প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিবাদে লং মার্চ

Image caption সুন্দরবন বাঁচাতে ঢাকা থেকে রামপাল অভিমুখে শুরু হয়েছে এই লং মার্চ

বাংলাদেশের সুন্দরবনের কাছে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির প্রতিবাদ জানাতে আজ ঢাকা থেকে রামপাল পর্যন্ত একটি লং মার্চ শুরু হয়েছে।

লং মার্চের অন্যতম আয়োজক সংগঠন বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজসম্পদ, বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি।

তারা বলছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা নয়, মূলত সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্য বাঁচাতেই তাদের এই কর্মসূচি।

সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল যে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার - তারাও সাম্প্রতিক সময়ে এই কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশের সরকারকে চিঠি দিয়েছে।

সুন্দরবনের কাছেই বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায় কয়লা-ভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে গত বছরের জানুয়ারিতে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদক সংস্থা ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানি বা এনটিপিসি এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড বা পিডিবির মধ্যে একটি চুক্তি হয়।

এই চুক্তির আওতায় গঠিত হয় বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি যারা এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করবে।

তবে শুরু থেকেই নানা পরিবেশবাদী সংগঠনসহ অনেকেই এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে।

বাংলাদেশের একটি নাগরিক সংগঠন- বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজসম্পদ, বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মোহাম্মদ বলছিলেন, “রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে, যে দূরত্বে হচ্ছে এবং যেভাবে হচ্ছে, সেখানে পশুর নদী, সেখানকার জীব-বৈচিত্র্য, কৃষি জমি, বাতাস- সব কিছু মিলিয়ে সুন্দরবনকে রক্ষা করা যাবে না।”

Image caption পরিবেশবাদীরা বলছেন, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র হুমকির মুখে পড়বে

তিনি বলেন, “সুন্দরবনের যে প্রতিরোধ শক্তি তা নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশের মানুষের জীবনও বিপর্যস্ত হবে।”

নানা মহলের বিরোধিতা স্বত্বেও সরকার এ প্রকল্প স্থাপনে এগিয়ে যায় এবং এ বছরের ২০শে এপ্রিল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

অবশ্য শুরু থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়, তারা পরিবেশগত হুমকির কথা বিচার-বিবেচনা করেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং নিয়ম মেনেই তারা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি করছেন।

এ বছরের এপ্রিলে রামপালে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ বিষয়ে এক জনমত পর্যালোচনাও করা হয়।

তবে সুন্দরবনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশংকা থেকে যে বিরোধিতা, সে বিষয়ে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর ৫৯টি শর্ত জুড়ে দিয়ে বলেছে, তারা যেসব পদক্ষেপ নিতে বলেছে তা না নেয়া হলে ঝুঁকি থেকে যাবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান বলছেন, “মিটিগেশনের জন্যে যদি পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তাহলে ঝুঁকি আছে এবং সেটা মনিটর করার বিষয় আছে।”

তিনি বলেন, “বায়ু দূষণ, পানি দূষণ- নানা ধরনের দূষণের বিষয় আছে। প্রতিটা বিষয়ে মিটিগেশনের বিষয়টি এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সেগুলো আমরা ভেরিফাই করে দেখে ৫৯টি শর্ত দিয়েছি। এগুলো কিন্তু ছাড়পত্র না। এবং এগুলো বাস্তবায়ন না হলে আমরা ক্লিয়ারেন্স দেবো না।”

জাতিসংঘের সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা- ইউনেস্কো ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।

ইতিপূর্বে রামপাল প্রসঙ্গে প্রকাশ্যে কোন কথা না বললেও সাম্প্রতিক সময়ে প্যারিসে অবস্থিত ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার থেকে সরকারকে একটি চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে।

ইউনেস্কোর উপদেষ্টা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার বা আই-ইউ-সি-এন বাংলাদেশের প্রধান ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ বলছেন, “এ ধরনের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে, তাতে করে সুন্দরবনের ওপর বা এর জীব-বৈচিত্র্যের ওপর বা এর ইকো সিস্টেমের ওপর প্রভাব পড়বে কিনা, বা পড়লে কি ধরনের প্রভাব পড়বে তা নিয়ে ইউনেস্কো উদ্বিগ্ন।”

তিনি বলেন, “সামগ্রিকভাবে বলা হয়েছিল, যে পদক্ষেপই নেয়া হোক না কেন, সেটা যেন সুন্দরবনের কোন ক্ষতি না করে নেয়া হয়। উন্নয়নের জন্য নানা পদক্ষেপ নিতে হবে এতে দ্বিমত নেই। কিন্তু চিঠিতে বলা হয়েছিল যেহেতু সুন্দরবন একটি ইউনিক ইকো সিস্টেম সেজন্য সতর্কতামূলক যথেষ্ট ব্যবস্থা যেন নেয়া হয়।”

মি. আহমেদ জানান. সুন্দরবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমানোর বিষয়ে আইইউসিএনসহ নানা মহল থেকেই বিভিন্ন সুপারিশ রাখা হয়েছে।

কিন্তু সেই সুপারিশ কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে তা নিয়ে এখনো সংশয় থেকে যাচ্ছে।