সিরিয়ার জঙ্গীদের লড়াইয়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি জিহাদি

ছবির কপিরাইট BBC World Service
Image caption ব্রিটেন থেকে অন্তত পাঁচশো মুসলিম তরুণ সিরিয়ায় লড়াই করছে বলে ধারণা করা হয়।

ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের শহর পোর্টসমাউথ। গত বছরের নভেম্বরে হঠাৎ এই শহরের ছোট্ট বাংলাদেশি কমিউনিটি চলে এলো ব্রিটিশ গণমাধ্যমের স্পটলাইটে।

হঠাৎ কাউকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে নিখোঁজ ২৩ বছরের এক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ইফতেখার জামান। তারপর একদিন টেলিভিশন রিপোর্টে জানা গেল, সিরিয়ায় গিয়ে এক বিদ্রোহী গোষ্ঠির হয়ে লড়াই করছে এই তরুণ।

সিরিয়া থেকেই স্কাইপে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইফতেখার জামান সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেন সিরিয়ার জঙ্গী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইসিসে যোগ দেয়ার কারণ।

সাক্ষাৎকারে ইফতেখার জামান বলেন, এই পার্থিব জীবন কিছুই নয়, পরের জীবনটাই আসল। এই লড়াইয়ে জীবন দেয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে তিনি বলেন, আল্লাহর পথে জীবন দিলেই চিরকালের জন্য বেহেশতে যাওয়া যায়।

Image caption সিরিয়ার লড়াইয়ে নিহত প্রথম ব্রিটিশ-বাংলাদেশি জিহাদি ইফতেখার জামান (হলুদ টি-শার্ট পরিহিত)

বিবিসিতে এই সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার কয়েকমাসের মধ্যেই খবর আসে ইফতেখার জামান সিরিয়ার যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। পোর্টসমাউথের বাংলাদেশি সম্প্রদায় রীতিমত স্তম্ভিত।

মাসখানেক আগে ব্রিটিশ টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেল আরেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণকে।

ইফতেখার জামানের মতোই একইভাবে সিরিয়ায় গিয়ে কট্টরপন্থী সুন্নী জঙ্গী গোষ্ঠী আইসিসে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত এই তরুণ আবদুল রাকিব সুমন।

তার জন্ম স্কটল্যান্ডের এবারডীন শহরে, বেড়ে উঠেছেন সেখানেই। ইউটিউবে আপলোড করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, আবদুল রাকিব সুমন অন্য মুসলিম তরুণদেরও তার ভাষায় ‘জিহাদে’ যোগ দিতে উৎসাহিত করছেন।

বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ

ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের মধ্যে সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় কি ধরণের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হচ্ছে? এ নিয়ে কতোটা উদ্বিগ্ন এখানকার বাংলাদেশি সম্প্রদায়?

“আমরা যখন জানতে পারলাম যে সিরিয়া থেকে চার-পাঁচটা ছেলে সিরিয়া চলে গেছে সেখানকার বিদ্রোহীদের সাহায্য করার জন্য, তখন আমরা খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ি। আমরা বুঝতে পারছিলাম না কোত্থেকে কি হয়ে গেল,”, বলছিলেন পোর্টসমাউথের বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের একজন মুখপাত্র এবং বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আবু শোয়েব তানজাম।

পোর্টসমাউথ থেকে ইফতেখার জামানের পথ ধরে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি তরুণ সিরিয়ায় লড়াই করতে যায়। এদের বেশ কয়েকজনকে ছোট বেলা থেকেই চেনেন আবু শোয়েব তানজাম।

“ওরা আমাদের মসজিদে নামাজ পড়তে আসতো। ছোটবেলায় ওদের আমি বাংলা স্কুলে বাংলা পড়িয়েছি। ইফতেখার জামানই সম্ভবত সিরিয়া গিয়ে সেখান থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ করে অন্যদের সেখানে যেতে উৎসাহিত করে।”

“আমরা যখন জানলাম, শুনলাম যে এরা সিরিয়ায় গেছে, আমরা একটা বড় ধাক্কা খেয়েছি। এদের মা-বাবাও খুব মর্মাহত। তারা জানতেনই না যে এ ধরণের কাজে তাদের ছেলেরা জড়িয়ে পড়েছে।”

সপ্তাহখানেক আগে পোর্টসমাউথের আরেকটি বাংলাদেশি পরিবারের জন্য সিরিয়া থেকে এসেছে আরেক দুঃসংবাদ। হামিদুর রহমান নামে আরেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ সেখানে যুদ্ধে মারা গেছে।

জঙ্গীবাদের ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আরও অনেক ব্রিটিশ মুসলিম তরুণকে জঙ্গীবাদের দিকে ঠেলে দেবে বলে আশংকা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দফতর দশ নম্বর ডাউনিং স্ট্রীটের সামনে ইসরাইল বিরোধী বিক্ষোভে যোগ দিতে এসেছিলেন অনেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ। তাদের একজন বার্মিংহ্যাম থেকে আসা আবদুল মুমিথ।

“যদি বিশ্বের পরিস্থিতিটা এরকমই থাকে, সিরিয়া, মিশর, ফিলিস্তিনে যদি মুসলিমরা মারা যেতে থাকে, আমার মনে হয় ব্রিটিশ মুসলিমরা আরও বেশি সংখ্যায় কট্টপন্থার দিকে ঝুঁকবে। এদের অনেকেই সেখানে লড়াই করতে যাবে। যদিও আমরা নিরীহ মানুষ হত্যার নিন্দা করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল, এটা ঘটবেই। অনেক তরুণই ঐ পথে যাবে।”

তরুণরা জঙ্গীবাদের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে, এমন আশংকা রয়েছে অভিভাবকদের মধ্যেও। বাংলাদেশি অধ্যূষিত হোয়াইট চ্যাপেল ঈস্ট লন্ডন মসজিদের সামনে কথা হচ্ছিল কয়েকজনের সঙ্গে।

এভাবে ছেলেরা সিরিয়ায় যুদ্ধ করতে যাচ্ছে শুনে আমাদের মনেও একটা দুশ্চিন্তা কাজ করে। এভাবে সেখানে লড়াই করতে যাওয়া ঠিক না,” বলছিলেন একজন।

Image caption ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণরা জঙ্গীবাদের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে আশংকা বাড়ছে

ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের মধ্যে উগ্রবাদী মতাদর্শের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন মুসলিম নেতারা। মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল এবং সংগঠনের একজন উপদেষ্টা মোহাম্মদ আবদুল বারি বললেন, ঠিক কতজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সিরিয়ায় গেছে তার সঠিক তথ্য তাদের কাছে নেই। কিন্তু পত্রপত্রিকার রিপোর্ট থেকে তারা জানতে পেরেছেন কয়েকজন সিরিয়ার লড়াইয়ে নিহত হয়েছে, দু-একজন ফিরে আসার সময় বিমান বন্দরে ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থার হাতে গ্রেফতার হয়েছে।

এটা খুবই উদ্বেগজনক। শুধু বাংলাদেশি বাবা-মাদের জন্য নয়, পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য উদ্বেগজনক। এটা প্রতিহত করা দরকার।”

জঙ্গীবাদের মোকাবেলা

তরুণদের জঙ্গী মতাদর্শ থেকে দূরে রাখতে ব্রিটেনে মুসলিম নেতারা নানা ধরণের উদ্যোগ নিয়েছেন। একশ জন ইমাম এক যুক্ত বিবৃতিতে এ ধরণের জঙ্গী সংগঠনগুলোর তৎপরতার নিন্দা করে এ থেকে দূরে থাকার জন্য মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

সন্ত্রাসাবাদের সঙ্গে জড়িত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ব্রিটেনের অনেক মসজিদ ইমামরা শুক্রবারের নামাজে বিশেষ খোৎবাও দিচ্ছেন। কিছু কিছু ইসলামিক স্কুল এবং মাদ্রাসায় বিশেষ কর্মসূচিও নেয়া হয়েছে।

পূর্ব লন্ডনের শ্যাডওয়েলের এরকম একটি ইসলামিক স্কুল, জামিয়াতুল উলামা সিক্সথ ফর্ম কলেজে।

বিকেলে স্কুল প্রাঙ্গনে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল শেখ আবদুর রহমান মাদানি।

এখানকার ছাত্র-ছাত্রীদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত।

শেখ আবদুর রহমান মাদানি বলছিলেন, জঙ্গী মতাদর্শের বিপদ সম্পর্কে তারা খুবই সচেতন।

“আমাদের ছেলে-মেয়েরা যেন এ ধরণের কাজে না যায়, সেজন্যে আমরা বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছি। এখানে নানা ধরণের আলোচনা, ওয়ার্কশপের মাধ্যমে আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি যেন তারা সহিংসতার পথে না যায়।”

(সিরিয়ায় লড়াই করতে যাওয়া ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের নিয়ে দুই পর্বের বিশেষ প্রতিবেদন শুনতে নীচের দুটি অডিও আইকনে ক্লিক করুন। প্রতিবেদনটি পরিবেশন করেছেন বিবিসি বাংলার মোয়াজ্জেম হোসেন)

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না