রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন: কাঁটাতারের বেড়ার কারণে বেশি হতাহত হয়েছে দাবি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের, কর্তৃপক্ষের প্রত্যাখ্যান

  • নাগিব বাহার
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
পুড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ঘর পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছে অনেকে

ছবির উৎস, Obaidul Huq Chowdhury

ছবির ক্যাপশান,

পুড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ঘর পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছে অনেকে

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রোহিঙ্গা শিবিরে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের সময় কাঁটাতারের বেড়ার কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আটকে পড়ে বলে বিবৃতি দেয়ার পর তা প্রত্যাখ্যান করেছে ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ।

এইচআরডব্লিউ বলছে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরের চারপাশের বেড়া অতিসত্বর অপসারণ করা।

তবে কক্সবাজারে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কর্তৃপক্ষ তাদের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যন করেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, "রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর কাঁটাতারের বেড়ার কারণে কীভাবে আটকে পড়েছিলেন, সেসবের ভয়াবহ বর্ণনা পাওয়া গেছে।"

পাশাপাশি শিবিরে আগুনের ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে দ্রুত তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, ওবায়দুল হক চৌধুরি

ছবির ক্যাপশান,

কুতুপালং ক্যাম্পে আগুনের দৃশ্য

কী বলছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ?

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ২২শে মার্চে হওয়া অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৬১ হেক্টর পরিমাণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রায় ১০ হাজার ঘর পুড়ে যায় বলে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবিতে দেখা গেছে।

সংস্থাটি বিবৃতিতে বলছে, তারা ১৭ জন প্রত্যক্ষদর্শী এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীর সাথে কথা বলেছে, যারা আগুনে তাদের পরিবারের সদস্য হারিয়েছেন। তাদের ভাষ্যমতে, শিবিরের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া থাকার কারণে তাদের পরিবারের সদস্যরা দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারেনি।

আগুনে ৫ বছর বয়সী সন্তান হারানো এক ব্যক্তিকে উদ্ধৃত করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলছে, "৯ নম্বর ক্যাম্প থেকে সবাই যখন পালাচ্ছিল, তখন আমি আর আমার স্ত্রী আমাদের ছেলেকে হারিয়ে ফেলি। সবাই ক্যাম্পের প্রধান প্রবেশপথের দিকে যাচ্ছিল, সেটাই ক্যাম্পে যাওয়া-আসার একমাত্র পথ। অন্য সবদিক দিয়েই বেড়া রয়েছে।"

"হারিয়ে যাওয়ার পর আমাদের খুঁজতে আমাদের থাকার জায়গায় ফিরে গিয়েছিল আমার ছেলে। সেখানে তার পুড়ে যাওয়া মরদেহ পাই আমরা। বেড়া না থাকলে মানুষ অন্যান্য পথ দিয়েও বের হতে পারতো।"

বেড়া থাকায় সাম্প্রতিক আগুনের ঘটনায় বিশেষ করে বৃদ্ধ, শিশু এবং শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে বলে মনে করছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরো মন্তব্য করেছে যে বেড়া থাকার কারণে দমকল বাহিনীর গাড়ি এবং জরুরি সেবা দিতে আসা যানবাহন প্রবেশও ব্যাহত হয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, চলাফেরা সীমিত করার প্রয়োজন বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন মেনে কক্সবাজারে শরণার্থী ক্যাম্পের বেড়া তৈরি করা হয়নি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কর্মকর্তা ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, "ক্যাম্পের ভেতরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বেড়ার মধ্যে রেখে শরণার্থীদের জীবন বাঁচানোর কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের উচিত মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাথে কাজ করা এবং শরণার্থীদের চলাফেরার স্বাধীনতাকে সম্মান করা।"

ছবির উৎস, Salman Saeed

ছবির ক্যাপশান,

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের একটি অংশে কাঁটাতারের বেড়া

কর্তৃপক্ষ কী বলছে?

কাঁটাতারের বেড়া থাকার কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আগুনে হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়েছে - হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এমন বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে কর্তৃপক্ষ।

কক্সবাজারে অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ শামছু-দ্দৌজা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এই ধরণের বক্তব্য আসার কোনো কারণ নেই। বেড়ার কারণে হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়েছে, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।"

ক্যাম্পের পরিধি এবং আগুনের ব্যাপকতার বিষয়ে উল্লেখ করে মি. শামছু-দ্দৌজা বলেন, "বিস্তৃত জায়গা জুড়ে কত মারাত্মক আগুন লাগলো তা আপনারা দেখেছেন। সেই হিসেব করলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম ছিল। কারণ আমাদের উদ্ধার কার্যক্রম চমৎকারভাবে, অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে।"

বেড়া থাকার কারণে উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে - এমন দাবিও সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন মি. শামছু-দ্দৌজা।

তিনি বলেন, "অত্যন্ত দ্রুতগতিতে উদ্ধারকাজ সফলভাবে পরিচালনা করা গেছে বলেই ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। এর আগেও বিশ্বের বেশকিছু জায়গায় শরণার্থী শিবিরে আগুন লেগেছে। সেগুলোর সাথে আমাদের এখানকার ঘটনার ক্ষয়ক্ষতির পার্থক্য তুলনা করে দেখুন।"

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাসহ বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসেব অনুযায়ী আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫ জন মারা গেছেন, তবে সরকারি হিসেব অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা ১১ জন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের বিবৃতিতে বলছে, চারশোর মত মানুষ সেখানে নিখোঁজ আছে এখনো। পুড়ে গেছে ১০ হাজারের বেশি ঘর। এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করছে তারা।

অবশ্য এসব তথ্যও নিশ্চিত করেনি বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ।

ভিডিওর ক্যাপশান,

কয়েক ঘণ্টা ধরে এ আগুনে পুড়ে যায় রোহিঙ্গাদের শত শত ঘর।

স্থানীয়রা কী বলছেন?

বেড়া থাকার কারণে আটকে পড়ে কারো মৃত্যু হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলেও রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের কয়েকজন ব্যক্তি জানান আগুন থেকে বাঁচতে বেড়া টপকে পালানোর সময় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

বালুখালী ক্যাম্পের মোহাম্মদ সিরাজ বলেন, "বালুখালী ক্যাম্পে প্রবেশের একটাই বড় রাস্তা। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই মূল প্রবেশপথ দিয়ে বের হতে পারেনি। সেসময় তারা কাঁটাতারের বেড়া বেয়ে বা কেটে বের হওয়ার চেষ্টা করে। তখন কয়েকজন কিছুটা আহত হয়।"

একই ক্যাম্পের মোহাম্মদ বাতেন জানান, "কাঁটাতারের বেড়া না থাকলে তাড়াতাড়ি, সহজে বের হওয়া যাইতো। আহত হতো আরো কম মানুষ।"

তবে বেড়া থাকার কারণে উদ্ধারকার্য ব্যাহত হয়েছে বা আগুন নেভানোর কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করেন না তারা।