'পরিকল্পনা করেই বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছিল'

  • অমিতাভ ভট্টশালী
  • বিবিসি বাংলা, কলকাতা
ছবির ক্যাপশান,

ভেঙে ফেলার আগে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ

ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করেই, ১৯৯২ সালের ছয়ই ডিসেম্বর সেখানে জড়ো হওয়া কয়েক লক্ষ উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানুষ আকস্মিকভাবে ওই মসজিদ ধ্বংস করেন নি।

ভারতের একটি অনুসন্ধানী সংবাদ সংস্থা আজ শুক্রবার প্রকাশিত এক স্টিং অপারেশনে এই দাবি করে বলেছে যে ভারতীয় জনতা পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব, এমনকী ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমহা রাও-ও জানতেন যে সেদিন বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হবে।

অনুসন্ধানী সংবাদ সংস্থা কোবরা পোস্ট আজ প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে জানিয়েছে যে বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার জন্য রীতিমতো আত্মঘাতী দল তৈরি করা হয়েছিল, দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল আর সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে ডায়নামাইট দিয়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছিলেন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির নেতারা।

ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে যেসব হিন্দুত্ববাদী নেতা-নেত্রী বা স্বেচ্ছাসেবকদের বিরুদ্ধে, তাঁদের কথাবার্তা গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড করে কোবরাপোস্ট দাবি করেছে অনেকদিন ধরে পরিকল্পনা ছিল মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার।

কারা ওই পরিকল্পনার কথা জানতেন, কীভাবে গুজরাতে প্রশিক্ষণ শিবির হয়েছিল – সবই ধরা পড়েছে গোপন ক্যামেরায়। কোবরাপোস্ট আজ গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড করা কথোপকথোনগুলি প্রকাশ করেছে, যে স্টিং অপারেশনের নাম তারা দিয়েছে অপারেশন জনম্‌ভূমি।

অপারেশন জনম্‌ভূমি নামের প্রতিবেদন প্রকাশ করার সময়ে সংবাদ সংস্থার সম্পাদক অনিরুধ বহেল, যিনি নিজেও একজন প্রখ্যাত স্টিং অপারেশন বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক, তিনি বলেন যে বাবরি মসজিদ- রামমন্দির বিতর্ক নিয়ে একটা গবেষণাধর্মী বই লেখার কথা বলে তাঁদের সংস্থার সহযোগী সম্পাদক কে. আশীষ চার-পাঁচটি রাজ্য ঘুরে কথা বলেছেন হিন্দুত্ববাদী নেতা-নেত্রী আর স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে।

ওই স্টিং অপারেশনের ভিডিওগুলিতে এরকম ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে যে দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা কল্যাণ সিং – সবাই জানতেন যে সেদিন বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হবে। যদিও এতদিন প্রকাশ্যে বিজেপির শীর্ষ নেতারা বলে এসেছেন যে ৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বরের ঘটনা আকস্মিকভাবেই ঘটিয়েছিল উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদী জনতা।

ভারতের নির্বাচনের আগে এই প্রতিবেদন সামনে আসায় বিজেপির অভিযোগ কংগ্রেস দল এই প্রতিবেদন তৈরি করিয়েছে।

বিজেপি-র মুখপাত্র মুখতার আব্বাস নকভি বলছিলেন, “কংগ্রেস দল ষড়যন্ত্র করছে যে কীভাবে নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ আর সৌহার্দ্যের পরিবেশটা নষ্ট করা যায়। বিষ ছড়ানোর চেষ্টা করছে তারা। বাবরি মসজিদ রাম জন্মভূমির মতো একটা অতি সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে স্টিং অপারেশন করানো হয়েছে।“

বিজেপি নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছেন যাতে ওই স্টিং অপারেশনের ভিডিও প্রচার-প্রসার না করতে দেওয়া হয়, নাহলে ভোটের আগে সাম্প্রদায়িক অশান্তি তৈরি হতে পারে বলে মনে করে বিজেপি।

অন্যদিকে কংগ্রেস এই প্রতিবেদনের জন্য বিজেপি-র দিকেই আঙ্গুল তুলে বলছে যে ভোটের আগে এধরনের প্রতিবেদনের মাধ্যমে সেই পুরনো মন্দির-মসজিদ বিবাদকে ফের তুলে এনে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা হচ্ছে।

দলের মুখপাত্র মীম আফজল সাংবাদিকদের বলছিলেন, “বাবরি মসজিদ রাম মন্দিরের মতো বিষয় নির্বাচনের আগে ওঠানোর অর্থই হল ওই ইস্যুগুলোকে আবারও বাঁচিয়ে তোলা, পুরনো ক্ষত আবারও নতুন করে খুঁচিয়ে দেওয়া। আর সেভাবেই ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা হচ্ছে ভোটের আগে।“

উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যাতে ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বাবরি মসজিকে ঘিরে অনেক দশক ধরেই বিতর্ক চলছিল, হয়েছে বহু মামলা মকদ্দমাও।

হিন্দুদের একটা অংশ বিশ্বাস করেন, যে জায়গায় মোগল সম্রাটরা বাবরি মসজিদ বানিয়েছিলেন, সেটাই হিন্দুদের আরাধ্য ভগবান রামচন্দ্রের জন্মস্থান। সেই মন্দির ভেঙ্গেই মসজিদ তৈরি হয়েছিল।

আশির দশকের শেষ দিক থেকে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ওই মসজিদ ভেঙ্গে রামমন্দির তৈরি করার দাবিকে একটা রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত করেন, যার মধ্যেই কয়েক লক্ষ উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদী জনতা ৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয় বাবরি মসজিদ। আর তার পরেই ভারত জুড়ে চলেছিল দাঙ্গা, যাতে প্রায় দু হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।