হেফাজতে ইসলাম: মানুষ দেখেছে ধর্মান্ধরা কী করতে পারে-সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে - ড. রাজ্জাক

  • কাদির কল্লোল
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
মামুনুল হক
ছবির ক্যাপশান,

মামুনুল হক

বাংলাদেশে সম্প্রতি একটি রিসোর্টে নারীসহ অবস্থানের ঘটনা নিয়ে আবার আলোচনায় আসা হেফাজতে ইসলামের অন্যতম নেতা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

একজন সিনিয়র মন্ত্রী জানিয়েছেন, ঘটনাটির তদন্ত করা হচ্ছে।

তবে এখন সহিংসতার অভিযোগে মামলাগুলোকেই সামনে আনা হচ্ছে, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে।

এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে এবং ঢাকায় সম্প্রতি যে নাশকতা এবং সংঘাত হয়েছে, সে ব্যাপারেও এখন সরকার আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছে।

এদিকে রিসোর্টের ঘটনা নিয়ে হেফাজতের নেতৃত্ব মামুনুল হককে পূর্ণ সমর্থন দিলেও সেই ঘটনা নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষাপটে সংগঠনটিতে অস্বস্তি রয়েছে বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন:

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক আলোচনায় এসেছেন বিভিন্ন সময়।

কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে তার বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

সম্প্রতি স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ কয়েকটি জায়গায় হেফাজতের কর্মসূচি সহিংস রুপ নিয়েছিল। সে ব্যাপারে সরকারের মুল অভিযোগ মামুনুল হকের বিরুদ্ধে। তিনি সে অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

সর্বশেষ মামুনুল হক আলোচনায় এসেছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে একটি রিসোর্টে এক নারীসহ অবস্থানের ঘটনা নিয়ে।

সিনিয়র মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড: আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ঘটনাটির তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্ত করা হচ্ছে।

"হেফাজতের নেতারা তাকে (মামুনুল হককে) যেভাবে সমর্থন দিচ্ছে। কিন্তু আমরা যে সব তথ্য আমরা পাচ্ছি সে অনেক জঘন্য অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। ইসলাম ধর্মে এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি এবং আরও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা হবে।"

ছবির উৎস, MASUK HRIDOY

ছবির ক্যাপশান,

হেফাজতে ইসলামের ডাকা গত ২৮শে মার্চে হরতালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় গত ২৬শে মার্চ থেকে তিন দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এবং ঢাকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় হেফাজতের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে।

এসব ঘটনায় ২৫টির বেশি মামলা হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে ঘটনার জন্য হেফাজতকে দায়ী করা হলেও মামলাগুলোতে সংগঠনটির নেতাদের নাম দেয়া হয়নি। সরকার সমর্থিত বিভিন্ন সংগঠনই এমন অভিযোগ তোলে।

তবে ঢাকায় বায়তুল মোকাররম এলাকায় নাশকতার অভিযোগে এখন এসে গত সোমবার একটি মামলা করা হয়েছে মামুনুল হক সহ হেফাজতের ১৭জন নেতার বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগেই সরকার এখন মামুনুল হক এবং হেফাজতের নেতাদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে।

সহিংসতার ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপের ব্যাপারে মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একটি বৈঠক হয়েছে বলেও জানা গেছে।

মন্ত্রী ড: আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, সহিংসতার ব্যাপারে সরকার কোন ছাড় দেবে না।

"তারা যে কর্মকাণ্ড করেছে, সেটা মোকাবেলা করতে হলে শত শত মানুষকে গুলির মুখে ফেলতে হতো। কিন্তু সেটা সরকার করে নাই, সরকার ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়েছে। সারা জাতি দেখেছে এবং সারা পৃথিবীর মানুষ দেখেছে যে, ধর্মান্ধরা কী করতে পারে-সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে" বলেন ড: রাজ্জাক।

তিনি আরও বলেছেন, "যারা এই ধ্বংসাত্নক কাজে জড়িত ছিল, তাদের সবাইকে আইন অনুযায়ী কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। তারা কোনক্রমেই রেহাই পাবে না।"

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় ২৬শে মার্চ ঢাকায় বায়তুল মোকাররম এলাকায় হেফাজত কর্মীরা বিক্ষোভ করে।

হেফাজতে অস্বস্তি

যদিও হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতৃত্ব মামুনুল হককে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন। কিন্তু সংগঠনটির নেতাদের অনেকের মাঝে অস্বস্তিও রয়েছে বলে জানা গেছে।

রিসোর্টে নারী নিয়ে অবস্থানের ঘটনার ব্যাপারে মামুনুল হককে নিয়ে ঢাকায় হেফাজতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা গত সোমবার বৈঠক করেছেন।

সংগঠনটির মহাসচিব নুরুল ইসলাম জেহাদী বিবিসিকে বলেছেন, "আমরা ভালভাবে তদন্ত করেছি। বৈঠকে সব সদস্যের সামনে তার (মামুনুল হক) বক্তব্য সে তুলে ধরেছে। আমাদের যা জিজ্ঞাসাবাদ করার তা করেছি, সেটা করার পর আমরা নিশ্চিত হইছি যে, তার বধে স্ত্রী। সেজন্য তাকে হেনস্থা করার ঘটনায় জড়িতদের আমরা বিচার চাইছি।"

হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর আব্দুর রব ইউসুফী বিবিসিকে বলেছেন, "আমরা বাহ্যিকভাবে শরিয়তের দৃষ্টিতে যা আমরা পেয়েছি, সে হিসাবে আমরা আমাদের বক্তব্য দিয়েছেযে উনি (মামুনুল হক) শরিয়তের লংঘন কিছু করেন নাই।"

"সে জন্যই আমরা বলেছি যে, একজন লোক তার স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার পর তার সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, সেটা আমাদের বিব্রত করেছে," বলেন তিনি।

কিন্তু রিসোর্টে নারী নিয়ে অবস্থানের ঘটনাটি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এবং নানা আলোচনা হচ্ছে, এ নিয়ে হেফাজতে অনেকের অস্বস্তি থাকলেও বিষয়টিতে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি বলে এর নেতাদের অনেকে বলেছেন।

হেফাজত নেতা মি: ইউসুফী বলেছেন, "বিষয়টাতো অত্যন্ত সেনসেটিভ (স্পর্শকাতর)। এটা যে কোন মানুষ তার বিবেক-বিবেচনা থাকলে এখানে আপনার কিছুটা বিব্রত হওয়ার বিষয়তো আছে।"

"এ বিষয়গুলি এখনও আলোচনায় আসে নাই। দেশে লকডাউন চলছে এবং সেজন্য পারস্পরিকভাবে বসার মতো পরিবেশ এখন নাই। এগুলো হয়তো আলোচনায় আসবে," বলেন মি: ইউসুফী।

এদিকে, হেফাজতে ইসলামের অন্য একাধিক নেতা বলেছেন, এ মুহুর্তে তারা তাদের সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে চাইছেন। কোন প্রশ্ন থাকলে, তা নিয়ে তারা পরে আলোচনা করবেন।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর: