ফৌজি বাণিজ্য:উত্তরাধিকার

কমর্শিয়াল কমপ্লেক্স
Image caption সেনা কল্যাণ কমর্শিয়াল কমপ্লেক্স

ঢাকার বাইরে মফস্বলের কোন শহরে আপনি যদি আইসক্রিম খেতে চান তাহলে হতে পারে যে আইসক্রিমটি আপনি খাচ্ছেন তা সেনাবাহিনীসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তৈরী ৻

একইভাবে ধরুন রাজধানী ঢাকা কিম্বা দেশের অন্যান্য জায়গায় যেসব দালানকোঠা তৈরী হচ্ছে সেগুলোতে যেসব সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে তার প্রতি একশোটি বস্তার মধ্যে অন্তত পাঁচটি হচ্ছে এমন প্রতিষ্ঠানের তৈরী যার সাথে সশ্স্ত্রবাহিনী জড়িত ৻

সামরিকবাহিনী ইতোমধ্যেই যেসব নানাধরণের বাণিজ্যিক উদ্যোগ এবং প্রকল্পে জড়িত হয়ে পড়েছে তার সম্পদমূল্য অত্যন্ত রক্ষণশীল হিসাবেও তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে৻ অনেকেই বলেছেন - মনে হচ্ছে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক গোষ্ঠী – ইংরেজীতে যাকে বলে Conglomerate - তা হচ্ছে সেনা শিল্প গোষ্ঠী৻

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

ফাস্টফুড থেকে সিমেন্ট তৈরী , সাধারণ হোটেল থেকে বিলাসবহুল পাঁচতারকা হোটেল , ব্যাংক , সিএনজি – পেট্রল , বৈদ্যূতিক বাতি , পাখা, জুতা এসবকিছুর ব্যবসাতেই এখন সেনাবাহিনীর নাম যুক্ত রয়েছে৻ আর, সেনাবাহিনীর প্রস্তাবিত প্রকল্পের তালিকা আরো অনেক দীর্ঘ৻ যেমন তাঁদের আকাঙ্খা রয়েছে নিজস্ব একটি বীমা কোম্পানীর৻ পরিকল্পনায় আছে ওষুধ তৈরীর কারখানা, বিদ্যূৎ উৎপাদন কেন্দ্র, প্যাকেজিং, চট্টগ্রামে আরেকটি পাঁচতারা হোটেল, ট্রাভেল এজেন্সি ইত্যাদি৻

সেনাবাহিনীর নাম সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যেক প্রকল্পগুলোর সাথে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা ঠিক কতোটা এবং তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সম্পর্কে জানার জন্য সেনাসদরের সাথে যোগাযোগের পর কয়েক মাস অপেক্ষা করেও সেনাবাহিনীর কোন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি৻

তবে, অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে যে সেনাবাহিনী সম্পর্কিত বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে সেনা কল্যাণ সংস্থা৻ সংস্থাটির নিজস্ব প্রকাশনায় বলা হচ্ছে :

‘‘অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে নানারকম সেবামূলক সহায়তা দেবার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ইউনিট বা প্রকল্পের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান৻ পাকিস্তান আমলে এধরণের একটি প্রতিষ্ঠান ছিলো যার নাম ছিলো ফৌজি ফাউন্ডেশন এবং স্বাধীনতার পর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সহায়-সম্পদ নিয়ে বাহাত্তর সালে যাত্রা শুরু করে সেনা কল্যাণ সংস্থা৻ ‘‘

Image caption ডঃ আয়েশা সিদ্দিকা

‘ মিলিটারি ইনকর্পোরেটেড : ইনসাইড পাকিস্তান‘স মিলিটারি ইকোনমি‘ গ্রন্থের জন্য সুখ্যাতি পেয়েছেন পাকিস্তানের গবেষক ডঃ আয়েশা সিদ্দিকা৻ তাঁর বর্নণায় উপমহাদেশে সেনাবাহিনীর বাণিজ্যে জড়িত হবার ইতিহাসের সূচনা পঞ্চাশের দশকে৻ যুদ্ধফেরৎ সৈনিকদের জন্য গঠিত যে তহবিল ব্রিটিশ সরকারের কাছে ছিলো তাতে পাকিস্তানের অংশটি পাকিস্তান সরকারের কাছে হস্তান্তর করার পর পাকিস্তান সরকার এবং সেনাবাহিনী ভারত সরকারের মতো যুদ্ধফেরৎ সৈনিকদের মধ্যে তা বিতরণ না করে তা দিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠা করে৻

ড: আয়েশা সিদ্দিকার মতে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তা হলো সেই পঞ্চাশের দশকেই প্রথমত, পাকিস্তানের সামরিকবাহিনীর একটা আলাদা এবং জোরালো রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিলো ; আর দ্বিতীয়ত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী একটা ভিন্নধরণের বাহিনী হতে চেয়েছিলো যারা শুধুমাত্র দেশের জন্য যুদ্ধ করার কাজেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে রাজী ছিলো না বরং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও একটা ভূমিকার কথা ভাবছিলো৻ পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে, ১৯৫৩-৫৪ তে এভাবেই ফৌজি ফাউন্ডেশন গঠিত হয়৻

ফৌজি ফাউন্ডেশন থেকে সেনাকল্যাণ সংস্থা :

তবে, পাকিম্তানের পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে যে বৈষম্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পৃথক দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ সেই বৈষম্য থেকে সেনাবাহিনীও বাদ যায় নি৻ ফলে, ফৌজি ফাউন্ডেশনের বেশীরভাগ সম্পদই ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানে৻ বাংলাদেশে উত্তরাধিকার হিসাবে যা পাওয়া যায় তার পরিমাণ ছিলো সামান্য৻

যতোদূর জানা যায় - ১৯৭২ এ যখন বাংলাদেশ সেনাকল্যাণ সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তার মূলধন ছিলো আড়াই কোটি টাকার মতো৻ তবে, মাত্র চারবছরের মধ্যেই ঐ সংস্থার নীট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় প্রায় একশো কোটি টাকা৻

সেনাকল্যাণ সংস্থার প্রকাশিত প্রচারপত্রে দেখা যায় যে গত আটত্রিশ বছরে ধারাবাহিকভাবে এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছে৻ সংস্থাটির অধীনে এখন রিয়েল এষ্টেট এবং শিল্পের সেবামুখী চারটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারও রয়েছে৻

এর বাইরে আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কার্য্যত লোকসানের বোঝা বইতে না পেরে ইতোমধ্যে বন্ধও হয়ে গেছে – যেমন ফৌজি চটকল এবং ফৌজি রাইস মিলস৻

তবে, সেনাকল্যাণ সংস্থার বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের আকার বা আয়তনের তুলনায় বহুগুণ বেশী বাণিজ্য করছে সেনাবাহিনীর আরেকটি কল্যাণমূলক সংস্থা – আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট৻

১৯৯৮ সালে এই ট্রাষ্ট কোম্পানী আইনে রেজিষ্ট্রি করা হয়৻ এই ট্রাষ্টের বিনিয়োগও যেমন বিপুল , তেমনি তার বাণিজ্যিক আকাঙ্খাও বলা চলে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী৻

সরাসরি বাণিজ্যে সশস্ত্রবাহিনী :

আর, তৃতীয়ত সশস্ত্রবাহিনী সরাসরি যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যে এমন দৃষ্টান্ত অন্তত দুটো বাহিনীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে৻ এই দুটি বাহিনী হলো সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনী৻

সরকারী নথিপত্রে দেখা যায় উভয়ক্ষেত্রেই এই দুই বাহিনীর আগ্রহের কারণে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাতের কয়েকটি লোকসানী প্রতিষ্ঠানকে তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে৻ এরমধ্যে সেনাবাহিনী বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী লিমিটেডের স্থাপনার মধ্যেই প্রতিষ্ঠা রেছে আরো তিনটি নতুন বাণিজ্যিক ইউনিট৻ এর একটি হলো বিএমটিএফ সিএনজি কনভার্সন লিমিটেড এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিএমটিএফ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র৻ আর তৃতীয়টি হলো হংকংয়ে রেজিষ্ট্রিকৃত প্রতিষ্ঠান ট্রেড মিউচূয়াল হংকংয়ের সাথে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ফুটওয়্যার এন্ড লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড৻

আর নৌবাহিনীর পরিচালনায় রয়েছে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড এবং ডকইয়ার্ড অফ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড৻

কল্যাণ ট্রাষ্টের বাইরে প্রতিষ্ঠান হিসাবে সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর এভাবে সরাসরি বাণিজ্যে যুক্ত হবার ইতিহাস হচ্ছে খুবই সাম্প্রতিক – মাত্র বছর দশেকের৻

আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু :

সেনা কল্যাণ সংস্থার বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের প্রসার অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও আটানব্বুই সালের জুন মাসে তৎকালীন সেনাপ্রধান মরহুম লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানের সময় প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট৻

অবশ্য বাংলাদেশ আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের সংঘ স্মারকে যেসব লক্ষ্য বর্ণিত আছে তার প্রথমটিতে বলা হয়েছে :

‘‘সাবেক সেনাসদস্য এবং তাদের সন্তান ও পোষ্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও তার বিকাশের ব্যবস্থা করা৻‘‘

আর দ্বিতীয় লক্ষ্যটিতে বলা হয়েছে সেনাবাহিনীর কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত ও শহীদ পরিবারের কল্যাণের কথা৻

আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের এই সংঘ স্মারক থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্খী বাণিজ্যিক বাসনা নিয়েই এই ট্রাষ্ট প্রতিণ্ঠিত হয়েছে৻

পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজির যে মৌলিক চরিত্র – সেনাবাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ট্রাষ্ট বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যাতিক্রম ঘটেনি৻ ছোট ব্যবসা যেমন মাঝারী ব্যাবসায় উন্নীত হতে চায় – মাঝারী ব্যবসা যেমন বড় ব্যবসায় রুপান্তরিত হতে চায় – তেমনই উচ্চাকাঙ্খী বাণিজ্যক বাসনা সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের মধ্যে দেখা গেছে৻

Image caption ৠাডিসন ওয়াটার গার্ডেন হোটেল : আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের প্রকল্প

আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের সংঘস্মারকে আনুষঙ্গিকভাবে যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো :

ঢাকায় আবাসিক হোটেল এবং বিপণী কেন্দ্র , বাণিজ্যিক ব্যাংক, বীমা কোম্পানী, জঙ্গল বুট ফ্যাক্টরী, চট্টগ্রামে একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরী, কাদিরাবাদে একটি চিনি কল, যশোরে ফ্লাওয়ার মিলস, ফাউন্ড্রি এবং পেট্রল পাম্প, গলফ ক্লাব, বিভিন্নজায়গায় বিপণী কেন্দ্র, কার সার্ভিসিং এবং ওয়াশিং সেন্টার, রেন্ট এ কার সার্ভিস, প্যাকিং এন্ড কুরিয়ার সার্ভিস, নারায়ণগঞ্জে ফ্যাব্রিক ডায়িং এন্ড স্ক্রিনপ্রিন্টিং ইউনিট, নারায়ণগঞ্জে হোশিয়ারী মিলস, সব সেনানিবাসে ব্রাস এন্ড মেটাল ইন্ডাষ্ট্রি, কুমিল্লায় বিদ্যূৎ প্রকল্প, রংপুরে ওষুধ শিল্প এবং ক্লিংকার প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প, বগুড়ায় সিমেন্ট প্রকল্প, সিলেটে রেস্তোরা এবং পর্যটন ও ট্রাভেল এজেন্সি, ঢাকায় হাসপাতাল , সব সেনানিবাসে মৎস্যচাষপ্রকল্প এবং পোল্ট্রি খামার৻

অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে - সশস্ত্রবাহিনীর নানাধরণের বাণিজ্যিক উদ্যোগ গ্রহণের পিছনে পাকিস্তান যে শুধু একটি মডেল হিসাবে বিবেচিত হয়েছে তাই নয় – বরং অন্তত একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে৻ ফৌজি বাণিজ্যের দ্বিতীয় পর্বে থাকবে সেপ্রসঙ্গ৻

[ধারাবাহিকটি প্রচারিত হচ্ছে বিবিসি বাংলায় প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যে ও রাতের অনুষ্ঠানে৻ ]