ভারতে বিজেপির ভয়, 'লাভ জিহাদ'

প্রাক নির্বাচনী সাম্প্রদায়িক উষ্ণতা। ছবির কপিরাইট Getty
Image caption প্রাক নির্বাচনী সাম্প্রদায়িক উষ্ণতা।

ভারতের উত্তরপ্রদেশে মুসলিম তরুণরা জোর করে হিন্দু মেয়েদের ধর্মান্তরিত করে তাদের বিয়ে করছে বা কিংবা শ্লীলতাহানি করছে – এই ধরনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে।

বিজেপি নেতারা এই কথিত প্রচেষ্টার নাম দিয়েছেন 'লাভ জিহাদ'। ওই রাজ্যে তাদের সদ্যসমাপ্ত রাজনৈতিক অধিবেশনে এই জিহাদ কীভাবে ঠেকানো যায়, তা নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা হয়েছে।

ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি গত বেশ কয়েকমাস ধরেই অগ্নিগর্ভ হয়ে রয়েছে, আর তাতে এখন নতুন করে ইন্ধন জোগাচ্ছে লাভ জিহাদের অভিযোগ।

মীরাটে এ মাসের গোড়ায় এক হিন্দু মাদ্রাসা শিক্ষিকাকে জোর করে ধর্মান্তরিত করে ধর্ষণ করা হয়েছে, এই অভিযোগ ওঠার পর থেকেই 'লাভ জিহাদ' শব্দটি ব্যবহার শুরু করেছেন বিজেপি ও তাদের ঘনিষ্ঠ হিন্দু সংগঠনের নেতারা।

তারা বলছেন, রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর পেছনে মেয়েদের শ্লীলতাহানি একটা বড় কারণ। আর এর ৯০% ক্ষেত্রে মুসলিম যুবকরাই দায়ী।

বৃন্দাবনে এই সপ্তাহান্তে বিজেপির অধিবেশনে এই লাভ জিহাদ ঠেকানো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে, তবে মিডিয়ায় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় দলীয় প্রস্তাবে ওই শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয়নি।

ছবির কপিরাইট
Image caption ভারতে মুসলমানদের ঈদের জামাত

বিজেপি এমপি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের ছেলে রাজবীর সিং বৈঠকের শেষে দাবি করেন, লাভ জিহাদ নামটা বিজেপি-র তৈরি নয়। তবে নাম যাই হোক, মুসলিমদের হাতে হিন্দু তরুণীরা যে নির্যাতিতা বা ধর্ষিতা হচ্ছেন তাতে কোনও ভুল নেই এবং এটা ঠেকাতে বিজেপি পরিকল্পনাও তৈরি করছে। তবে কেউ যদি স্বেচ্ছায় কারও সঙ্গে সম্পর্ক গড়েন, আমাদের কিছু বলার নেই।

রাজ্যের মুসলিম নেতারা বিজেপি-র এই অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, মেয়েদের সুরক্ষা বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা অবশ্যই জরুরি। কিন্ত তাতে সাম্প্রদায়িক রং দেওয়ার চেষ্টাটা আগুন নিয়ে খেলা ছাড়া আর কিছু নয়।

সাবেক রাজনীতিক ও নঈদুনিয়া পত্রিকার সম্পাদক শাহিদ সিদ্দিকি বিজেপিকে সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, ''বিজেপি উন্নয়নের শ্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসে এখন এই সব আজেবাজে কথা বলে সমাজকে বিভক্ত করতে চাইছে। এটা মারাত্মক বিপজ্জনক। 'লাভ' আর 'জিহাদ' - দুটো শব্দেরই অপব্যাখ্যা করছে তারা।''

''মুজফফরনগরের দাঙ্গায় কত নারী তো ধর্ষিতা হয়েছিলেন, কেউ তাতে গ্রেফতার হয়নি। কই বিজেপি তখন তো তার প্রতিবাদ করেনি?''

ব্যাপক হারে হিন্দু মেয়েদের ধর্মান্তর করা হচ্ছে, এমন অভিযোগও নাকচ করে দিয়ে উত্তরপ্রদেশ মাদ্রাসা বোর্ডের অধ্যক্ষ কাজী জৈনুল সাজিদিন বিবিসিকে বলেন, কেবলমাত্র একটা ছাড়া এরকম আর কোনও ঘটনা কোথাও ঘটেছে বলে তাদের জানা নেই। আর ওই একটা ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় তা করা হয়েছে।

Image caption ইউপিতে ক্ষমতায় থাকার সময় বিজেপি অসবর্ণ বিয়েতে উৎসাহ দিয়েছে।

''সত্যিই যদি তেমন হত, শত শত হিন্দু মেয়েরা তো মাদ্রাসায় পড়ে, তারা সবাই মুসলিম হয়ে যেত। কই, তেমনটা তো হয়নি?''

বিজেপি-বিরোধী দলগুলো বলছে, উত্তরপ্রদেশে আগামী মাসে ১২টি আসনের উপনির্বাচন ও আড়াই বছর বাদে বিধানসভা নির্বাচনের দিকে চোখ রেখেই বিজেপি রাজ্যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। লাভ জিহাদ তার উপলক্ষ মাত্র।

রাজ্যে ক্ষমতায় থাকাকালীন বিজেপি নিজেরাই যে ভিন্ন জাতপাতের মধ্যে বিয়েতে উৎসাহ দিয়েছিল, তা মনে করিয়ে দিচ্ছেন বর্তমান শাসক দল সমাজবাদী পার্টির নেতা নরেশ আগরওয়াল।

তিনি বিজেপিকে প্রশ্ন করছেন, তাদের সরকারই কিন্তু এই ধরনের বিয়েতে বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার রেওয়াজ চালু করেছিল, যা রাজ্যে আজও বহাল আছে। তাহলে তখন কি সেটা লাভ জিহাদ ছিল না?

এই তীব্র আক্রমণের মুখেও বিজেপি নেতারা অবশ্য হিন্দু মেয়েদের ধর্ম ও সম্মান রক্ষার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন বলেই অঙ্গীকার করছেন, যদিও লাভ জিহাদ শব্দবন্ধটি এখন একটু রেখেঢেকেই ব্যবহার করা হচ্ছে।

নিন্দুকরা অবশ্য বলছেন, বিজেপি-র দুই প্রধান মুসলিম নেতা মুখতার আব্বাস নাকভি ও সৈয়দ শাহনওয়াজ হুসেন দুজনের স্ত্রীই হিন্দু; তাহলে তাদেরও কি লাভ-জিহাদি বলা যাবে?

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর