হেফাজতে ইসলাম: 'শিশু বক্তা' রফিকুল ইসলাম মাদানী যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পরিচিত হয়ে উঠলেন

  • আকবর হোসেন
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
রফিকুল ইসলাম

ছবির উৎস, Rafiqul Islam

ছবির ক্যাপশান,

রফিকুল ইসলাম মাদানী

বাংলাদেশে ইন্টারনেট জগতে 'শিশু বক্তা' হিসেবে পরিচিত রফিকুল ইসলাম অনেকের নজর কেড়েছেন সম্প্রতি।

অনেকের কাছে তিনি রফিকুল ইসলাম মাদানী নামে পরিচিত।

গত ২৫শে মার্চ ঢাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফর বিরোধী মিছিলের সময় মতিঝিল এলাকা থেকে প্রথম আটক হন রফিকুল ইসলাম। তখন তাকে কয়েক ঘন্টা আটক রেখে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

সর্বশেষ গত বুধবার তাকে আবারো আটক করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাব।

আটকের পরে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

র‍্যাবের ভাষায়, তাকে 'রাষ্ট্র বিরোধী ও উস্কানিমূলক' বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে নেত্রকোনা থেকে আটক করা হয়।

রফিকুল ইসলামের পরিচয়

ফেসবুক ও ইউটিউবে রফিকুল ইসলামের যেসব ছবি ও ভিডিও আছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, কণ্ঠ, শারীরিক গঠন ও মুখাবয়বের কারণে তাকে কম বয়েসী ছেলেদের মত মনে হয়।

তার ঘনিষ্ঠরা জানাচ্ছেন, ১৯৯৪ সালে নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলায় তার জন্ম। সে হিসেবে তার বর্তমান বয়স ২৭ বছর।

ছোট বেলা থেকেই রফিকুল ইসলামকে বেশ ভালোভাবে চিনেন এবং জানেন মোহাম্মদ মাসুম।

ছবির উৎস, Rafiqul Islam Netrakona facebook page

ছবির ক্যাপশান,

ওয়াজ-মাহফিলের বক্তা হিসেবে বেশ পরিচিত রফিকুল ইসলাম।

রফিকুল ইসলাম ঘনিষ্ঠ সহচর মি. মাসুম বলেন রফিকুল ইসলামের চার ভাই ও তিন বোন।

রফিকুল ইসলাম নেত্রকোনার একটি মাদ্রাসায় হিফজুল কোরআন পড়াশুনা করেন। এরপর তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ি এলাকায় একটি মাদ্রাসায় আসেন।

সেখানে কয়েক বছর পড়াশোনা শেষে তিনি চলে চলে যান গাজীপুরের কোনাবাড়িতে একটি মাদ্রাসায়। সেখানে কিছুদিন পড়াশোনা করার পর ঢাকার বারিধারা এলাকায় অবস্থিত একটি মাদ্রাসা থেকে তিনি দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমানের) পাশ করেন।

কেন তিনি আলোচিত?

বারিধারা মাদ্রাসায় রফিকুল ইসলামের সাথে প্রায় পাঁচ বছর পড়াশুনা করেছেন রফিকুল ইসলাম নামের আরেক ব্যক্তি। তার বাড়িও নেত্রকোনায়।

তিনি বলেন, ১৪-১৫ বছর বয়স থেকেই রফিকুল ইসলাম নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকায় ওয়াজ করতেন। তখন থেকেই তিনি আঞ্চলিকভাবে পরিচিত হয়ে উঠেন। কয়েক বছরের মধ্যেই নেত্রকোনার আশপাশের জেলাগুলোতে রফিকুল ইসলামের পরিচিতি গড়ে উঠে।

"গত কয়েক বছরের মধ্যে রফিকুল ইসলাম মাদানী জাতীয়ভাবে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছেন," বলেন রফিকুল ইসলাম।

ইউটিউবে আপলোড করা রফিকুল ইসলামের সাম্প্রতিক কিছু ভিডিওতে ক্ষমতাসীন দল এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিবর্গ, সেনাবাহিনী, নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কড়া সমালোচনা এবং ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য লক্ষ্য করা যায়।

এছাড়া নারীর ক্ষমতায়ন বিরোধী এবং নারী বিদ্বেষী বক্তব্যও লক্ষ্য করা যায় রফিকুল ইসলামের বক্তব্যে।

সর্বশেষ গত ৫ই এপ্রিল 'নুরিয়া ইসলামিক মিডিয়া' নামের একটি ইউটিউব চ্যানেল থেকে রফিকুল ইসলামের বক্তব্যের একটি ভিডিও আপলোড করা হয়।

সেখানে দেখা যাচ্ছে, সোনারগাঁও এলাকার একটি রিসোর্টে হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হককে অবরুদ্ধ করার ঘটনা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি।

তবে তার ঘনিষ্ঠজন এবং সমর্থকরা বলছেন, রফিকুল ইসলাম ওয়াজ-মাহফিলে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে 'সুন্দর ও তাত্ত্বিক' আলোচনা করেন।

রফিকুল ইসলামের সাথে একই মাদ্রাসায় অধ্যয়নকারী রফিকুল ইসলাম বলেন, " অনেক সময় কথার টানে হয়তো বেশি বলে ফেলে। সবার তো সব কথা ভালো লাগে না। উনি সৎ সাহস নিয়ে কথা বলেন। সৎ সাহস অনেকের মধ্যে নাই, অনেকে বাস্তবতা এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু উনি বাস্তবতা তুলে ধরেন।"

মাদানী টাইটেল কেন?

তার প্রকৃত নাম রফিকুল ইসলাম হলেও নামের শেষে টাইটেল বা পদবী হিসেবে 'মাদানী' ব্যবহার করা হয়।

ঢাকার বারিধারা এলাকায় অবস্থিত জামিয়া মাদানিয়া মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমানের) ডিগ্রি লাভের পর তিনি নামের শেষে 'মাদানী' টাইটেল যুক্ত করেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে 'মাদানী' উপাধি ব্যবহার না করার রফিকুল ইসলামকে একটি লিগ্যাল নোটিশ দেয়া হয়েছে।

এ নোটিশটি পাঠিয়েছিলেন হেফাজতে ইসলামের মদিনা শাখার আমির ও সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্য। তার নামও রফিকুল ইসলাম।

লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়, সৌদি আরবে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা না করেও 'মাদানী' উপাধি ব্যবহার করছেন রফিকুল ইসলাম।

বারিধারা মাদ্রাসায় রফিকুল ইসলাম মাদানীর সহপাঠী রফিকুল ইসলাম বলেন, "তিনি মাদানী হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়ে গেছেন।"

লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর পরে একটি অনুষ্ঠানে রফিকুল ইসলাম বলেন, মদিনা থেকে পড়াশুনা করলেই যে শুধু 'মাদানী' উপাধি ব্যবহার করা যাবে বিষয়টি সে রকম নয়।