মুঈনুদ্দীনকে নিয়ে আত্মীয়রা এখনো প্রশ্নের মুখে

চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের নাম তাঁর গ্রামের মানুষ প্রথম শুনেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর। তবে তখন তিনি পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে।

এখন সেই যুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগের বিচারের বিষয় এসেছে। তাঁর নাম আবারও আলোচনায় এসেছে গ্রামটিতে।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

ফেণী জেলার দাঁগনভূইয়ার জগৎপুর গ্রামে দাদার বাড়িতে ১৯৪৮ সালের ২৭ শে নভেম্বর জন্মগ্রহণ করলেও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের ঐ গ্রামে স্থায়ীভাবে থাকা হয়নি।

তাঁর চাচাতো ভাই জাফরউদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, তারা আত্মীয় স্বজনরা যারা এখনও গ্রামে বাস করেন, ভাই সম্পর্কে তাদের অনেক সময়ই লোকজনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

তিনি উল্লেখ করেছেন,জেনারেল এরশাদের শাসনামলে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন বাংলাদেশে এসে গ্রামটিতে গিয়ে কয়েকদিন ছিলেন, তখন তাঁর কাছে চাচাতো ভাই বা আত্মীয় স্বজনরা অভিযোগ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিলেন।

জাফরউদ্দিন চৌধুরী আরও বলছিলেন, 'সাংবাদিক শহিদুল্লাহ কায়সার আমাদের আত্মীয় হয়। সে কারণে তাঁর হত্যার ঘটনা নিয়ে আত্মীয় স্বজনরা চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি ঘটনা অস্বীকার করেছেন। এরপর আর কিছু জানতে চাইনি। কারণ বেশি প্রশ্ন করলে আত্মীয় স্বজনের মধ্যেই শত্রুতা দেখা দিতে পারে'।

Image caption বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই যুক্তরাজ্যে পালিয়ে যান চৌধুরী মুঈনুদ্দীন (বামে)। সেখানে এক অনুষ্ঠানে প্রিন্স চার্লস এর সাথে তোলা তার ছবি।

জাফরউদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা আবার বিয়ে করেছিলেন। তাঁর মায়ের সংসারে তাঁরা তিন ভাই এবং দুই বোন ছিলেন। আর সৎ মায়ের ঘরে আরও তিন ভাই এবং তিন বোন রয়েছেন।

চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের পিতা সরকারি চাকরির কারণে বিভিন্ন জায়গায় বদলি হয়েছেন এবং প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত তাঁর শিক্ষা জীবন কেটেছে নিজের এলাকার বাইরে। এরপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় পড়েছেন ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময় চৌধুরী মুঈনুদ্দীন জামায়াতের ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের অন্যতম একজন নেতা ছিলেন।

শিক্ষাজীবন শেষ করে ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের আগ মুহুর্তে অবজারভার গ্রুপের বাংলা পত্রিকা দৈনিক পূর্বদেশের জুনিয়র রিপোর্টার হয়েছিলেন।

যুদ্ধের শুরুর দিকে ঐ পত্রিকায় কিছুদিন বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন কামাল লোহানী। তিনি বলছিলেন, পূর্বদেশে যোগ দেওয়ার পরও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের ছাত্র সংঘের সাথে সম্পৃক্ততার কথা পত্রিকাটির সাংবাদিকরা সকলেই জানতেন।

মি: লোহানী উল্লেখ করেছেন, ৭১ এর ২৫ শে মার্চ পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণের পর পরই ঢাকার বাইরের খবর সংগ্রহের এ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে গিয়ে দলের কাজ করেছিলেন চৌধুরী মুঈনুদ্দীন। যে ঘটনা এখনও তিনি ভুলতে পারেন না।

তিনি বলছিলেন, “পূর্বদেশ এর তৎকালীন সম্পাদক মাহাবুবুল হকের সাথে আলোচনা করে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন নোয়াখালী অঞ্চলের পরিস্থিতির খবর সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ফিরে এসে আমার কাছে রিপোর্ট না দিয়ে সরাসরি সম্পাদকের কাছে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। সেই রিপোর্ট আর পাইনি। পরে খোজ নিয়ে জেনেছিলাম. চৌধুরী মুঈনুদ্দীন জামায়াতের কেন্দ্র থেকে টাকা নিয়ে নোয়াখালী অঞ্চলে ঐ দলের শাখাগুলোকে দিতে গিয়েছিলেন। ”

৭১এর মে মাসে পূর্বদেশ ছেড়ে কামাল লোহানী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তখন চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের সাথে তাঁর দেখা হয়নি।

কিন্তু যুদ্ধে বিজয়ের পর ২২শে ডিসেম্বর সিনিয়র সাংবাদিকরা ঢাকায় প্রেস ক্লাবে জড়ো হয়েছিলেন।

সে সময়ই তাঁরা জানতে পারেন যে, বিজয়ের দু’দিন আগে ১৪ই ডিসেম্বর চৌধুরী মুঈনুদ্দীন আল বদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক,লেখক, চিকিৎসক এবং বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে হত্যার ক্ষেত্রে সরাসরি জড়িত ছিলেন।

কামাল লোহানী বলছিলেন, চৌধুরী মুঈনুদ্দীন সম্পর্কে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ শোনার সাথে সাথেই তিনি তাদের পূর্বদেশের কার্যালয়ের পুরনো কিছু ঘটনা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলেন।

মি: লোহানী বলছিলেন, “১৭ই এপ্রিল বাংলাদেশের সরকার গঠনের অনুষ্ঠান অল ইন্ডিয়া রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল। পূর্বদেশের নিউজ রুমে আমরা সবাই তা শুনছিলাম। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সাথ সাথে কাউকে কিছু বলতে হয়নি, উপস্থিত সকলেই চিৎকার করে জয়বাংলা বলে উঠেছিল। কিন্তু সেখানে তখন চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের চোখে মুখে কোন প্রতিক্রিয়া দেখিনি। খুব ঠাণ্ডা মাথার লোক ছিলেন।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর পরই চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের খোজ পাওয়া যায়নি। তবে তখন তিনি পালিয়ে লন্ডন যান বলে পরে জানা গেছে এবং এখনও বৃটেনেই রয়েছেন।

লন্ডনে তিনি এখন ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের মুসলিম স্প্রিচুয়াল কেয়ার প্রভিশনের পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন।

পূর্ব লন্ডনে বাঙ্গালী অধ্যুষিত এলাকায় একটি মসজিদের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে তাঁর সাথে কাজ করেছেন প্রবাসী বাংলাদেশী আব্দুল মমিন কেরল।

মি: কেরল বলছিলেন, চৌধুরী মুঈনুদ্দীন লন্ডনে মুসলিম এইডের ট্রাস্টি হিসেবে রয়েছেন। আরও কয়েকটি চ্যারিটি সংগঠনের সাথেও তিনি জড়িত।

তিনি বাংলাদেশীদের নিয়ে মুসলিম কাউন্সিল গঠন করা সহ বিভিন্ন সংগঠন নিজে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এখন ছেলে মেয়ে পরিবার নিয়ে লন্ডনেই রয়েছেন। তবে, ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৮ জন বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগের বিচার প্রক্রিয়ায় চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে হাজির হওয়ার নোটিশ জারি করা হলেও তিনি তাতে সাড়া দেননি।

এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে বিচার শেষ হয়েছে। একই অভিযোগে বিচার প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আশরাফুজ্জামান খানও আদালতে হাজির হননি।

এই খবর নিয়ে আরো তথ্য