BBC navigation

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাঈদীর ফাঁসির রায়

সর্বশেষ আপডেট বৃহষ্পতিবার, 28 ফেব্রুয়ারি, 2013 16:14 GMT 22:14 বাংলাদেশ সময়
রায়ের পর পুলিশ প্রহরায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

রায়ের পর পুলিশ প্রহরায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন।

ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর জনাকীর্ণ আদালতে বৃহস্পতিবার দুপুরে এই রায় ঘোষণা করেন।

ট্রাইবুনালের রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে সংঘটিত হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতনসহ অন্তত ২০টি মানবতাবিরোধী অভিযোগের মধ্যে আটটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

এর মধ্যে দুটো অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়।

বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার কিছু পর যখন দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে রায় দেয়া শুরু হয়, তখন আদালত ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির শুরুতেই বলেন, মি. সাঈদীর ওয়াজের কারণে অথবা জামায়াতে ইসলামীর নেতা হিসেবে পরিচয় থাকলেও, এখানে তার বিচার হয়েছে ৪০ বছর আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে তার কর্মকান্ডের জন্যে।

ট্রাইবুনালে মি. সাঈদীর বিরুদ্ধে মোট ২০ টি অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ নানা অভিযোগ।

আদালতের রায়ে বলা হয়, এর মধ্যে ৮টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে, হত্যা, ধর্ষন, নির্যাতন এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করাসহ বিভিন্ন অপরাধ।

আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী

আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এই রায়ে তারা সন্তুষ্ট।

তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, আমরা একটি ন্যায়বিচার পেয়েছি। যেধরণের অভিযোগ তাতে মৃত্যুদন্ড ছাড়া অন্য কোন শাস্তি দিলে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারতাম না।”

১৯৭১ সালে এসব অপরাধ সংগঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের পিরোজপুর জেলায়। রাজাকার বাহিনীর হয়ে মি. সাঈদী এসব অপরাধ করেছিলেন বলে আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়।

প্রমাণিত অভিযোগের মধ্যে দুটি হত্যার অভিযোগে আদালত মি. সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড দেয়। যার মধ্যে রয়েছে পিরোজপুরে ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা এবং বিসা বালি হত্যা।

আর যে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়নি, তার অধিকাংশই প্রমাণিত হয়নি উপযুক্ত স্বাক্ষীর অভাবে।

তবে প্রমাণিত না হওয়ার কারণ হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কোন দূর্বলতা ছিল কিনা? এ প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, তাদের দিক থেকে কোন দূর্বলতা ছিল না।

এদিকে আদালতের এই রায়কে অপ্রত্যাশিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন মি. সাঈদীর আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, নিয়মানুযায়ী আগামী ৩০ দিনের মধ্যেই তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।

তিনি দাবি করেন, যেসব অভিযোগে মি. সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে, তার সবগুলো অভিযোগই তারা মিথ্যা প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছেন।

“এই রায়টি অবিশ্বাস্য, অপ্রত্যাশিত এবং এই রায়ে আমরা স্তম্ভিত। প্রসিকিউশনের সকল স্বাক্ষ্য-প্রমাণ আমরা মিথ্যা প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছি। তারপরও কেমন করে মাননীয় আদালত এই রায় দিলেন তা আমাদের বোধগম্য নয়,” তিনি বলেন।

মি. সাঈদীর এই রায়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের তৃতীয় রায় এবং জামায়াতে ইসলামীর কোন উচ্চপদস্থ নেতার মামলায় দেয়া দ্বিতীয় রায়।

মি. সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর ব্যাপক সহিংসতায় বহু লোক প্রাণ হারায়

মি. সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর ব্যাপক সহিংসতায় বহু লোক প্রাণ হারায়।

এর আগে জামায়াতের নেতা কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়ার পর যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে ঢাকার শাহবাগসহ সারাদেশে আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

সেই আন্দোলনের কোন প্রভাব আদালতের ওপর পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

এদিকে মি. রাজ্জাক বলেন, বিচার যদি প্রভাবিত হয়ে থাকে তবে সেটি হবে আইনের শাসনের জন্য একটি কালো অধ্যায়।

এজলাশ চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা এবং অ্যাটর্নি জেনারেল উপস্থিত থাকলেও, জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতালের কারণে মি. সাঈদীর পক্ষের কোন সিনিয়র আইনজীবী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মি. সাঈদীকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইবুনালে আনা হয়।

এজলাশে আনার পর থেকে মি. সাঈদীকে বেশ নির্লিপ্ত এবং বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। রায়ের পুরো সময়টিতে তিনি কিছু বলেননি।

তবে রায় শেষ হবার পরপরই উঠে দাড়িয়ে তিনি আদালতকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা নিজেদের শপথের ওপর দায়বদ্ধ থেকে বিচার করতে পারেননি, তার ভাষায়, শাহবাগের নাস্তিকদের দ্বারা আদালত প্রভাবিত বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এসময় আদালতে উপস্থিত অনেকেই তাকে উচ্চস্বরে রাজাকার বলতে থাকেন।

আদালতকক্ষে একটি হট্টোগোলের মধ্যেই মি. সাঈদীকে এজলাশ থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়।

বাংলাদেশে বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধের বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ারর পর এটি হলো ট্রাইব্যুনালের তৃতীয় রায়।

এদিকে মি. সাঈদীর মুক্তির দাবিতে জামায়াত বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করেছে।

এর আগে গত মাসে ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে জামায়াতের সাবেক নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ হয়, যদিও তিনি ফেরার থাকায় রায় ঘোষণা হয় তার অনুপস্থিতিতেই।

এরপর ৫ই ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় রায়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়।

কিন্তু সেই শাস্তি প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা বা ফাঁসির দাবিতে এরপরই শাহবাগ থেকে শুরু হয় দেশব্যাপী এক অভূতপূর্ব নাগরিক আন্দোলন।

শাহবাগের সেই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর এটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই প্রথম কোনও রায়।

মামলার ইতিহাস

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯শে জুন প্রথম গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সাবেক সংসদ সদস্য মি. সাঈদীকে।

এরপর একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পিরোজপুরে হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা মামলায় পরের বছর ১৪ই জুলাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।

এর আগে বৃহস্পতিবার মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম কৌঁসুলি সৈয়দ হায়দার আলী বিবিসিকে বলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যায় সহযোগিতা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুঠতরাজ, ধর্মান্তরে বাধ্য করা ইত্যাদি মোট ২০টি অভিযোগে বিচারের শুনানি হয়।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকার দীর্ঘ ৩২ মাস ধরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে আটকে রেখেছে এবং তার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে।

বহু প্রতীক্ষিত রায়

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন চলছে গত তিন দশক ধরে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার।

তবে জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই এটিকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনাল’ বলে অভিহিত করে বিচার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

দলটি গত কিছুদিন ধরে এই বিচার বন্ধের দাবিতে সহিংস আন্দোলন করছে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রাক্তন প্রধান গোলাম আযম এবং বর্তমান আমীর মতিউর রহমান নিজামীসহ দলের আরও অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে।

একই ধরনের খবর

BBC © 2014 বাইরের ইন্টারনেট সাইটের বিষয়বস্তুর জন্য বিবিসি দায়ী নয়

কাসকেডিং স্টাইল শিট (css) ব্যবহার করে এমন একটি ব্রাউজার দিয়ে এই পাতাটি সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে৻ আপনার এখনকার ব্রাউজার দিয়ে এই পাতার বিষয়বস্তু আপনি ঠিকই দেখতে পাবেন, তবে সেটা উন্নত মানের হবে না৻ আপনার ব্রাউজারটি আগ্রেড করার কথা বিবেচনা করতে পারেন, কিংবা ব্রাউজারে css চালু কতে পারেন৻