ব্রিটেনে ছলনার বিয়ের ফাঁদে বাংলাদেশীরা

লন্ডন প্রবাসী এক বাংলাদেশী ডাক্তারকে নিয়ে বছর দেড়েক আগে ব্রিটেনের গণমাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল তুমুল শোরগোল ৻

ডাঃ হোমাইরা আবেদীনকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ঢাকায় চার মাস আটকে রাখেন তাঁর বাবা মা৻

জোর করে বিয়ে দিতেই আটকে রাখা হয় তাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে ছাড়া পেয়ে ব্রিটেনে ফিরে আসতে সক্ষম হন তিনি৻

Image caption সামিরা: প্রতারণার শিকার

ব্রিটেনে বিভিন্ন এশীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এরকম জবরদস্তিমূলক বিয়ের সমস্য এতই ব্যাপক যে ব্রিটিশ সরকার কয়েক বছর আইন করে তা নিষিদ্ধ করে৻

বাংলাদেশ থেকে হোমাইরা আবেদিনকে মুক্ত করে আনতে সেই আইন প্রথমবারের মতো সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল৻

ফোর্সড ম্যারেজ বা জোর করে বিয়ে দেয়ার ঘটনা ব্রিটেনের বাংলাদেশীদের মধ্যে এক বড় সমস্যা৻ এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে প্রতারণামূলক বিয়ে৻ ব্রিটিশ সরকার কয়েক বছর আগে এধরণের বিয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন করেছে৻ কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতিবছর এমন ঘটনার শিকার হচ্ছেন অনেক নারী-পুরুষ৻

১৩ বছর বয়সে সামিরা আকতার শান্তাকে জোর করে বিয়ে দেয়া হয়েছিল লন্ডন প্রবাসী এক বৃদ্ধের সঙ্গে৻ সামিরার মা পেশায় গৃহপরিচারিকা৻ তাঁর বয়স যখন আট/নয়, তখন বাবা মারা যান৻

সামিরার ধারণা, অর্থের লোভে তাঁর মা আসলে তাকে বিক্রিই করে দিয়েছিল কথিত স্বামীর কাছে৻

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

"বিয়ের কোন অনুষ্ঠান হয়নি৻ একটা বাসার একজন মৌলভী নিয়ে আসা হয়৻ তারপর সেখানে আমাকে জোর করে কবুল পড়ানো হয়৻"

বিয়ের মাস কয়েকের মধ্যে সামিরাকে একদিন তুলে দেয়া হয় লন্ডনগামী এক ফ্লাইটে৻ সঙ্গে তার কথিত বৃদ্ধ স্বামীর প্রথম স্ত্রী৻ পাসপোর্টে আর অন্য কাগজপত্রে সামিরার পরিচয় দেখানো হয় এই প্রথম স্ত্রীর মেয়ে হিসেবে৻

"আমরা ছিলাম খুবই গরিব৻ আমি কোনদিন স্বপ্নেও ভাবিনি লন্ডনে যাব৻ আমাকে বলা হলো, লন্ডনে গেলে আমার ভালো হবে, ভালো খেতে-পরতে পারবো৻ আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হবে৻ আমার মাকে মাসে মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে দেয়া হবে৻"

স্ত্রী থেকে গৃহপরিচারিকা

২০০৬ এর এপ্রিলে পূর্ব লন্ডনের এক বাড়ীতে শুরু হয় সামিরার নতুন জীবন৻ পুরো এক বছর এই বাড়ীতে ছিলেন সামিরা৻ কিন্তু ঘরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ তার খুব কমই ঘটেছে৻ অনেকটা গৃহবন্দী জীবন৻ সেখানে তাকে অনেকটা গৃহপরিচারিকার মতই রাখা হয়, সংসারের যাবতীয় কাজ-কর্মের দায়িত্ব ছিল তার৻

"আমি ভাষা বুঝতাম না, বলতে পারতাম না, তাই কারও মিশতেও পারতাম না৻ এক বছর আমার ওপর খুব অত্যাচার করেছে ওরা৻ "

কথিত স্বামীর প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার জের ধরে একদিন পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায় সামিরাকে৻ ততদিনে তার ভিসার মেয়াদও ফুরিয়ে গেছে৻ তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে স্থানীয় কাউন্সিলের সোশ্যাল সার্ভিসের তত্ত্বাবধানে সামিরার ঠাঁই হয় এক পালক পরিবারে৻

ছলনার বিয়ে

Image caption হোমায়রা আবেদীন

সামিরা আসলে "ফলস ম্যারেজ" বা ছলনার বিয়ের শিকার৻ ব্রিটেনে এশিয়ান সম্প্রদায়ের মধ্যে এরকম ঘটনা অহরহ ঘটছে৻ এর পাশাপাশি ফোর্সড ম্যারেজ বা জোর করে বিয়ে দেয়ার ঘটনা তো আছেই" বলছিলেন সমাজকর্মী এবং গবেষক নাজিয়া খানুম৻

বছর কয়েক আগে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র দফতরের তত্ত্বাবধানে ফোর্সড ম্যারেজ বা জোর করে বিয়ে দেয়ার ঘটনার বিষয়ে এক গবেষণা চালিয়েছিলেন নাজিয়া খানুম৻ তাতে তিনি দেখেছেন লুটনের মতো একটি ছোট শহরেই বছরে ৩০০র বেশি এরকম বিয়ের ঘটনা ঘটছে৻ তাঁর মতে, সারা দেশের পরিসংখ্যান যদি নেয়া হয়, সেই সংখ্যাটি হবে আঁতকে উঠার মতো৻

"গেল বছর আমাদের কাছে জবরদস্তিমূলক বিয়ের ব্যাপারে প্রায় ১৩০০ অভিযোগ এসেছে৻ এর মধ্যে ১০% ঘটনায় কোন না কোনভাবে বাংলাদেশী বা ব্রিটিশ বাংলাদেশীরা জড়িত৻ তবে এটা আসলে সম্ভবত পুরো সমস্যার একটা ক্ষুদ্র অংশ৻ আরও অনেকেই হয়তো এরকম ঘটনার শিকার হচ্ছেন, কিন্তু তারা তা প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছেন", বলছিলেন ফরেন এন্ড কমনওয়েলথ অফিসের ‘ফোর্সড ম্যারেজ ইউনিটের‘ উপ-প্রধান সারাহ রাসেল৻

দ্বিতীয় প্রজন্মের সংকট

ফোর্সড ম্যারেজ ইউনিট মূলত এ ধরণের বিয়ের শিকার হন যারা, তাদের সহায়তা দিয়ে থাকে৻ সারাহ রাসেল বলছেন, ব্রিটেনে বেড়ে উঠা অভিবাসীদের দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরাই এরকম সমস্যায় বেশি পড়ে৻ ছুটি কাটানোর নাম করে তাদের হয়তো বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে হয়তো জোর করে বিয়ে দেয়া হয় চাচাতো বা খালাতো ভাই বা বোনের সঙ্গে৻

ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের মধ্যে এই সমস্যার ব্যাপকতা এত বেশি কেন ? গবেষক নাজিয়া খানুম মনে করেন বাংলাদেশী অভিবাসীদের ঘরের আর বাইরের পরিবেশের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক৻ সেটা পরিবারে এবং সমাজে একটা দ্বন্দ্ব তৈরী করছে৻

"ব্রিটেনে বেড়ে উঠছে যে নতুন বাংলাদেশী প্রজন্ম, তাদের বাবা-মায়ের মনে সব সময় একটা শংকা কাজ করে যে এরা হয়তো তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে৻ এই শংকা থেকে বাবা-মা তাদেরকে অনেক সময় জোর করে বাংলাদেশের কোন ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে৻ সেখানেই আসলে ভুলটা৻ তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক তফাতটা এত বেশি যে এরকম বিয়ে টেকার কথা নয়৻"

নাজিয়া খানুম বলছেন, এর পাশাপাশি অনেকে গৃহপরিচারিকা বা সেবিকা হিসেবে কাজ করানোর জন্যও বাংলাদেশ থেকে মেয়ে নিয়ে আসছেন মিথ্যে বিয়ের ছলনা করে৻

"বিয়ের আগে হয়তো বলা হয় ছেলে অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা ভালো কাজ করে৻ কিন্তু বিয়ের পর মেয়ে এখানে এসে দেখতে পায় সবই মিথ্যে৻ ছেলে হয়তো মাদকাসক্ত৻ এমনকি

অনেকে তাদের প্রতিবন্ধী ছেলের জন্যও মিথ্যে কথা বলে বাংলাদেশ থেকে বউ নিয়ে আসছেন তার দেখাশোনা করার জন্য৻

ফোর্সড ম্যারেজ ইউনিটের সারাহ রাসেল বলছেন, এরকম বিয়ের শিকার যারা হচ্ছেন, তারা বেছে নেয়ার মতো যে দুটি বিকল্প দেখছেন, দুটিই আসলে ভয়ানক৻ হয় তাদের সবকিছু মেনে নিয়ে সংসার করতে হয়৻ কিংবা এই বিয়ে থেকে বেরিয়ে পুরো পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঝুঁকি নিতে হয়৻

এধরণের বিয়েতে অভিভাবকদের নিরুৎসাহিত করতে বাংলাদেশের সিলেটে এবং ঢাকায় কিছু সচেতনতামূলক কর্মসূচী চালাচ্ছে ফোর্সড ম্যারেজ ইউনিট৻ সারাহ রাসেল বলছেন, জোর করে বিয়ে দেয়া সব ধর্মেই নিষিদ্ধ এবং এর বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে তারা ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকেও সহায়তা পাচ্ছেন৻

সামিরার প্রতীক্ষা

লন্ডনে সামিরার শেষ দুই বছর ভালোই কেটেছিল৻ যে পালক পরিবারে তাঁর ঠাই হয়েছিল, সেখানে স্নেহ-মমতার পাশাপাশি পড়াশোনার সুযোগও জুটেছিল৻ স্থানীয় স্থানীয় একটি কমিউনিটি কলেজে ভর্তি করে দেয়া হয়েছিল সামিরাকে৻

কিন্তু ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য তার আবেদন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ নাকচ করে দেয়৻ তাকে ফেরত পাঠানো হয় বাংলাদেশে৻ ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ সামিরা৻

"আমি আমার পালক বাবা-মার কাছে ফিরে যেতে চাই৻ তারাই আমার আসল বাবা মা৻ আমি আবার লেখা-পড়া করতে চাই, নতুন করে জীবন গড়তে চাই৻ পুরনো সব কিছু ভুলতে চাই৻ ব্রিটিশ সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, আমাকে আবার লন্ডনে ফিরতে দেয়া হোক৻"