BBC navigation

সংবাদদাতার নোটবুক: ধ্বংসস্তূপের পাশে কয়েক ঘন্টা

সর্বশেষ আপডেট শনিবার, 27 এপ্রিল, 2013 08:56 GMT 14:56 বাংলাদেশ সময়

“ভাই আমার স্বামীডা ভিতরে আছে। না খাইয়া অফিসে আইছিলো। ভাইরে তিনদিন ধইরা পইরা আছে। হেরে একটু বের কইরা আনেন”- গণমাধ্যম কর্মী দেখলেই এভাবেই আকুতি জানাচ্ছিলেন এক নারী। শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় যখন দ্বিতীয় দিনের মতো রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়াই তখন মধ্যবয়সী ওই নারী স্বামীর ছবি হাতে বিলাপ করছিলেন।

সেখান থেকে কয়েক গজ সামনে এগুতেই আমার দিকে এগিয়ে আসলেন একজন বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী। একটি মাস্ক হাতে দিয়ে বললেন, “প্লীজ এটা মুখে দেন এখুনি”। কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে গেলেন অন্য দিকে। ততক্ষণে অনুভব করছিলাম সাভারের বাতাস উৎকট গন্ধে ভারী। এর আগে বৃহস্পতিবারও গন্ধটি অনুভব করছিলাম। কিন্তু শুক্রবার এটি ছিল আরও তীব্র।

"ভাই আমার স্বামীডা ভিতরে আছে। না খাইয়া অফিসে আইছিলো। ভাইরে তিনদিন ধইরা পইড়া আছে। হেরে একটু বের কইরা আনেন।"

ভবনের ভিতরে আটকে থাকা স্বামীর অপেক্ষায় থাকা এক নারী

সন্ধ্যা ৬টা। পর পর কয়েকটি মৃতদেহ বের করা হলও রানা প্লাজার পাশের আরএস টাওয়ার পর ভিতর দিয়ে। দুর্গন্ধ আরও তীব্র হলো। ভবনের ভিতরে আটকে থাকা মানুষগুলোর জন্য বাইরে থাকা স্বজনদের উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেল।

একটু সামনে এগুতেই দেখলাম দুজন নারী একে অন্যকে ধরে কাঁদছেন। বুঝতে বাকী থাকলোনা ধ্বংসস্তূপে আটকে আছেন তাদের স্বজন। কাছে যেতেই তাদের বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো কান্না। এদের একজন তানিয়া। আর্তনাদ আর আহাজারির মধ্যেই বললেন, “ভাই জ্যোৎস্না ভিতরে। বুধবার থেকে আটকা আছে। আজ বিকেলে একবার ফোনে পাইছিলাম ভাই। খালি কইলো বইনরে তৃষ্ণায় বুকডা ফাইট্যা যাইতেছে”।

তানিয়া জানালেন তার বোন জ্যোৎস্না সুইং অপারেটরের কাজ করতেন ভবনের চারতলার একটি পোশাক কারখানায়।

সন্ধ্যা ৭টা। খবর এলো বেশ কয়েকজন জীবিত মানুষের সন্ধান পাওয়া গেছে। উপস্থিত হাজারো জনতা উল্লাস করে হাততালি দিলো মাইকে খবরটি শোনা মাত্র। কিছুক্ষণ পর মাইকেই বলা হলও দুজন আহত সুড়ঙ্গ থেকে বের করার পর হেঁটেই বের হচ্ছেন। মানুষের উল্লাস দেখে মনে হচ্ছিলো বের হওয়া ব্যক্তিটি মনে হয় প্রতিটি মানুষেরই স্বজন।

রাত ৮টায় ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে সহকর্মীদের সংগে বেরিয়ে আসছিলেন ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের একজন পরিচালক মেজর শাকিল। নিশ্চিত করলেন ২৩ জনের সন্ধান পেয়েছেন। একটু সময় লাগবে তবে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হবে। বললেন উদ্ধার তৎপরতার বিভিন্ন দিকও।

আহত একজনকে বের করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা

এসময়ই কথা হলো বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী শামীমের সঙ্গে। বাড়ি কুষ্টিয়া। ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকেন। পেশায় ড্রাইভার। তিনদিন ধরে রয়েছেন উদ্ধার তৎপরতায়। বললেন, “নিজের হাতে বাইর করছি ভাই মানুষরে। অক্সিজেন দিছি। পানি দিছি। ভাই কেমনে যে মানুষগুলো আছে বিশ্বাস করবেন না ভাই”।

জানতে চাইলাম আগে কখনো এ ধরনের কাজ করেছেন কি না ? বললেন না। “পারুম কি না ভাবিনাই। যতদূর যাওয়ার শক্তি পাইছি গেছি। আবার বের হইছি। আবার যখন শক্তি পাইছি গেছি। এতো মানুষ ভিতরে। না যাই কেমনে? আনতে তো অইবো”।

রাত ৯টা। রানা প্লাজার প্রায় ১০০ গজ দুরে দেখলাম কয়েকজন মানুষ খিচুড়ি বিতরণ করছে। জানতে চাইলাম কোথা থেকে কারা এনেছে এসব। বললেন কয়েক কিলোমিটার দুরে তারা থাকেন। ৪০০ প্যাকেট খিচুড়ি এনেছেন এখানে যারা কাজ করছেন বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের মধ্যে বিতরণ করছেন ঘুরে ঘুরে।

রাত ১০টায় রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের বাইরে পানি বিতরণ করছিলেন ইমরান। তার দুটি দোকান ছিল ওই ভবনে। এর একটিতে ১৬ লাখ টাকার মালামাল ছিলও। এই ক্ষতির পরও আপনি এখানে কি করছেন? উত্তর দিলেন, “আমি তো মাল হারাইছি। বহু মানুষ সব হারাইছে ভাই। ঘরে কিছু টাকা ছিলও। পানি আনাইছি। দিতেছি। মানুষ তো ভাই মানুষের জন্য।"

রাত ১১:৩০-এ যখন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেই তখনো ঘটনাস্থলে অগণিত মানুষ।

সবার সম্মিলিত প্রয়াসে তখনো চলছিলো জীবন বাঁচানোর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।

BBC © 2014 বাইরের ইন্টারনেট সাইটের বিষয়বস্তুর জন্য বিবিসি দায়ী নয়

কাসকেডিং স্টাইল শিট (css) ব্যবহার করে এমন একটি ব্রাউজার দিয়ে এই পাতাটি সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে৻ আপনার এখনকার ব্রাউজার দিয়ে এই পাতার বিষয়বস্তু আপনি ঠিকই দেখতে পাবেন, তবে সেটা উন্নত মানের হবে না৻ আপনার ব্রাউজারটি আগ্রেড করার কথা বিবেচনা করতে পারেন, কিংবা ব্রাউজারে css চালু কতে পারেন৻