কক্সবাজার বিমানবন্দর: বঙ্গোপসাগরের অংশ ভরাট করে যেভাবে বাড়ানো হচ্ছে রানওয়ে

  • সানজানা চৌধুরী
  • বিবিসি বাংলা
সম্প্রসারিত রানওয়ের নকশা

ছবির উৎস, Courtesy: Cox's Bazar Airport Extension Project

ছবির ক্যাপশান,

কক্সবাজার বিমানবন্দরের সম্প্রসারিত রানওয়ের নকশা

বাংলাদেশে সবচেয়ে দীর্ঘ রানওয়েটি হতে যাচ্ছে কক্সবাজার বিমানবন্দরের, আর এই রানওয়ের একটি অংশ থাকবে বঙ্গোপসাগরের ভেতরে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিবার এই সম্প্রসারণ কর্মসূচীর উদ্বোধন করেন।

প্রকল্প পরিচালক ইউসুফ ভূঁইয়া বিবিসিকে বলছেন, ১০ হাজার ৭শ ফুট দীর্ঘ এই রানওয়ের তেরশো ফুট থাকবে সমুদ্রের মধ্যে।

এটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের দীর্ঘতম রানওয়ে। বর্তমানে সবচেয়ে দীর্ঘ রানওয়েটি ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের। এটির দৈর্ঘ্য ১০ হাজার ৫শ ফুট।

রানওয়ের নির্মানকাজ শেষ হলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়েতে যখন উড়োজাহাজ অবতরণ করবে বা উড্ডনয়ন করবে তখন উড়োজাহাজের দুপাশে থাকবে বঙ্গোপসাগরের জলরাশি।

চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর:

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর কক্সবাজারকে বাংলাদেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

এজন্য এই বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের পাশাপাশি আরও কয়েকটি উন্নয়নমূলক প্রকল্প কাজ হাতে নেয়া হয়েছে।

তৈরি করা হচ্ছে নতুন টার্মিনাল ভবন। এছাড়া বসানো হচ্ছে গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম, সেন্ট্রাল লাইন লাইট, সমুদ্র বুকের ৯০০ মিটার পর্যন্ত প্রিসিশন এপ্রোচ লাইটিং, ইন্সট্রুমেন্টাল ল্যান্ডিং সিস্টেম, নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণ ও বাঁকখালী নদীর উপর সংযোগ সেতু।

সব মিলিয়ে প্রায় পৌনে চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প।

তবে শুধু রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য খরচ করা হচ্ছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি।

ছবির উৎস, Courtesy: Cox's Bazar Airport Extension Project

ছবির ক্যাপশান,

সম্প্রসারিত রানওয়ের নকশা

যেভাবে সমুদ্রের ভেতরে তৈরি করা হচ্ছে রানওয়ে:

এরইমধ্যে মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ইউসুফ ভূঁইয়া।

বিবিসিকে তিনি বলেন, "করোনাভাইরাস মহামারি ও চলতি বর্ষার অধিকাংশ সময়ই বৈরী আবহাওয়া সত্বেও রানওয়ের কাজ থেমে নেই। পুরো বিমানবন্দর এলাকার ময়লা আবর্জনা সরানো থেকে মাটি কাটা ও ঢালাইয়ের কাজ সমানে চলছে।'

মহেশখালী চ্যানেলে দিকে ভূমি অধিগ্রহণ করে মাধ্যমে রানওয়ে সম্প্রসারিত করা হবে।

সম্প্রসারিত অংশ সমুদ্রের যেটুকু জুড়ে হবে সেখানে পানিতে ব্লক, জিওটিউব ইত্যাদি ব্যবহার করে শুরুতেই একটি বাঁধের মত তৈরি করা হবে।

পরে বাঁধের ভেতরকার পানি সেচ করে ফেলা হবে এবং গভীর সমুদ্র থেকে ড্রেজিং করে ভেতরে এনে ফেলা হবে বালি।

বালি দিয়ে ভরাটের মাধ্যমে সমুদ্রের ওই অংশটি ভরাট হলে সেখানে 'স্যান্ড পাইলিং'-এর মাধ্যমে রানওয়ের ভিত তৈরি করা হবে।

সবশেষে পাথরের স্তর বসিয়ে পুরো রানওয়ে সিল করে দেয়া হবে। তার ওপর হবে পিচ ঢালাইয়ের কাজ। এরপর হবে রানওয়ের শোভাবর্ধন ও নির্দেশক বাতি স্থাপনের বাকি কাজ, বলছেন প্রকৌশলীরা।

কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো এই প্রক্রিয়ায় কোন বিমানবন্দরের রানওয়ে তৈরি হচ্ছে।

শুরুতে পরিকল্পনা করা হয়েছিল শহরের দিকে বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করা যায় কিনা। কিন্তু দেখা যায় এতে শহরের একটি বড় অংশ বিমানবন্দরের দখলে চলে যাবে। যার মধ্যে বিলাসবহুল কয়েকটি হোটেল, আবাসিক ভবন, লাবনি বিচ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনা রয়েছে।

এ কারণে বিমানবন্দরের উল্টো পাশে মহেশখালী চ্যানেলের দিকে সমুদ্রের ওপরেই এই রানওয়ে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান মি. ভুঁইয়া।

বিমানবন্দর প্রকল্পের প্রকৌশলী এনামুল হক বলেন, "সোনাদিয়া দ্বীপের বুক চিরে মহেশখালী চ্যানেলের কিয়দংশ ভরাটের মাধ্যমে যখন কক্সবাজার বিমানবন্দরটির রানওয়ের পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে তখন দেখা যাবে সৌন্দর্য্যের আরেক ভিন্ন জগৎ।"

সব মিলে রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ শেষ হতে তিন বছরের কিছু কম সময় লাগবে বলে জানাচ্ছেন কর্মকর্তারা।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ দুটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ৯ই ফেব্রুয়ারি ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

যে কারণে বাড়ানো হচ্ছে রানওয়ে:

বর্তমানে কক্সবাজারের রানওয়ে ও অবকাঠামো সব ধরনের বিমান চলাচলের জন্য উপযোগী না।

কর্মকর্তারা বলছেন, রানওয়ে সম্প্রসারণ হলে এই বিমানবন্দরে বিশ্বের সবচেয়ে সুপরিসর উড়োজাহাজ বোয়িং ৭৭৭ ও বোয়িং ৭৪৭ এর মডেলের যাত্রী বোঝাই বিমানও এখান থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারবে।

এছাড়া এখানে রিফুয়েলিংয়েরও ব্যবস্থা থাকবে।

সব মিলিয়ে বিমানবন্দরটিতে দেশি-বিদেশি সরাসরি ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা আরো বাড়বে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।