পূর্ব আফ্রিকায় দৌড়ের রহস্য

East Africa runners ছবির কপিরাইট

আপনি যদি ইন্টারনেটের সার্চ ইঞ্জিনে ‘পূর্ব আফ্রিকা এবং দৌড়’ এরকম লিখে কিছু সন্ধান করেন তাহলে এ সংক্রান্ত হাজার হাজার তথ্য পেয়ে যাবেন।

আর আফ্রিকায় দৌড়বিদরা লম্বা দূরত্বের দৌড়ে কেনো এতোটা দক্ষ সেই প্রশ্নের উত্তরও পেয়ে যাবেন সেখানে।

এর গোপন রহস্যটা জানতে চান অনেকেই, জানতে চান এর পেছনে কি ধরনের গবেষণা হয়েছে।

এই প্রশ্নের সহজ এবং একক কোনো জবাব নেই, কিন্তু এর পেছনে যেসব কারণের কথা ভাবা হয় পেয়ে যেতে পারেন তার একটা লম্বা তালিকাও। তালিকাটা খুব লম্বা।

এগিয়ে তিনটি এলাকা

অ্যাথলেটিক্সের জগতে পূর্ব আফ্রিকা বলতে অনেকেই বোঝেন কেনিয়া এবং ইথিওপিয়ার দৌড়বিদদের কথা। কাকতালীয়ভাবে বেশিরভাগ দৌড়বিদ বা রানাররা এসেছেন এই দুটো দেশের তিনটি পাহাড়ি এলাকা থেকে।

জায়গাগুলো হচ্ছে: ১. কেনিয়ার নন্দী, এই এলাকা থেকে এসেছেন সবচে সফল দৌড়বিদ ২. ইথিওপিয়ার আরসি ৩. ইথিওপিয়ার শেওয়া অনেকে বলেন, এই দৌড়বিদরা যেহেতু উঁচু উঁচু পাহাড়ে বসবাস করেন এবং অধিকতর উচ্চতায় দৌড়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন সেকারণেই তারা দৌড়ে খুব ভালো।

এদেরকে বলা হয়: অধিক উচ্চতার অধিবাসী। এর বৈজ্ঞানিক কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়, অধিকতর উচ্চতায় যারা বসবাস করেন তাদের রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ বেশি থাকে। এ কারণে তারা বেশি দম নিয়ে লম্বা দূরত্বের দৌড়ে বেশি সফল হয়ে থাকেন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, যারা ২০০০ মিটার উঁচুতে বাস করেন তাদের এই বাড়তি সুবিধা রয়েছে।

এই হিসেবে দূরপাল্লার দৌড়ে ভালো করছেন মেক্সিকো, অ্যান্ডিজ পর্বতমালা এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর অ্যাথলেটরা।

ছবির কপিরাইট

কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন: আফ্রিকার শুধু এই তিনটি এলাকার অ্যাথলেটরাই কেনো দৌড়ে ভালো করছেন?

এর পেছনে আছে ঐতিহাসিক কারণও।

বলা হয় যে, ব্রিটিশ সেনাবাহিনী একসময় এসব এলাকায় দৌড় ও দৌড়বিদদের পেছনে অনেক অর্থ ও সময় বিনিয়োগ করেছে। এছাড়াও পূর্ব আফ্রিকায় বহু আগে থেকেই এই দৌড়ের প্রচলন ও জনপ্রিয়তা দুটোই ছিলো।

শারীরিক কারণ

এর পেছনে দুটো বহুল প্রচলিত ব্যাখ্যা আছে। এক. পরিমিতি আহার, বিশেষ করে পুষ্টিকর খাবার এবং দুই. মানব দেহে বিশেষ জিন।

তবে জিনগত কারণ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। অনেকে বলছেন, পূর্ব আফ্রিকার মানুষের দেহে আছে বিশেষ জিন যা তাদেরকে দৌড়াতে সাহায্য করে। এখনও পর্যন্ত এসব শুধুই ধারণা, এর সমর্থনে বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণ এখনও মেলেনি।

আরো একটা কারণ হিসেবে বলা হয় পূর্ব আফ্রিকার দৌড়বিদদের মেদহীন, হালকা লিকলিকে আর একহারা গড়ন।

এরকম শরীর খুব সহজে তাপ শুষে নিতে পারে। যেসব জায়গায় অলিম্পিকস হয়েছে তার বেশিরভাগই উষ্ণ এলাকা। উদাহরণ হিসেবে বেইজিং, সিডনি, আটলান্টা, বার্সেলোনা, সউল ইত্যাদি।

গবেষকদের দেওয়া আরেকটি তত্ব হচ্ছে: পূর্ব আফ্রিকার দৌড়বিদদের পায়ের তালু ও গোড়ালিতে ওজন কম হয়ে থাকে। ফলে দ্রুত গতিতে দৌড়াতে তাদেরকে খুব কম জ্বালানী পোড়াতে হয়। এছাড়াও বলা হয় যে, সফল দৌড়বিদদের অনেককে শৈশবে লম্বা পথ দৌড়ে স্কুলে যেতে হতো যা ভবিষ্যতের জন্যে তাদের প্রশিক্ষণ হিসেবে কাজ করেছে।

ছবির কপিরাইট

দেখা গেছে যে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সফল দৌড়বিদ তাদের শৈশবে দীর্ঘ দূরত্বের পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে গেছেন।

এই রানাররা কঠোর পরিশ্রম করেন এবং তাদের প্রশিক্ষণের ধরনও অন্য এলাকার দৌড়বিদদের প্রশিক্ষণের তুলনায় ভিন্ন।

অর্থনৈতিক পুরষ্কার

পূর্ব আফ্রিকার অ্যাথলেটরা দারিদ্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্যেও নিজেদেরকে রানার হিসেবে তৈরি করেছেন।

মধ্য কৈশোরে কেউ যখন সফল দৌড়বিদ হয়ে উঠছেন তখন হয়তো তিনি বিদেশে কোনো দৌড় প্রতিযোগিতা থেকে একটা মোটা অঙ্কের অর্থ পুরষ্কার হিসেবে জিতে আনছেন। তখন পাশের গ্রামের আরেকজন এই পুরষ্কার দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন।

পূর্ব আফ্রিকায় একজন মানুষ যতো আয় করে পুরষ্কারের এই অর্থ তারচেয়েও অনেক বেশি। তখন প্রত্যেকটা স্কুলে একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।

তারপর এই সাফল্য অর্জন করতে কঠোর অনুশীলন করতে হয় তাদের।

প্রতিভাবান দৌড়বিদরা তখন একটা লক্ষ্য স্থির করেন, সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে মনোবল দৃঢ় করেন, পূর্ববর্তী সফল দৌড়বিদদের অনুসরণ করেন এবং প্রশিক্ষণে নেমে পড়েন যা তাকে সফল রানার হিসেবে তৈরি করে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পূর্ব আফ্রিকার দৌড়বিদরা যে ভালো এই প্রবণতা ভেঙে দেওয়া খুব একটা সহজ হবে না। অনেকে বিশ্বাস করেন যে তারা পূর্ব আফ্রিকার দৌড়বিদদের কখনো হারাতে পারবেন না।

এর পেছনে প্রথমত মানসিক, সামাজিক, শারীরিক আর অর্থনৈতিক কারণতো আছেই।