হাইব্রিড গাড়ি: জনপ্রিয়তা বাড়লেও পূর্ণ সুবিধা নেয়া যাচ্ছে না যে কারণে

বাংলাদেশে হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশে হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে

বিশ্বের অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি ব্যবহার ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে। বাংলাদেশে ইলেকট্রিক গাড়ি সেভাবে ব্যবহার করতে না দেখা গেলেও সম্প্রতি হাইব্রিড গাড়ির জনপ্রিয়তা বেশ বেড়েছে। ঢাকার রাস্তায় আজকাল বহু হাইব্রিড গাড়ি চলতে দেখা যায়।

যেসব গাড়ি জীবাশ্ম জ্বালানির পাশাপাশি বৈদ্যুতিক শক্তির সাহায্যে চলতে পারে, সেগুলোকে হাইব্রিড গাড়ি বলা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে হাইব্রিড গাড়ি আমাদানিতে শুল্কহার কমানোর পর এই ধরনের গাড়ির দাম কমার পাশাপাশি এর চাহিদাও বেড়েছে বলছেন গাড়ি ব্যবসায়ীরা।

তুলনামূলক কম পরিমাণ জ্বালানির ব্যবহার এবং পুনর্নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা হয় বলে বিশ্বব্যাপী হাইব্রিড গাড়ির জনপ্রিয়তা রয়েছে।

বাংলাদেশে এই ধরণের গাড়ি বেশ কয়েকবছর ধরে বিক্রি হলেও খুব বেশি মানুষ হাইব্রিড গাড়ি ব্যবহার করতেন না, মূলত গাড়ির যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতার অভাব, দেশের মেরামত শ্রমিকদের দক্ষতার ঘাটতি, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে আতঙ্ক - এমন নানা কারণে।

তবে বাংলাদেশে ২০২০ সালের অটোমোবাইল উন্নয়ন নীতিমালার খসড়ায় পরিবেশবান্ধব গাড়ি, যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্কহার হ্রাস ও এই ধরণের গাড়ি উৎপাদনে বেশ কিছু সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব দেয়ায় ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে হাইব্রিড গাড়ি সম্পর্কে আগ্রহ বেড়েছে।

ঐ খসড়া নীতিমালায় অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে জ্বালানি সাশ্রয়ী যানবাহনের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে পরিণত করতে চায়।

এখন গাড়ির দাম কমার পাশাপাশি অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার কারণেই মানুষের মধ্যে এই ধরণের গাড়ি সম্পর্কে আস্থা বাড়ছে বলে ধারণা করছেন গাড়ি আমদানি ও ব্যবসার সাথে জড়িতরা।

ভিডিওর ক্যাপশান,

আকাশে যখন উড়াল দিল গাড়ি

যেসব কারণে বাড়ছে হাইব্রিডের জনপ্রিয়তা

বাংলাদেশে গত কয়েক বছর যাবৎ প্রতি বছরে ১২-১৩ হাজার গাড়ি আমদানি করা হয় বলে জানান গাড়ি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিকন্ডিশন ভেহিকেলস ইমপোর্টারস অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বারভিডা'র সভাপতি আবদুল হক।

আবদুল হক জানান, এ বছর হাইব্রিড গাড়ির শুল্কহার কমানোর পর থেকে মানুষের মধ্যে হাইব্রিড গাড়ি কেনার প্রবণতা বেড়েছে। তিনি ধারণা প্রকাশ করেন যে বর্তমানে যে পরিমাণ গাড়ি বিক্রি হয় তার ৬০ ভাগই হাইব্রিড।

"শুল্কহার কমানোতে হাইব্রিড মাইক্রোবাসের দাম কমেছে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। এছাড়া এসইউভি এবং সাধারণ ব্যবহারের সেডান জাতীয় গাড়িরও দাম কমেছে", বলেন মি. হক।

দাম কমার ফলে এই ধরণের গাড়ির আমদানি, অর্থাৎ জোগানের পাশাপাশি চাহিদাও বেড়েছে বলে আশা প্রকাশ করেন মি. হক।

এছাড়া গাড়ির আমদানি, অর্থাৎ জোগান বাড়ার পর এ ধরণের গাড়ির যন্ত্রাংশও সহজলভ্য হয়েছে, যার কারণে মানুষের মধ্যে হাইব্রিড গাড়ির চাহিদা বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন মি. হক।

"একসময় মানুষের মধ্যে একটা ভীতি ছিল যে, হাইব্রিড কিনলে এর পার্টস পাব কিনা, ব্যাটারির কী হবে ইত্যাদি। কিন্তু এখন যেহেতু জোগানকেন্দ্রিক একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাই যন্ত্রাংশ বেশ সহজলভ্য হয়েছে।"

"পাশাপাশি বাংলাদেশে গাড়ি মেরামতের কাজ যারা করে, তাদের অধিকাংশই এখন হাইব্রিড গাড়ি মেরামত এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে শিখেছেন। ফলে আমরা সেবাটাও দিতে পারছি, আর মানুষের মধ্যেও আস্থা তৈরি হচ্ছে এই ধরণের গাড়ির বিষয়ে", বলেন মি. হক।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

সব হাইব্রিড গাড়ির সাথেই একটি আলাদা করে চার্জার দেয়া থাকে, যার মাধ্যমে গাড়িতে চার্জ দেয়া হয়।

ব্যবহারকারীরা যেসব অসুবিধায় পড়ছেন

হাইব্রিড গাড়ি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা এই ধরণের গাড়ির ব্যবহার উৎসাহিত করলেও অনেক ব্যবহারকারীই এই ধরণের গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানা ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন বলে জানা যায়।

ঢাকার বাসিন্দা আরিফ শাহাদাত ২০১৬ সাল থেকে ব্যক্তিগত ও পরিবারের ব্যবহারের কাজে একটি হাইব্রিড গাড়ি ব্যবহার করেন।

শুরুর দিকে, অর্থাৎ প্রথম কয়েক বছর গাড়ির সামান্য কাজ করতেও নির্দিষ্ট কয়েকজন মিস্ত্রী ছাড়া তার উপায় ছিল না, বলছেন মি. শাহাদাত।

"প্রথম দিকে মেকানিকরা গাড়ি ধরতেই চাইতো না, কারণ হাইব্রিড গাড়ি সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। আবার এমনও হয়েছে যে কোনো একজন মেকানিক দিয়ে ছোটখাটো কোনো কাজ করিয়েছি, তার কিছুদিন পর দেখি আসলে সমস্যার সমাধান হয়নি।"

নতুন ধরণের গাড়ি হওয়ায় এ নিয়ে নিজের এবং গাড়ির মেকানিকের দক্ষতা ও জ্ঞানের অভাবের কারণেই এমন হয়েছে বলে মনে করেন মি. শাহাদাত।

তবে তিনি মনে করেন, এখন হাইব্রিড গাড়ির জন্য উপযুক্ত মেকানিক এবং গ্যারেজের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বাড়লেও চাহিদার তুলনায় তা এখনও অনেক কম।

গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেও মাঝে মধ্যে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে বলে ধারণা প্রকাশ করেন তিনি।

"গাড়ি কোন মোডে ড্রাইভ করতে হয়, চালানোর সময় কী কী বিষয় মাথায় রাখা উচিৎ, ব্যাটারির রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে কী বিবেচনা করা প্রয়োজন - এই ধরণের বিষয়গুলো সম্পর্কে ধীরে ধীরে কয়েক বছরে জানতে পেরেছি। আর আমার মনে হয় ততদিনে গাড়ির বেশ কিছুটা ক্ষতি হয়ে গেছে।"

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

যথাযথ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ করা হলে বাংলাদেশে হাইব্রিড গণপরিবহনও পরিচালনা করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা

এই ধরণের অজ্ঞতার ফলে গাড়ির ব্যাটারির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন মি. শাহাদাত। ব্যাটারিটিই হল হাইব্রিড গাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ।

"ব্যাটারি প্রথম দেড় বছর ভালো সার্ভিস দিয়েছে, নির্দিষ্ট সময় চার্জ দিলে যতটুকু চলার কথা, ততটুকু চলতো। কিন্তু এরপর থেকে আস্তে আস্তে ব্যাটারির কার্যকারিতা কমতে থাকে। আর ব্যাটারি দুর্বল হওয়ার সাথে সাথে গাড়ির অভ্যন্তরীন অন্যান্য ইলেকট্রিক উপাদানগুলোও কিছুটা সমস্যা তৈরি করতে শুরু করে।"

ঐ সময়ের পর থেকে তার গাড়িতে জ্বালানির ব্যবহারও বেড়ে যায় বলেও জানান তিনি।

এরপর গাড়ির ব্যাটারি প্রতিস্থাপন করতে চাইলেও ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ব্যাটারি প্রতিস্থাপন করেননি।

যে কারণে হাইব্রিড গাড়ির শতভাগ সুবিধা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না

হাইব্রিড গাড়ির সবচেয়ে বড় সুবিধা এতে তেল বা গ্যাসের মত জীবাশ্ম জ্বালানি কম প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই ধরণের গাড়ির ব্যাটারি আলাদাভাবে চার্জ দেয়ার মত অবকাঠামোর অভাব থাকায় এই ধরণের গাড়ির সুবিধা পুরোপুরিভাবে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করেন আবদুল হক।

"সাধারণত হাইব্রিড গাড়ির ব্যাটারি দুইভাবে চার্জ হয়ে থাকে। গ্যাস বা তেলে যখন গাড়ি চলে তখন চলার সময় ব্যাটারি চার্জ হয়, পরে ঐ চার্জ দিয়ে গাড়ি চালানো যায়। আরেকটি পদ্ধতি হলো কোনো একটি চার্জিং স্টেশন বা চার্জিং পয়েন্টে গাড়ি চার্জ দেয়া যেতে পারে।"

বাংলাদেশে এই ধরণের গাড়ি আলাদাভাবে চার্জ দেয়ার মত যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নেই বলে জানান মি. হক।

কিছু হাইব্রিড গাড়ির সাথেই একটি আলাদা করে চার্জার দেয়া থাকে, যার মাধ্যমে গাড়িতে চার্জ দেয়া হয়।

সম্পূর্ণ চার্জ দেয়ার পর একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত গাড়ি কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়াই চলতে পারে। কিন্তু এরপর গাড়ি বিদ্যুতে চালাতে হলে সেটিতে আবার চার্জ দেয়ার জন্য পেট্রল পাম্পের মত চার্জিং পয়েন্ট প্রয়োজন হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে এই ধরণের চার্জিং পয়েন্ট এখনও তৈরি হয়নি, যার ফলে এসব গাড়ির পুরো সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন গাড়ি আমদানি ও ব্যবসার সাথে জড়িতরা।

"চীনে ব্যাটারিচালিত ও হাইব্রিড গাড়ির জন্য অনেক চার্জিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। ভারতেও বিভিন্ন জায়গায় এই ধরণের স্টেশন রয়েছে। বাংলাদেশেও সরকার যদি পরিবেশবান্ধব গাড়ির ব্যবহারের প্রসার চায় তাহলে পেট্রোল পাম্পের মত ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন তৈরিতে উদ্যোগ নিতে হবে", বলেন আবদুল হক।

দেশে যথেষ্ট পরিমাণে চার্জিং স্টেশন থাকলে হাইব্রিড গাড়ির পাশাপাশি সম্পূর্ণ ব্যাটারিচালিত গাড়ির ব্যবহারও বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেন মি. হক।

"গাড়ি চার্জ দেয়া বা মেরামতের যথেষ্ট সুযোগ থাকলে এবং সেই অবকাঠামো তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হবে যে তখন ব্যাটারি চালিত বা হাইব্রিড বাস, ট্রাকও দেশে চলতে পারবে। সেক্ষেত্রে যেমন বিপুল পরিমাণ খরচ কমবে, পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতিও কমানো সম্ভব হবে অনেক।"

বাংলাদেশের চট্টগ্রামে চীনা একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ উদ্যোগে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এই গাড়ি তৈরি হলে দেশে ইলেকট্রিক গাড়ির দাম কমবে এবং ব্যবহার বাড়বে বলে আশা করছেন এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি হাইব্রিড এবং ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি চার্জ করার অবকাঠামোও উন্নয়ন হবে।