জাতীয় পরিচয়পত্র : দায়িত্বে হাতবদলের জন্য সরকারের প্রস্তাবে বাধাগুলো কোথায়?

  • কাদির কল্লোল
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
জাতীয় পরিচয়পত্র, বাংলাদেশ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

সরকার এখন আইন সংশোধন করে জাতীয় পরিচয়পত্রের দায়িত্ব নিতে চাইছে। (ফাইল ফটো)

বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন সম্পর্কিত যে আইন রয়েছে, সেই আইন পরিবর্তন না করে এর কার্যক্রমের দায়িত্ব নির্বাচনের কমিশনের কাছ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নেয়া যাবে না বলে মত দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়।

বর্তমান আইনে এই দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের কাছেই দেয়া রয়েছে।

এমন আইন থাকলেও সরকারের রুলস অব বিজনেস বা কার্য বিধি সংশোধন করে দায়িত্বের হাতবদলের ব্যাপারে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

আইন মন্ত্রণালয় এই প্রস্তাবে ''না'' বলেছে।

তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের দায়িত্ব বদলের অবস্থান থেকে সরে আসেনি সরকার।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিবিসিকে বলেছেন, এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নতুন সংস্থা বা বিভাগ গঠন করে এই দাায়িত্ব নিতে আইনে পরিবর্তন করার ব্যাপারে তারা আলোচনা করছেন।

তবে আইন পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের হাতেই দায়িত্বটি থাকছে।

জাতীয় পরিচয়পত্রের দায়িত্ব হাতবদলের সরকারের এই পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক এখনও চলছে।

আরও পড়ুন:

ছবির ক্যাপশান,

আনিসুল হক, আইনমন্ত্রী

আইন মন্ত্রণালয়ের 'না' বলার কারণ কী?

জাতীয় পরিচয়পত্রের কার্যক্রমের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সম্প্রতি সরকারে তোড়জোড় দেখা গেছে।

এই দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং সরকারের সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনকে কয়েকদফা চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

কার্য বিধি সংশোধন করে দায়িত্ব বদল করার প্রস্তাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে আইন মন্ত্রণালয় তাদের মতামতে জানিয়েছে আইন থাকাবস্থায় কার্যবিধি সংশোধন করে দায়িত্বের হাতবদল করা যাবে না।

আইন মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, "যেহেতু আইন আছে, সেখানে রুলস অব বিজনেস পরিবর্তন করলে সেটা আইনসিদ্ধ হবে না। সেটাই আমরা মতামত দিয়েছি।"

আইন পরিবর্তন: আলাদা সংস্থা গঠন

সরকার এখন আইন পরিবর্তন করেই জাতীয় পরিচয়পত্রের কার্যক্রমের দায়িত্ব বদলের পরিকল্পনা নিয়েছে।

আইনমন্ত্রী মি: হক বলেছেন, সরকারের নীতি নির্ধারণ পর্যায়ের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী একটি আলাদা সংস্থা গঠন করে জাতীয় পরিচয়পত্রের দায়িত্ব সরকারকে দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি বলছেন, আলাদা সংস্থা গঠন করা হলে সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে।

"যে সব মন্ত্রণালয় বা সংস্থা জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার কাজে যুক্ত থাকবে, সেই মন্ত্রণালয় বা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে সংস্থাটি গঠন করা হবে। এরকম আলোচনাই হচ্ছে," জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

তিনি বলেছেন, এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আইনে পরিবর্তন আনতে হবে বা অন্য একটি আইন করতে হবে।

মি: হক উল্লেখ করেছেন, এখন যে আইন আছে, তাতে নির্বাচন কমিশনের কাছে শুধু ভোটার তালিকা তৈরির দাায়িত্ব বহাল রাখার কথা বলা হবে।

সরকারের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক কোথায়?

জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুল বা অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়। এই বিষয়গুলোকে সরকার তাদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরছে।

তবে সরকারের মুল যুক্তি হচ্ছে, ভোটার তালিকা তৈরি করা ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো অন্য কোন কার্যক্রমের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকতে পারে না।

ছবির ক্যাপশান,

নির্বাচন কমিশন এবং সরকার চিঠি চালাচালি করেছে জাতীয় পরিচয়পত্রের দায়িত্বের ব্যাপারে।

নির্বাচন কমিশন তাতে আপত্তি করে আসছে।

কমিশন জাতীয় পরিচয়পত্রের কাজের জন্য সারাদেশে তাদের লোকবল, দক্ষতা এবং অবকাঠামোর থাকার বিষয়কে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরে তাদের হাতে দায়িত্বটি রাখতে চাইছে।

নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের মধ্যে এনিয়ে চিঠি চালাচালিও হয়েছে।

'মানুষের হয়রানি হবে'

নির্বাচন কমিশনের সাবেক একজন কর্মকর্তা জেসমিন টুলি বলেছেন, "ভোটার তালিকার ডাটাবেজ থেকেই বাইপ্রোডাক্ট হিসাবে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়। এখানে মূল ডাটাবেজটা নির্বাচন কমিশনের হাতে।"

এখানে দু'টি সংস্থা কাজ করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেছেন, কোন ব্যক্তি যদি ভোটার তালিকা বা জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম বা কোন বিষয়ে সংশোধন করতে চায়, সেটা মূল ডাটাবেজ থেকেই করতে হবে।

এই কাজ দুই জায়গা থেকে হলে সমন্বয়হীনতা দেখা দেবে এবং মানুষের হয়রানি হবে বলে তিনি মনে করেন।

২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির মুখে ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরির অংশ হিসাবে প্রথমে ভোটার পরিচয়পত্র তৈরির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল।

সেই প্রক্রিয়াতেই ভোটার পরিচয়পত্রের বদলে জাতীয় পরিচয়পত্র করা হয়।

তখন সেনাবাহিনীর সহায়তায় নির্বাচন কমিশন ডাটাবেজ তৈরি করে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েছিল।

আর সে সময় থেকেই কমিশন সারাদেশে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দিয়ে এই কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

বর্তমানে ১১ কোটি ১৭ লাখের বেশি নাগরিক ভোটার তালিকাভুক্ত রয়েছে।

২০১০ সালে আইন প্রণয়ন করে কমিশনকে আইনগতভাবেও এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

এখন সরকার নিজের হাতে এই দায়িত্ব নিতে চাইছে।