রনি প্রশ্নে উত্তপ্ত বাংলাদেশের সাংবাদিক মহল

ঢাকায় সাংবাদিকদের বিক্ষোভ
Image caption ঢাকায় সাংবাদিকদের বিক্ষোভ

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির বিরুদ্ধে সাংবাদিক পেটানোর অভিযোগের পর রোববার তার গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছে সাংবাদিকদের কয়েকটি সংগঠন। মি. রনির সংসদ সদস্য পদও বাতিলের দাবি করছেন তারা।

ক্ষমতাসীন দলের কাছ থেকেও চাপ আসছে পটুয়াখালি থেকে নির্বাচিত এই এমপির ওপর।

তবে এই সংসদ সদস্য বিবিসিকে বলছেন, বেসরকারি একটি টেলিভিশনের মালিকের কর্মকান্ডের বিষয়ে বক্তব্য দেয়ায় তিনি কর্তৃপক্ষের এবং সাংবাদিকদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন নামে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের দুজন সাংবাদিককে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সরকার দলীয় সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি রোববারই আদালতে আত্মসমর্পন করে জামিন নিয়েছেন।

কিন্তু তার গ্রেপ্তারের দাবিতে মানবন্ধন করেছেন কয়েকটি সংগঠনের সাংবাদিকেরা। কিন্তু জামিন নেয়ার পরেও এমন দাবির যৌক্তিকতা কতখানি?

ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি রুহুল আমীন গাজী বলেন, “আমরা মনে করি আদালত তাকে জামিন দিয়ে সঠিক কাজটি করেনি। সেই কারণে আমরা মনে করি এই মামলার তদন্ত করে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। আমরা সাতদিন সময় দিয়েছি। গোলাম মাওলা রনির যদি সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয় সাংবাদিক মেরে আহত করার জন্য তাহলে ভবিষ্যতে আর কোনও সংসদ সদস্য এই কাজ করার ধৃষ্টতা দেখাবে না।”

ঐ প্রতিষ্ঠানটির একটি অনুসন্ধানমূলক অনুষ্ঠানের সাংবাদিকরা গত শনিবার অভিযোগ করেন, ঢাকার তোপখানার রোড এলাকায় সংসদ সদস্য মি. রনির কার্যালয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তিনি তাদের মারধর করেন এবং ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভাঙচুর করেন। ঘটনার দিনই দুপক্ষই পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করলেও, সাংবাদিক নেতারা সংসদ সদস্যপদ থেকে গোলাম মাওলা রনির পদ বাতিলের দাবি তুলেছেন। তারা এজন্য সাতদিন সময়ও বেধে দিয়েছে সরকারকে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি শাহেদ চৌধুরী মনে করেন, তারা অভিযোগকালী সাংবাদিকদের ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে যে চিত্র দেখেছেন তাতে তার এই ধরনের শাস্তি প্রাপ্য বলে তারা মনে করেন।

তিনি বলেন, “শনিবারে যে ঘটনা ঘটেছিল তারপর তিনি বলেছিলেন যে তিনি কোনও সংবাপত্র বা সংবাদকর্মীর ওপর হামলা করেননি। তবে আমরা টেলিভিশন ফুটেজে ঐদিনই দেখেছি যে তিনি নিজে মধ্যযুগীয় কায়দায় একজন গণমাধ্যম কর্মীকে লাথি মারছেন। যে আইনপ্রণেতা মিথ্যা বা অসত্য কথা বলতে পারেন, তার কি সংসদে থাকা উচিত বা ওনার কি সংসদ সদস্যপদ থাকা উচিত?”

তবে কোনো ধরনের শারিরীক আঘাত করার বিষয়টি অস্বীকার করে গোলাম মাওলা রনি দাবি করেন, মূলত ওই টেলিভিশনের মালিকের কর্মকান্ডের বিষয়ে বক্তব্য দেয়ায় কর্তৃপক্ষের এবং সাংবাদিকদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন তিনি।

“গত চারদিন যাবত অর্থাৎ যেদিন এই ঘটনা ঘটে তার চারদিন আগে থেকে তারা এই কাজ করছিল। সকাল নটায় তারা আমার অফিসের নিচে একটা ক্যামেরা সেট করে আর অফিসের সামনে দরোজায় একটা ক্যামেরা সেট করে বসে থাকে। এরপর আমি যখন অফিস থেকে বের হই তারা এই ক্যামেরা নিয়ে এবং দুটো টেলিভিশনের গাড়ি নিয়ে আট-দশজন লোক পুরোটা রাত আমি যেখানে যেখানে যাচ্ছি, আমি তো প্রায় রোজ রাতে টেলিভিশনে টকশোতে থাকি, কখনো রাত্রি একটা দেড়টার সময় ফিরি। পুরো সময়টা তারা আমাকে অনুসরণ করছিল।''

সরকার দলীয় এই সাংসদ আরো বলেন, “তারা এই জিনিসটা প্ররোচিত করছিল একটা কারণে তা হলো ওই চ্যানেলটির মালিকের ব্যক্তিগত বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ে বিশেষ করে শেয়ার বাজারের কেলেঙ্কারি নিয়ে আমি দীর্ঘদিন থেকে সরব ছিলাম। এই জিনিসটাকে স্তব্ধ করার জন্য এটা ছিল তার একটা কৌশল। এই কৌশলের মধ্যে সাংবাদিক সমাজের একটি অংশ সেখানে মদদ দিচ্ছে এটি খুবই দু:খজনক একটি ঘটনা ”।

বিষয়টি সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের নৈতিকতার প্রশ্নে কতটা যৌক্তিক সে প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজী বলেন, এখানে সাংবাদিকদের নৈতিকতার কোনও লংঘন হয়নি বলে তারা মনে করেন।

আদালত থেকে জামিন নেয়ার পর মি রনিকে গ্রেপ্তারের দাবি কেবল উচ্চ আদালতেই করা সম্ভব। এমনটাই বলছিলেন আইনজীবি শাহদিন মালিক ।

আর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের যে দাবি তোলা হয়েছে তাতেও আপাত সরকারের কিছু করার নেই বলে তিনি জানান। সংবিধান অনুসরে কোনও অপরাধে দু্বছর সাজাপ্রাপ্ত হলে কেবল সে প্রশ্ন উঠতে পারে।

শাহদিন মালিক বলেন, “সংবিধানেও আছে ৬৬ অনুচ্ছেদে আর আরপিও বা জনপ্রতিনিধিত্বমূলক আদেশ যেটির অধীনে সংসদ সদস্যের সব নির্বাচন পরিচালিত হয় ওই আইনের ১২ ধারায় বলা আছে কখন একজন সংসদ সদস্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন। অযোগ্য হওয়ার একটি কারণ হতে পারেন যদি কোনও অপরাধে বিচার হয়ে দুই বছরের বেশি সাজাপ্রাপ্ত হন তবে তিনি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হবেন। ওইটা না হওয়া পর্যন্ত তিনি যোগ্য থাকবেন। তার বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ থাকে কিংবা তিনি গ্রেপ্তারও হন তাতে কিছু যায়-আসে না।''

এদিকে বিষয়টি নিয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল আলম হানিফ গোলাম মাওলা রনির আচরণে ''সরকার এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে'' বলে গতকাল মন্তব্য করলেও, মি রনি মনে করেন বিষয়টি তার একান্তই ব্যক্তিগত।

ফলে দল বা সরকারের ভাবমুর্তি নষ্টের কোনও প্রশ্ন নেই বলে তিনি মনে করেন।

এই খবর নিয়ে আরো তথ্য