BBC navigation

ছ'দিনেরও বেশি সময় পর শাহীনার দুর্ভোগের অবসান

সর্বশেষ আপডেট মঙ্গলবার, 30 এপ্রিল, 2013 10:27 GMT 16:27 বাংলাদেশ সময়

সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজায় মৃত্যুর সাথে লড়াই করা শাহীনার সব দুর্ভোগের অবসান ঘটেছে।

তার দুর্ভোগ আর জটিলতার সমাপ্তি হয়েছে মঙ্গলবার সকালে তাকে দাফনের মধ্য দিয়ে।

তার দেড় বছরের শিশু সন্তান রবিন পুরো ঘটনার কিছু বুঝতে পেরেছে কি-না বোঝা যায়নি। তবে বিদায় বেলায় মায়ের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলো সেও।

এই শিশুটির জন্যই বাঁচতে চেয়েছিলও স্বামী-হারা শাহীনা।

উদ্ধার কর্মীদের কাছে তার আকুতি ছিল এই একটাই- “ভাই আমার বাচ্চাটা খেতে পারছে না এ কয়টা দিন। আমাকে বাঁচান বাচ্চাটার জন্য।”

পাঁচদিন লড়াই করে ভাগ্যের কাছে হেরে যাওয়া এই পোশাক শ্রমিকের বিদায় শুধু তার পরিবার নয়, কাঁদিয়েছে সর্বস্তরের মানুষকে।

“আজ সকাল দশটায় দাফন করলাম মেয়েটাকে। সাভারেই ইমান্দিপুর এলাকায় দাফন করা হয়েছে। দোয়া করবেন শাহীনার জন্য,” দুপুর একটায় ফোনে বিবিসি বাংলাকে বললেন শাহীনার বাবা আব্দুল মোত্তালিব।

"ভাই আমার বাচ্চাটা খেতে পারছেনা এ কয়টা দিন। আমাকে বাঁচান বাচ্চাটার জন্য"

মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে শাহীনা

গত বুধবার ভবন ধসের পর ধ্বংসস্তূপের ভেতরেই চাপা পড়ে শাহীনা।

এর চারদিন পর রোববার ভোরেই তার সন্ধান পান উদ্ধার কর্মীরা। সক্ষম হন তার সঙ্গে কথা বলতেও।

ততক্ষণে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরানো হবে।

বাদ সাধেন উদ্ধার কর্মীরা।

সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেন শাহীনাকে উদ্ধার না করে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করতে।

সেনা কর্মকর্তারাও সায় দেন।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয় আটকে পড়া এই নারীকে উদ্ধারের পরই দ্বিতীয় পর্যায়ের অভিযান শুরু হবে।

এরপর দু’জন সেনা কর্মকর্তার নেতৃত্বেই শুরু হয় দমকল বাহিনীর প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এবং আরও কিছু স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে সর্বাত্মক অভিযান।

সাভারে স্বজনের আহাজারি থামেনি এখনও

অষ্টম তলা থেকে প্রায় দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত সুড়ঙ্গ করে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তেই পৌঁছে গিয়েছিলেন তারা।

এক পর্যায়ে ভারী দেয়াল কেটে তৈরি করা গর্ত দিয়ে শাহীনার মাথা আসছিলো কিন্তু পুরো শরীর আসছিলো না।

ভেতর থেকে উদ্ধার কর্মীদের সহায়তা করছিলেন শাহীনা নিজেও।

স্যালাইন, পানি, অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছিলো তাদের। কিন্তু দুটো বীমের মধ্যে ফাঁকা জায়গা এতো কম ছিল যে পাইপ দিয়ে এসব দিতে হচ্ছিলো।

কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না শাহীনার।

রোববার রাত দশটার একটু আগে রড কাটার সময় সেখানেই আগুন ধরে যায়।

সাথে সাথে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসস্তূপের ভেতরে থাকা কাপড়ের স্তূপে।

"সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শাহীনার ভাগ্যে কি ঘটেছে আমরা জানি না"

একজন উদ্ধাকারী, ভবনে আগুন লাগার পর

পরে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও ধোঁয়ার কুন্ডুলি ছিলো পরদিনও। আর এই ধোঁয়াই শাহীনাকে হারিয়ে দেয় জীবনযুদ্ধে।

এর কিছুক্ষণ পরই এক ব্রিফিং এ উদ্ধার তৎপরতায় জড়িত থাকা দু’জন সেনা কর্মকর্তা ছলছল চোখে জানান, “ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শাহীনার ভাগ্যে কি ঘটেছে আমরা জানি না”।

রোববার রাত ১২ টায় দ্বিতীয় ধাপের অভিযান শুরুর সময় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজমল কবীর বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাবে বলেন, “তার ভাগ্যে কি ঘটেছে আমরা জানিনা।”

ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে উদ্ধার অভিযান চললেও উদ্ধার কর্মীদের দৃষ্টি ছিলো শাহীনার দিকেই।

আগুন পুরো নিয়ন্ত্রণে আনার পর সোমবার তারা আবার লড়াই শুরু করেন শাহীনাকে উদ্ধারের জন্য।

শাহীনা বেরিয়ে আসেন বেলা সাড়ে তিনটার দিকে। তবে জীবিত নয়, মৃত।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তার লাশ ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

হৃদয় বিদারক পরিবেশ তৈরি হয় পুরো এলাকা জুড়ে।

সেনা সদস্যরা, গণমাধ্যম কর্মীরা ছাড়াও উপস্থিত লোকজন কেউই তাদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিয়ে শুরুতে আপত্তি তুলেছিলো নিখোঁজ লোকজনের স্বজনেরা

কিন্তু ভাগ্য খারাপ মৃত শাহীনারও।

আটকে থাকার সময় শাহীনা বলেছিলেন তার বাবার নাম আব্দুল মোত্তালিব গোলদার এবং বাড়ি কুষ্টিয়ায়।

মৃতদেহ অধরচন্দ্র হাইস্কুল মাঠে নেওয়ার পর বাবার নাম মিললেও বাড়ির নাম মেলেনি। মি. মোত্তালিব জানান তার বাড়ি পটুয়াখালীতে।

আরও একজন শাহীনাকে তার কন্যা দাবি করে।

এ নিয়ে জটিলতায় জেলা প্রশাসন চার ঘণ্টা সময় নেয় শাহীনার প্রকৃত অভিভাবক কে সেটা নিশ্চিত করতে।

তদন্ত করে জানা যায় পটুয়াখালী বাবার বাড়ি আর কুষ্টিয়া তার শ্বশুর বাড়ি।

পরে সোমবার রাতেই পিতা আব্দুল মোত্তালিবের কাছে তার মরদেহ তুলে দেওয়া হলে প্রায় ১৫০ ঘণ্টা পর প্রিয় সন্তান রবিনের কাছে ফিরেন শাহীনা।

আর মঙ্গলবার সকালে ছোট্ট সন্তানসহ প্রিয়জন সবাইকে আরও একবার কাঁদিয়ে চিরবিদায় নেন তিনি।

সম্পর্কিত বিষয়

BBC © 2014 বাইরের ইন্টারনেট সাইটের বিষয়বস্তুর জন্য বিবিসি দায়ী নয়

কাসকেডিং স্টাইল শিট (css) ব্যবহার করে এমন একটি ব্রাউজার দিয়ে এই পাতাটি সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে৻ আপনার এখনকার ব্রাউজার দিয়ে এই পাতার বিষয়বস্তু আপনি ঠিকই দেখতে পাবেন, তবে সেটা উন্নত মানের হবে না৻ আপনার ব্রাউজারটি আগ্রেড করার কথা বিবেচনা করতে পারেন, কিংবা ব্রাউজারে css চালু কতে পারেন৻