টাওয়ার হ্যামলেটস: লন্ডনের বাঙালী-প্রধান এলাকার মেয়র পদ্ধতিকে 'গুডবাই' জানানোর উদ্যোগ

  • মাসুদ হাসান খান
  • বিবিসি নিউজ বাংলা
২০১০ সালে টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রথম মেয়র নির্বাচনের একটি ভোট কেন্দ্র।

ছবির উৎস, LEON NEAL

ছবির ক্যাপশান,

২০১০ সালে টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রথম মেয়র নির্বাচনের একটি ভোট কেন্দ্র

পূর্ব লন্ডনে বাঙালী-প্রধান টাওয়ার হ্যামলেটস বারায় বর্তমান মেয়র পদ্ধতির প্রশাসন ব্যবস্থার অবসান চাইছে এখনকার রাজনৈতিক দলগুলি।

এ নিয়ে আগামী ৬ই মে সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পাশাপাশি, টাওয়ার হ্যামলেটসে মেয়র পদ্ধতি বহাল রাখা হবে কি-না, তা নিয়েও এক গণভোট হতে যাচ্ছে।

টাওয়ার হ্যামলেটসের লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, কনজারভেটিভ এবং গ্রিন পার্টির রাজনীতিকরা মেয়র পদ্ধতি বিলোপের পক্ষে একযোগে প্রচার চালাচ্ছেন। তারা গড়ে তুলেছেন 'লিডিং টুগেদার' ক্যাম্পেইন।

বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসনের বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এমপি রুশনারা আলী এবং বারার বর্তমান মেয়র জন বিগস নিজেও এই প্রথা বিলোপের পক্ষে, যদিও এর পেছনেও রয়েছে স্থানীয় রাজনীতি।

এরা চাইছেন, সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনের পদ্ধতি বিলোপ করে তার জায়গায় কাউন্সিলে 'লিডার ও ক্যাবিনেট' পদ্ধতি চালু করতে।

ছবির উৎস, ODD ANDERSEN

ছবির ক্যাপশান,

ব্রিকলেনের ভোটেকন্দ্রে এজেন্টদের ভীড়। ছবিটি ২০১০ সালে তোলা।

আরও পড়তে পারেন:

তাদের যুক্তি: এর মাধ্যমে ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলারদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা থাকবে এবং ক্ষমতার সুষম বণ্টন সম্ভব হবে।

মূলত একজন নির্বাহী মেয়র থাকলে বারার কাউন্সিলাররা আর পাদপ্রদীপের আলোতে থাকতে পারেন না। সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন একজন মেয়র।

অন্যদিকে, এই প্রস্তাবের বিপক্ষে মাঠে নেমেছেন প্রথম সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সাবেক মেয়র লুৎফুর রহমান। ব্যারোনেস পলা উদ্দিনের মতো কিছু রাজনীতিক, কমিউনিটি নেতা এবং ব্যবসায়ী তাকে সমর্থন দিচ্ছেন।

নির্বাচনকে সামনে রেখে এক খোলা চিঠিতে মি. রহমান বলেছেন, মেয়র পদ্ধতি বিলোপ হলে টাউন হলে বসে এক দল কাউন্সিলার গোপনে একজনকে 'লিডার' বানাবেন। তখন ক্ষমতা চলে যাবে পর্দার আড়ালে।

ছবির উৎস, Helal Abbas

ছবির ক্যাপশান,

নির্বাচনী প্রচারণায় কাউন্সিলার হেলাল আব্বাস (ফাইল ফটো)

"সাধারণ জনগণ নয়, লিডারকে খুশি রাখতে হয় স্বল্প সংখ্যক কিছু কাউন্সিলার এবং নেতাকে … টাউন হলে বসে ব্যক্তি-বিশেষের রাজনীতি করতে হয়," লিখেছেন তিনি।

"ব্যাপারটা মোটেও সে রকম না," বলছেন মেয়র প্রথা বিলোপ সমর্থনকারী সাবেক লেবার কাউন্সিলার হেলাল উদ্দিন আব্বাস। "জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি।"

মেয়র প্রথা বিলোপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বিবিসিকে বলেন, সরাসরি ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলাররাই জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি। ভোটারদের ভালমন্দের দায়দায়িত্ব তাদেরই। ভোটাররা যদি চান পরবর্তী নির্বাচনে তাকে বাদ দিতে পারেন।

ছবির উৎস, JUSTIN TALLIS

ছবির ক্যাপশান,

লুৎফুর রহমান, টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রথম নির্বাচিত মেয়র

ব্রিটেন সংক্রান্ত আর খবর:

"কিন্তু একজন মেয়রকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এককভাবে, যেখানে ভুল করার সুযোগ থাকে। এ কারণেই এটা বেশ অগণতান্ত্রিক। এখানে যথেষ্ট চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নেই," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

নির্বাহী মেয়র: এক যুগের পরীক্ষা

টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র পদ্ধতির বিলোপ নিয়ে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান অনেকটা রাষ্ট্রপতি এবং সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার পার্থক্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

জনগণের সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনের পদ্ধতি চালু হয়েছিল ২০১০ সালে। ওই সময় এক গণভোটে টাওয়ার হ্যামলেটসের বাসিন্দারা লিডারশীপ পদ্ধতি বাতিল করে একজন মেয়রকে ক্ষমতার কেন্দ্রে দেখতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের তৎকালীন লেবার পার্টির মধ্যে দেখা দেয় দলীয় কোন্দল। প্রথমদিকে লুৎফুর রহমানকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হলেও পরে প্রার্থী তালিকা পরিবর্তন করা হয় বারবার।

পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত লেবার পার্টির জাতীয় নির্বাহী কমিটিকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। কমিটি শেষ পর্যন্ত মি. রহমানের নাম বাদ দিয়ে হেলাল উদ্দিন আব্বাসকে মনোনয়ন দেয়।

ছবির উৎস, Yes For Mayor

ছবির ক্যাপশান,

স্থানীয় কমিউনিটি পত্রিকায় রাজনীতির খবর। (ফাইল ফটো)

এর প্রতিবাদে লেবার পার্টি থেকে বেরিয়ে লুৎফুর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়েন এবং প্রথম নির্বাহী মেয়র হিসেবে বিজয়ী হন।

কিন্তু মেয়র পদে নির্বাচনের আগে এবং পরে মি. রহমানের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তার সাথে ইসলামী কট্টরবাদের যোগাযোগ, 'বাংলাদেশী কায়দায়' ভোটের প্রচারকাজ, ভোট জালিয়াতি এবং ব্যাপক স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে।

তবে ব্রিটেনের নির্বাচন সংক্রান্ত আদালত এসব অভিযোগ নাকচ করে দেয়। ফৌজদারি অভিযোগগুলোও পরে পুলিশী তদন্তে ভিত্তিহীন হিসেবে প্রমাণিত হয়। কিন্তু ততদিনে লুৎফুর রহমানের ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে।

পরের মেয়াদের জন্য যে মেয়র নির্বাচন হয়, ভোটে অনিয়মের অভিযোগে সেই নির্বাচনের ফলাফল বাতিল হয়ে যায়।

এসব ঘটনা নিয়ে ব্রিটেনের মূল সংবাদমাধ্যমে যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়, তার একটি প্রভাব হচ্ছে: অন্তত স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মধ্যে সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনের পদ্ধতি সম্পর্কেই আস্থা দৃশ্যত অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফলে ১০ বছর পর পর মেয়র পদ্ধতি সম্পর্কে গণভোটের বিধান এখন এই পদ্ধতিকে বদলে দেয়ার নতুন আরেকটি সুযোগ তৈরি করেছে।

হ্যাঁ-ভোট, না-ভোট: রাজনীতির খেলা

ছবির উৎস, Prisma by Dukas

ছবির ক্যাপশান,

টাওয়ার হ্যামলেটসের ডকল্যান্ডস এলাকা যেমন বিশ্ব বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র, তেমনি ব্রিটেনের সবচেয়ে দরিদ্র কিছু মানুষ এই এলাকায় থাকেন

"টাওয়ার হ্যামলেটসের রাজনীতি আগেও বিভাজনের রাজনীতি ছিল, এখনও তা-ই আছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিক সৈয়দ নাহাস পাশা।

অতীতে কাউন্সিলারদের মধ্য থেকে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হতে গেলেই তাকে ফেলে দেয়া হতো বাংলাদেশী-'নন বাংলাদেশী' রাজনীতির আবর্তে, তিনি বলছেন, ফলে সেই ঘূর্ণিপাক থেকে তার আর বেরিয়ে আসার সুযোগ থাকতো না।

পূর্ব লন্ডনের রাজনীতিকে যারা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তাদের অনেকেরই মত যে এবারের গণভোট নিয়েও একই ধরনের রাজনীতি চলছে।

ছবির উৎস, Yes For Mayor TH

ছবির ক্যাপশান,

মেয়র পদ্ধতি বহাল রাখার পক্ষে প্রচারপত্র

নাহাস পাশা বলছেন, বাংলা ভাষা শিক্ষার তহবিল বন্ধ করে দেয়া, বিভিন্ন কমিউনিটি প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিলে কাটছাঁট করার মতো ইস্যুগুলোকে ঘিরে বর্তমান মেয়র জন বিগসের প্রতি অনেক ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু তাকে সরাতে হলে লেবার পার্টির মধ্য থেকে বিকল্প প্রার্থী খুঁজে বের করতে হবে এবং পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

কিন্তু তার আগেই মেয়র পদ্ধতি রাখা না রাখার প্রশ্নে গণভোটে টাওয়ার হ্যামলেটস বাসিন্দাদের একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

"মেয়র পদ্ধতি প্রমাণ করেছে যে এর মাধ্যমে কাউন্সিলারদের ক্ষমতা কেড়ে নেয়া যায়। এবং একটা নিরঙ্কুশ একনায়কতন্ত্র চালু হয়," বলছেন হেলাল উদ্দিন আব্বাস। তিনি লুৎফুর রহমানের প্রশাসন পদ্ধতির দক্ষতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন তোলেন।

ছবির উৎস, Mike Kemp

ছবির ক্যাপশান,

পূর্ব লন্ডনের একটি স্ট্রিট মার্কেট

"দায়বদ্ধতা এবং চেক-অ্যান্ড-ব্যালেন্স না থাকলে কোনভাবেই একটা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যায় না। সেখানে দুর্নীতির শেকড় গেড়ে বসে।"

"আর সে কারণেই আমরা চাই এই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান," বলছেন তিনি।

মেয়র, না লিডার

ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দু'টি পদ্ধতি প্রায় একই। দু'টিই কার্যত নির্বাহী প্রশাসন।

একটি কাউন্সিলের বাজেট, কর ইত্যাদি নির্ধারিত হয় কাউন্সিলারদের পূর্ণাঙ্গ বৈঠকে। একটি নির্বাহী কমিটি কাউন্সিলের দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা করেন।

ছবির উৎস, IAN VOGLER

ছবির ক্যাপশান,

প্রিন্স উইলিয়াম এবং তার স্ত্রী পূর্ব লন্ডনের একটি মসজিদ পরিদর্শন করছেন (ফাইল ফটো)

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত মেয়রই বারার সর্বেসর্বা। তিনি ও তার উপদেষ্টা ক্যাবিনেট টাওয়ার হ্যামলেটসের সব বিষয়ে নেতৃত্ব দান করেন।

তিনি তার কর্মকাণ্ডের জন্য ভোটারদের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন।

অন্যদিকে, 'লিডার ও ক্যাবিনেট' পদ্ধতিতে ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলাররা তাদের মধ্য থেকে একজনকে 'লিডার' বা নেতা নির্বাচিত করেন। লিডার একটি ক্যাবিনেট তৈরি করেন।

এখানে পার্থক্যটা হচ্ছে, মেয়রকে অপসারণ করতে চাইলে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আর কাউন্সিলাররা চাইলে অনাস্থা ভোট এনে নেতৃত্বে রদবদল ঘটাতে পারেন।

ছবির উৎস, Barry Lewis

ছবির ক্যাপশান,

হোয়াইট চ্যাপেল এলাকা

ব্রিটেনের কাউন্সিল রাজনীতির ওপর একজন বিশ্লেষক, ভিনসেন্ট ক্যারল ব্যাটালিনো এক নিবন্ধে লিখছেন, প্রশাসনের সংস্কৃতিতে কোন পরিবর্তন না করে শুধু শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন করলেই যে সব সমস্যার সমাধান হবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই।

ক্যাবিনেট পদ্ধতি হলেই তা বেশি গণতান্ত্রিক হবে সেটা যেমন ঠিক না, তিনি লিখছেন, আবার মেয়র হলেই যে কেউ একনায়কে পরিণত হবে সেটাও ভুল ধারণা।

দু'টি পদ্ধতিই কাউন্সিলে দুর্বল বিরোধীদলের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম।

লুৎফুর রহমান: শেষ টিকেটের যাত্রী

মেয়র প্রশ্নে এই গণভোট সাবেক মেয়র লুৎফুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের বাঁচা-মরার লড়াই। অপপ্রচার এবং দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে ২০১৪ সালে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। এখন এই গণভোটের মধ্য দিয়ে তিনি ভোটের রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ খুঁজছেন।

আর সেজন্যেই তিনি গড়ে তুলেছেন একটি প্ল্যাটফর্ম - ইয়েস ফর মেয়র টিএইচ (টাওয়ার হ্যামলেটস)

মি. রহমানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, পরবর্তী মেয়র নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন কি-না। এই প্রশ্নের সরাসরি কোন জবাব তিনি দেননি। শুধু এটুকই বলেছেন, পুরো ব্যাপারটা নির্ভর করবে মেয়র প্রথার অবসানের প্রস্তাব ভোটাররা নাকচ করে দেন কি-না, তার ওপর।

টাওয়ার হ্যামলেটসের ভোটাররা যদি বিশ্বাস করেন মেয়র প্রথা তাদের জন্য সুফল বয়ে আনছে এবং এই ব্যবস্থা তারা বহাল রাখতে চান, তাহলে সেটা হবে লুৎফুর রহমানের জন্য সুখবর।

তখন পরীক্ষিত সমর্থক গোষ্ঠীর ওপর ভর করে তিনি নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে আবার লড়তে পারবেন।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কিন্তু যদি মেয়র প্রথা বাতিল হয়ে যায় এবং 'লিডার ও ক্যাবিনেট' প্রথা আবার ফিরে আসে তাহলে মি. রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর: