমি বুঝি না। সারা বিশ্ব কি মিয়ানমার সরকারের কাছে এতই অসহায়? এই রোহিঙ্গাদের অন্যায় কী? কেন তাদের নিয়ে বারবার হেলা করা হচ্ছে?''

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে আমরা দেখেছি মি. সিদ্দিকি, কীভাবে সাধারণ মানুষ জাতিগত বিদ্বেষের কারণে দেশ হারিয়েছেন, গণহত্যার শিকার হয়েছেন। রোহিঙ্গাদের দুর্ভাগ্য যে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীনরা, এমনকি গণতন্ত্রের প্রতীক বলে এক সময়ে খ্যাত অং সান সু চিও এ'ধরণের বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন নাই। বরং রোহিঙ্গাদের 'বাঙালি' আখ্যায়িত করে তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার নীতি গ্রহণ করেছেন। মিয়ানমার এই নীতি থেকে সরে না আসা পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের এই দু:স্বপ্নের শেষ হবে না।

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান,

আসামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আশংকা বাংলাভাষী হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিলে তারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।

এবারে অন্য এক প্রসঙ্গে আসি। বিবিসি বাংলা কি ভারতের নেতিবাচক ঘটনাগুলো এড়িয়ে যায়? পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুরের বাসিন্দা সবুজ বিশ্বাস তাই মনে করছেন:

''বিবিসির সংবাদ আমার ভালো লাগে। কিন্তু, একটা বিষয় লক্ষ্য করে অবাক হই। বিবিসি ভারতের খবর তো সম্প্রচার করেই থাকে, কিন্তু লক্ষণীয়ভাবে দেখা যায়, বিগত কয়েক বছর ধরে ভারতে যে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে, তা নিয়ে বিবিসি নীরব। যেখানে, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া নানান বিষয় নিয়ে বিবিসি চুল চেরা বিশ্লেষণ করে থাকে, যা ভালো লাগে। কিন্তু, ভারতের বিষয়গুলো নিয়ে বিবিসি চুপ কেন?

''যদিও আমি নিজে একটি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় কাজ করি। তবুও এটা স্বীকার করেই বলছি যে, ভারতের মিডিয়া তো নতুন ধারার সংবাদ পরিবেশন করে ইতিমধ্যেই 'মোদী মিডিয়া' উপাধি অর্জন করেছে। আপনারও কি এই নৈরাজ্যের কথা তুলে ধরে তামাম বিশ্বকে জানিয়ে দেবেন না?''

কথাটা আপনি মনে হয় ঠিক বলছেন না, মি. বিশ্বাস। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে যত বড় ঘটনা ঘটেছে বা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেটা গোমাংস খাওয়ার জন্য মুসলিম হত্যাই হোক, ভারতীয় সংবিধানে কাশ্মীরের মর্যাদা বদলানোই হোক, আসামে নাগরিক পঞ্জী দিয়ে বাংলাভাষীদের বিতাড়িত করার পদক্ষেপ হোক, জাতীয়তা আইনে সংশোধন এনে ধর্ম-ভিত্তিক নাগরিকত্ব দেয়ার নীতি ঘোষণাই হোক বা সেই আইন ঘিরে প্রতিবাদ এবং দাঙ্গা - বিবিসি বাংলা সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিস্তারিত খবর এবং বিশ্লেষণ রেডিও এবং অনলাইনে দিয়েছে। তবে নৈরাজ্য বলে না, ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ বলেই খবর সম্প্রচার করা হয়েছে। ভারতে আমাদের সাংবাদিক মাত্র দু'জন কিন্তু তা সত্ত্বেও বড় ঘটনা সব সময় বড় করেই কাভার করা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

আহমদ শফী

তবে বিবিসি বাংলাকে অন্য ভাবে দেখছেন ভারতের পাঠক অর্ক রায়:

''বিবিসিকে আগে নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক সংবাদ মাধ্যম হিসেবে জানতাম। কিন্তু বিবিসির বাংলাদেশি শাখা বিবিসি বাংলা যেভাবে নির্লজ্জভাবে উগ্র ইসলামিক কট্টরপন্থীকে সমর্থন করছে তাতে বিবিসির বাংলার সাংবাদিকদের ধিক্কার জানাই। বিবিসি বাংলা ক'দিন আগে শফি হুজুর মারা যাওয়ার পর যেভাবে তাকে নিয়ে নিউজ দিচ্ছিল, যেন তিনি মহান কোন নেতা। অথচ তার মত একজন উগ্র কট্টর ইসলামিক ব্যক্তি যিনি গোটা বাংলাদেশে শাপলা চত্বরের ঘটনার মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। তার মত একজন উগ্র কট্টর মহিলা বিরোধী ব্যক্তি যিনি মহিলাদের তেঁতুলের সাথে তুলনা করেছিলেন তাকে নিয়ে বিবিসি বাংলা একের পর এক নিউজ দিয়ে তাকে মহান প্রমাণ করতে চেয়ে ব্যস্ত ছিল।''

কাওকে মহান বা অন্য কিছু প্রমাণ করার জন্য বিবিসি বাংলায় কোন প্রতিবেদন, ফিচার, সাক্ষাৎকার কিছুই প্রচার করা হয় না মি. রায়। ধর্ম নয়, বরং আহমদ শফীর গুরুত্ব ছিল রাজনৈতিক দিক থেকে। তিনি বহু বছর মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে জড়িত কিন্তু সে কারণে তিনি জনসমক্ষে আসেন নি, এবং ইসলামিক শিক্ষা জগতে তাঁর অবস্থানের কারণেও মি. শফিকে নিয়ে এত জল্পনা কল্পনা হয় না। হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালে যা করেছিল তার রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল, এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে আহমদ শফীর সখ্যতার কারণে বাংলাদেশে ইসলামীকরণের একটি অধ্যায় শুরু হয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। সে কারণেই আহমদ শফী একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং বিবিসি বাংলায় তার জীবন সেভাবেই পর্যালোচনা করা হয়েছে।

ছবির উৎস, Majority World

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশে অনেক টিউব ওয়েলের পানিতে আর্সেনিক রয়েছে।

এবারে ভিন্ন প্রসঙ্গ। আমাদের অনুষ্ঠান বা কোন চলমান খবর নয়, পরের চিঠি এসেছে সামাজিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে, লিখেছেন নরসিংদী সদর থেকে ওয়ারেছ আলী খান:

''বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে ২০১৯ সালে সম্পাদিত গুচ্ছ জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশের ১১ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সম্পাদিত ২০০৩ সালের সর্বশেষ সমীক্ষায় দেশের ২৯ শতাংশ নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক বিদ্যমান থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এরপর বিগত ১৭ বছরে আর্সেনিক দূষণের ওপর আর কোনো পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা হয়নি।

''এই নীরব ঘাতকের বিষক্রিয়া তথা আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত মানুষের হালনাগাদ তথ্যসহ যথাযথ চিত্র খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছেই অনুপস্থিত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি-২০৩০ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অংশ হিসেবে এবং আর্সেনিক-মুক্ত পানি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তর শিগগির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কি?''

আমরা জানি মি. খান, আর্সেনিক নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে চলছে কিন্তু সমস্যার সমাধান মনে হচ্ছে এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। সবার জন্য সুপেয় এবং নিরাপদ পানি পৌঁছে দেয়া বাংলাদেশের অঙ্গীকার এবং সে লক্ষ্যে কাজ কেন হচ্ছে না, সেটাই বড় প্রশ্ন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

বন্যার কবলে বাংলাদেশ (২০১৭ সালে তোলা ছবি, গাইবান্ধা এলাকায়)

পানি নিয়ে আরেকটি চিঠি, তবে খাবার পানি না। লিখেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোহাম্মদ মাসুদ রানা:

''বন্যা বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। বর্তমান সময়ে বন্যা যেন মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর,পাবনা,সিরাজগঞ্জ জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে এক মাসের ব্যবধানে দুইবার বন্যার পানিতে কৃষকের শীতকালীন সবজি, ধান, পুকুর, ঘর-বাড়ি সহ রাস্তা-ঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। এতে লক্ষ লক্ষ মানুষ পানি বন্দী এবং বেকার হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এসব বন্যা কবলিত জেলার সকল সংসদ সদস্য, বুদ্ধিজীবী, সকল স্তরের সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে সরকার প্রধানের সাথে যৌথ সভার মাধ্যমে বন্যা মোকাবেলায় একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় না কি?''

একটা কথা সব সময় বলা হয় মি. রানা, বন্যা বাংলাদেশের জন্য এক সময়ে আশীর্বাদ আবার অন্য সময়ে অভিশাপ। যুগ যুগ ধরে সেভাবেই চলে আসছে। কিন্তু বন্যাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত, তা নিয়ে মত বিরোধ আছে। ষাটের দশকের বাঁধ নির্মাণ কতটুকু উপকার দিয়েছে, তা নিয়ে পরিবেশবিদ এবং প্রকৌশলীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তবে বন্যার ব্যবস্থাপনা, যাতে অতিরিক্ত পানির উপকারিতা মানুষ পায় কিন্তু তার অপকারিতা থেকে ফসল এবং বাসস্থান রক্ষা পায়, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ভূমিকা তো অবশ্যই থাকে।

ছবির উৎস, TRT Turk

ছবির ক্যাপশান,

এরতুগ্রুল সিরিজের একটি প্রোমো

এবারে আমাদের রেডিও অনুষ্ঠানে ভিন্নতা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাকামে মাহমুদ চৌধুরী:

''তুরস্কের টেলি সিরিয়াল এরতুগ্রুল দেখার সৌভাগ্য না হলেও তার উপর শুভজ্যোতি ঘোষের এর প্রতিবেদনটি পড়ে বেশ রোমাঞ্চিত হলাম। এ ধরনের প্রতিবেদনগুলো তৈরির সময় বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনকারী ওয়েব সিরিজ, সিনেমা বা নাটকটি পুরো দেখার পরে তৈরি করেন, না কি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিবিসির ইংরেজি সংবাদদাতার প্রতিবেদন থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়? তবে যেখান থেকেই করা হোক না কেন, আপনাদের কাছে সংবাদের পাশাপাশি এরকম ভিন্নধর্মী কিছু প্রতিবেদন, বই রিভিউ ইত্যাদি বেশ ভালই লাগে। তবে আমার জানতে ইচ্ছা করে সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি এগুলো দেখার সময় কিভাবে মেইনটেইন করা হয়?''

আমাদের সংবাদদাতারা সাধারণত অনুবাদ করে রিপোর্টিং করেন না মি. চৌধুরী। শুভজ্যেতিও এরতুগ্রুল নিয়ে তার প্রতিবেদন বিভিন্ন লোকের সাথে কথা বলে করেছেন। শিল্প সাহিত্য বা বিনোদন জগতের কিছু যখন 'খবর' হয়, তখন তারা প্রতিবেদন তৈরি করেন। সেটা ঐ বই, সিনেমা বা টেলি সিরিয়ালের রিভিউ না। সেরকম রিভিউ আমাদের অনুষ্ঠানে নেই তবে করা হয়তো যেতে পারে। ভেবে দেখার বিষয়।

পরের চিঠি লিখেছেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেনহাজুল ইসলাম তারেক:

''বিবিসি'র সকালের দুটি অধিবেশন সেই কবেই বন্ধ করে দিয়েছেন। তারপরও অনেক অনেক অনুষ্ঠান পুন:প্রচারের সুযোগ আপনারা পান কীভাবে? একমাত্র প্রীতিভাজনেসু অনুষ্ঠানটি পুন:প্রচার করা যেতে পারে, কিন্তু কই? সেটাতো কখনোই করতে দেখি না।''

আপনি সঠিক বলছেন না মি. ইসলাম। শুধু মাত্র শুক্রবারের বিশেষ প্রতিবেদন পুন:প্রচার করা হয়। অন্য কোন ফিচার পুন:প্রচার করার জায়গা এখন আমাদের অনুষ্ঠানে নেই। আগে বুধবারের ফোন-ইন পুন:প্রচার করা হতো, কিন্তু প্রীতিভাজনেসু ফিরে আসায় সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে।

শেষ করছি ভিন্ন ধরনের একটি চিঠি দিয়ে, পাঠিয়েছেন ঢাকা থেকে রাইহান যিনি শুধু একটি নামই ব্যবহার করেছেন:

''বিবিসি শুধু সংবাদ নয় , গোটা বাংলাদেশর খণ্ড খণ্ড ইতিহাস। শুনলে মন ভালো হয়ে যায়। আমার যখন দশ বছর বয়স, সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে নিজেকে বিবিসি র সাথে আঠার মতো লাগিয়ে রেখেছি। সেই ছোটবেলায় বড়দের সাথে বিবিসি শুনতাম এখন ছোটদের সাথে নিয়ে শুনছি। বিবিসি শুধু সংবাদের জন্য নয় এ যেন আমাদের দৈনন্দিন চাওয়া - পাওয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেদিন কোন কারণে বিবিসি শুনতে পাইনা , সেদিন কিছু অর্জন থেকে বঞ্চিত হই এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি।''

বিবিসি বাংলা সম্পর্কে আপনার সুন্দর কথার জন্য ধন্যবাদ রাইহান। আশা করি ভবিষ্যতেও আপনি বিবিসির সাথে আঠার মতই লেগে থাকবেন।  

এবারে কিছু চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করা যাক:

অনিক সরকার, বুয়েট, ঢাকা।

ফয়সাল আহমেদ সিপন, ঘোড়াদাইড়, গোপালগঞ্জ।

তানভীর আহমেদ।

আরিফুল ইসলাম, পাইকগাছা, খুলনা।

মোহাম্মদ শাহীন আলম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর।

রিপন বিশ্বাস, জোত-শ্রীপুর, মাগুরা ।

মোহাম্মদ রেজাউল রহিম, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।

শহীদুল ইসলাম, তালগাছিয়া, ঝালকাঠি।