পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার রশীদ বাজওয়া ভারতকে হঠাৎ কেন 'অলিভ ব্রাঞ্চ' দেখালেন ?

  • শাকিল আনোয়ার
  • বিবিসি নিউজ বাংলা, লন্ডন
পাকিস্তান সেনাপ্রধান জে. কামার রশীদ বাজওয়া

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান,

পাকিস্তান সেনাপ্রধান জে. কামার রশীদ বাজওয়া

পাকিস্তানে ক্ষমতার কলকাঠি যে সেনাবাহিনীর হাতে তা নিয়ে বড় কোনো বিতর্ক নেই।

ফলে, পাক সেনাপ্রধান জেনারেল কামার রশীদ বাজওয়া যখন বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে নিরাপত্তা সম্পর্কিত এক অনুষ্ঠানে "অতীতের বিরোধকে কবর দিয়ে" ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রীতির কথা বললেন, "শান্তিপূর্ণ উপায়ে" কাশ্মীর সঙ্কট সমাধানের কথা বললেন - স্বভাবতই তা অনেকের নজর কেড়েছে।

জেনারেল বাজওয়াই শুধু নয়, তার আগের দিন ঐ একই অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও ভারতের সাথে তার দেশের সাথে শান্তি স্থাপনের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, আঞ্চলিক শান্তি থাকলেই ভারত মধ্য এশিয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ পাবে।

প্রধানমন্ত্রী খান এবং সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়ার কথার প্রতিধ্বনি করেছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশীও।

ইসলামাবাদের ঐ নিরাপত্তা সম্মেলনে সেনাপ্রধানের বক্তব্যের পর তার ভাষণে পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাদের সরকার ভারতের সাথে "বিরোধের বদলে সহাবস্থান এবং সহযোগিতার" সম্পর্কে ইচ্ছুক।

আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান,

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ভারত শাসিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা খারিজ নিয়ে খুবই ক্ষিপ্ত তিনি

'অতীততে কবর দিয়ে দুই দেশের উচিৎ সামনে তাকানো'

তবে প্রধান নজর পড়েছে জেনারেল বাজওয়ার বক্তব্যের দিকে। তার ভাষণে ভারত নিয়ে অনেক কথা ছিল।

"দক্ষিণ এবং মধ্য এশিয়ায় মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে এই দুই অঞ্চলের সমৃদ্ধির সম্ভাবনা কাজ লাগাতে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কে স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্ত এই দুই পারমানবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে বিরোধে সেই সম্ভাবনা জিম্মি হয়ে রয়েছে।"

জেনারেল বাজওয়া স্বীকার করেন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে বৈরিতার মূলে রয়েছে কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ।

"কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি অতীততে কবর দিয়ে দুই দেশের উচিৎ সামনে তাকানো।"

তিনি বলেন - কাশ্মীর সমস্যার সমাধান না হলে উপমহাদেশের শান্তি এবং বোঝাপড়া "রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বোলচালের ঝুঁকিতে থেকে যাবে।"

জেনারেল বাজওয়া বলেন, ভারতের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে পাকিস্তানের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের পেছনে "কোনো চাপ নেই" বরঞ্চ রয়েছে "বাস্তব যুক্তি"।

কেন এখন এই অলিভ ব্রাঞ্চ?

পাকিস্তানের মহা-ক্ষমতাধর সেনাপ্রধানের এই ভাষণ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানে শুরু হয়েছে নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ - কেন জেনারেল বাজওয়া এখন ভারতের উদ্দেশ্যে জলপাইয়ের ডাল (অলিভ ব্রাঞ্চ) নাড়াচ্ছেন ?

তার কথায় কতটুকু ভরসা করা যায়? ভারতের বিজেপি সরকার কতটা সাড়া দেবে? তাদের মনোভাব কী?

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান,

কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখার পাহারায় এক পাকিস্তানি সৈন্য

লন্ডনে সোয়াস ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসির গবেষক এবং পাকিস্তান রাজনীতির বিশ্লেষক ড. আয়েশা সিদ্দিকা বিবিসি বাংলাকে বলেন, পাকিস্তান সেনাপ্রধান এবং ক্ষমতাসীন সরকারের এসব ইঙ্গিতের টার্গেট ভারত যতটা তার চেয়ে বেশি আমেরিকা।

"আর এই বার্তার পেছনে সবচেয়ে প্রধান যে তাড়না তা হলো পাকিস্তানের অর্থনৈতিক তাড়না।"

ড. সিদ্দিকা বলেন, "পাকিস্তান বুঝতে পারছে যে, আমেরিকার প্রশান্ত-মহাসাগরীয় অঞ্চলের নীতিতে তারা অনুপস্থিত। ভারত সেখানে মধ্যমণি। সেটা অবশ্যই পাকিস্তানের বড় মাথাব্যথা।"

"সেজন্য খেয়াল করবেন - জেনারেল বাজওয়া বলেছেন চীনের সাথে তাদের অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) অর্থ এই নয় যে পাকিস্তান শুধু সেটির ওপরই ভরসা করছে।"

পাকিস্তান সেনাপ্রধান বৃহস্পতিবার বলেছেন যদিও আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সিপিইসি এখন পাকিস্তানের বড় অগ্রাধিকার, কিন্তু "শুধু সিপিইসির কাঁচ দিয়ে পাকিস্তানকে দেখা ঠিক নয়।"

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতের ইতিহাস নতুন নয়

ড. সিদ্দিকা বলেন, চীন পাকিস্তানের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে ৪৮০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে ঠিকই কিন্তু তার সবটাই দীর্ঘমেয়াদী ঋণ, নগদ কোনো অর্থ নয়। ঋণের এই টাকা শোধ দেওয়া নিয়েও এক ধরণের উদ্বেগ রয়েছে।

তিনি বলেন, পাকিস্তানের নগদ অর্থের সঙ্কট বেড়েছে। সম্পর্ক চটে যাওয়ায় ইউএই, সৌদি আরব তাদের ঋণের টাকা ফেরত চাইছে। আমেরিকার কাছ থেকে যে নগদ অর্থ আসতো তাতেও ঘাটতি পড়েছে।

ড. সিদ্দিকা বলছেন, "যুক্তরাষ্ট্রকে এখনও অত্যন্ত প্রয়োজন পাকিস্তানের। আইএমএফের টাকা নিতেও আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠতা দরকার।

পশ্চিমা বিনিয়োগের জন্য এখনও আমেরিকার সাথে সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক। চীন সম্প্রতি পাকিস্তানের তৈরি পোশাকের জন্য বাজার খুলে দিয়েছে, কিন্তু এখনও পাকিস্তানের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র।"

তাছাড়া, তিনি বলেন, সম্পর্ক ভালো হলে ভারতের বিশাল বাজারও পাকিস্তানের জন্য বিরাট সুযোগ তৈরি করবে।

ভারত কতটা ইচ্ছুক?

কিন্তু বড় প্রশ্ন হচ্ছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার পাকিস্তানের সাথে বিরোধ মেটাতে কতটা ইচ্ছুক?

জেনারেল বাজওয়ার কথার ওপরই বা তারা কতটা ভরসা করতে পারে?

ড. আয়েশা সিদ্দিকা বলছেন, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যে জেনারেল বাজওয়া কি তার ব্যক্তিগত ইচ্ছার কথা বলছেন নাকি পাকিস্তানের সেনা নেতৃত্বের বৃহত্তর অংশের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন।

ছবির ক্যাপশান,

ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের এক বড় কারণ কাশ্মীর

"জেনারেল বাজওয়ার চাকরির মেয়াদ আর বেশিদিন নেই। তাছাড়া পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর কোর কমান্ডাররা কি চাইছেন বা এমনকি কর্নেল র‌্যাঙ্কের মধ্য-সারির সেনা অফিসাররা কি চাইছেন তাও গুরুত্বপূর্ণ। তারা কাশ্মীরের কোন ধরনের সমাধান দেখতে চান তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।"

ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার মূলে রয়েছে কাশ্মীর।

মোদী সরকার সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে ভারতশাসিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা খারিজের পর সেই বৈরিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাহলে জেনারেল বাজওয়া কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের যে কথা বলছেন তা কীভাবে হতে পারে?

ড.আয়েশা সিদ্দিকা মনে করেন, জেনারেল বাজওয়ার হাতে কাশ্মীর নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মুশাররফের ফর্মুলার পুনরুত্থান করা ছাড়া তেমন কোনো বিকল্প নেই।

"ভারতের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর উপত্যকায় ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অংশে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে জেনারেল মুশাররফের সাথে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বোঝাপড়া চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। জেনারেল কায়ানি (তৎকালীন পাকিস্তান সেনাপ্রধান) সেই বোঝাপড়া নস্যাৎ করে দেন।"

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

কাশ্মীর বিভক্ত ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এল ও সি দিয়ে

ড. সিদ্দিকা বলেন, ভারত কাশ্মীরের সমাধানে ইচ্ছুক কারণ চীনের সাথে বিরোধ বাড়ায় কাশ্মীর সীমান্তে চাপ কমলে তা তাদের স্বার্থের পক্ষে যাবে।

কিন্তু, তিনি বলেন, "পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে, রাজনীতিকদের মধ্যে কাশ্মীরের সমাধান নিয়ে ঐক্যমত্য কতটা - সেটাই সবচেয়ে বড় কথা।"

সে কারণেই ড. সিদ্দিকা মনে করেন, ভারত বা আমেরিকা জে. বাজওয়ার কথায় উৎসাহিত বোধ করলেও তারা হয়ত এখন বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে।

'বল এখন ভারতের কোর্টে'

পাকিস্তানের সাবেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাভেদ জব্বার বিবিসিকে বলেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের বক্তব্য একবারে নতুন কিছু নয়।

"জেনারেলের বক্তব্যকে এমনভাবে বিশ্লেষণ করা উচিৎ হবে না যে ভারতের বর্তমান হিন্দুত্বাবাদী সরকারের আগ্রাসনবাদী আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পাকিস্তানের সন্দেহ ঘুচে গেছে।“

তিনি বলেন, পাকিস্তানের সাথে উত্তেজনা নিরসনে ভারতের ওপরও চাপ রয়েছে বাইডেন সরকারের।

"পাকিস্তান সবসময় ভারতের সাথে শর্তহীন আলোচনা চেয়েছে। সরাসরি বলেছে, পর্দার অন্তরালেও বলেছে। জেনারেল বাজওয়া তার পুনরাবৃত্তি করলেন। বল এখন ভারতের কোর্টে।"

আরো খবর: