রোজিনার পর মেহেরপুরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিক আটক

  • রাকিব হাসনাত
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ঢাকার বাইরে সাংবাদিকতা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে বলছেন সাংবাদিকরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

ঢাকার বাইরে সাংবাদিকতা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে বলছেন সাংবাদিকরা

বাংলাদেশে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের মুক্তির দাবিতে সাংবাদিকদের দেশজুড়ে নানা কর্মসূচির মধ্যেই শনিবার মেহেরপুরে একজন সাংবাদিককে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা মামলায় আটকের পর জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা মেহেরপুরের পুলিশ বলছে প্রভাবশালী একজন রাজনৈতিক নেতার এক নিকটাত্মীয় এক বছর আগে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা করেছিলেন সেখানকার সাংবাদিক আল আমিনের বিরুদ্ধে।

মি. আমিনের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করায় আজ গাংনী থানা পুলিশ তাকে আটক করে বলে জানিয়েছেন সেখানকার পুলিশ সুপার এস এম মুরাদ আলী।

তবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাংবাদিকরা এবং বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠন বলছে, এ ধরণের মামলা-হামলাসহ নানা কারণে মাঠ পর্যায়ে সাংবাদিকতা করাই এখন দুরূহ হয়ে উঠেছে।

সংগঠনটির হিসেবে চলতি বছরেই অন্তত পাঁচজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা হয়েছে দেশের নানা জায়গায়।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

সাংবাদিকদের ওপর হামলা মামলা প্রায়ই হয়ে থাকে বাংলাদেশে

কুড়িগ্রামের সাংবাদিক লাইলি ইয়াসমিন বলছেন, আপোষ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে সাংবাদিকতা করা এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

"পুলিশ, আমলা, এলাকার মাস্তানসহ নানা দিক থেকে বাধা আসে। এমন করে হয়রানির পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যে সাংবাদিকরা তটস্থ থাকে ও আপোষ করে সাংবাদিকতা করতে বাধ্য হয়। আমি নিজে মামলার শিকার হয়েছি। আমার বাড়ীতে হামলা হয়েছে। হুমকি দেয়া হয়েছে। বাড়ী ছেড়ে অন্য জেলায়, ঢাকায় ছিলাম। একটা রিপোর্টের জন্য এ অবস্থায় পড়তে হয়েছে আমাকে"।

লাইলি ইয়াসমিনের মতো মাঠ পর্যায়ে অনেক সাংবাদিককেই এ ধরনের হামলা, মামলা কিংবা প্রশাসনের রোষের শিকার হয়ে গণমাধ্যমের শিরোনাম হতে হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে।

কুড়িগ্রামেই আরিফুল ইসলাম নামে এক সাংবাদিককে গভীর রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালিয়ে নির্যাতন ও কারাদণ্ডের অভিযোগে গত বছর আলোচনার এসেছিলেন ওই জেলার দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসক সহ চারজন কর্মকর্তা।

তোলপাড় করা ওই ঘটনায় পরে কিছু ব্যবস্থাও নিয়েছিলো কর্তৃপক্ষ।

মানবাধিকার সংস্থা ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে গত বছর সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা, সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৪৭ জন সাংবাদিক এবং এতে প্রাণ হারিয়েছেন দুজন।

এ সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১২৯টি মামলায় ২৬৮ জনকে আসামি করা হয়। এসব মামলায় সিংহভাগ ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের আসামি করা হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

ঢাকার বাইরের সাংবাদিকরা সুবিধাও পান কম

দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বরগুনার সাংবাদিক আরিফুর রহমান বলছেন শুধু মামলা- হামলা নয়, এখন নতুন প্রবণতা হলো সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো দখল করা এবং প্রভাবশালীরা নিজেরা অনলাইন পোর্টাল বানিয়ে অনুগত সাংবাদিক তৈরি করে প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য প্রচণ্ড প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করা।

বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান আর্টিকেল নাইনটিনের হিসেবে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে ৩৮টি মামলার শিকার হয়েছেন বিভিন্ন ব্যক্তি।

সংস্থাটির দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক পরিচালক ফারুক ফয়সাল বলছেন ঢাকার বাইরে কাজ করেন এমন সাংবাদিকরা চরম নিরাপত্তাহীন ভুগছেন।

"জেলা উপজেলায় সাংবাদিকরা কম বেতনে বা নামমাত্র বেতনে কাজ করেন। কিন্তু তারাও কম হয়রানির শিকার হচ্ছেন না নানা রাজনৈতিক কারণে। অনেক প্রেসক্লাবে নেতৃত্ব এখন রাজনীতির লোকদের হাতে। তারা কোন কোন প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদক। তারাও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ফলে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকরা একদমই নিরাপদ না। তাদের ব্যাপারে খুব একটা হইচই হয় না"।

বাংলাদেশে আগেও জেলা পর্যায়ে সাংবাদিক নির্যাতনের নানা ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলো। কিন্তু এখন হামলা হুমকির পাশাপাশি সাংবাদিক সংগঠনগুলো দখলসহ নানা কালাকানুন মাঠ পর্যায়ে সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন: