সংবিধান সংশোধনে তড়িঘড়ি হচ্ছে: কামাল হোসেন

Image caption সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে বিতর্ক হলো সংলাপের এবারের পর্বে।
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী ড: কামাল হোসেন বলেছেন সংসদকে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা দিতে সুপারসনিক গতিতে সংবিধান সংশোধন করা হচ্ছে।

তবে ক্ষমতাসীন দলের একজন নেতা বলেছেন সংবিধান সংশোধনে কিছুটা তড়িঘড়ি হলেও আইন পাশের আগে আলোচনা করা হবে।

অন্যদিকে বিএনপির একজন নেতা বলেছেন সংসদকে অভিশংসনের ক্ষমতা দিলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চিরতরে বিদায় নেবে।

শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে সংলাপের এ পর্বে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সমস্যা এবং রেল লাইনে দুর্ঘটনার মতো বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসে।

সংলাপের এ পর্বে কামাল হোসেনের সাথে আরও আলোচক ছিলেন সাবেক আইনমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মতিন খসরু, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন।

অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন ফেরদৌসী খানম রোজী।

তার প্রশ্ন ছিল ‘আপনারা কি আমার সাথে একমত হবে যে যে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী এই বিলটি পাশ হলে গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও বেশি সুরক্ষিত থাকবে ?’

প্রসঙ্গত বাংলাদেশে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে দিতে উত্থাপিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিলটি এখন পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় কমিটিতে রয়েছে।

জবাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়ন কমিটির নেতৃত্ব দেয়া ড: কামাল হোসেন বলেন গত ৪০ বছরে দেখা গেছে সংসদে সবকিছুই দলীয় ভিত্তিতে হয়।

তিনি মনে করেন সংসদ নিরপেক্ষ ভাবে বিচার করতে সক্ষম এমন আস্থা এখন জনমনে তৈরি হয়নি। তাই তড়িঘড়ি না করে সংবিধানের এ সংশোধনী পাশের আগে আরও আলোচনা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

মিস্টার হোসেন বলেন, “ যে কোন দলই আসুক না কেন সে ধরনের পার্লামেন্টারি পারফরমেন্স কারও কাছে পাওয়া যায়নি। সংসদ কি নিরপেক্ষভাবে বিচার করার ব্যাপারে আমাদের আস্থা অর্জন করেছে গত ৪২ বছরে ?”

তিনি আরও বলেন, “এখানে যে আইন হবে সেটার খসড়াও নেই। কি হবে কেউ জানেনা। এখন কেন তড়িঘড়ি করে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে ? সুপারসনিক গতিতে কেন পাশ করার চেষ্টা চলছে ?”

সাবেক আইনমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মতিন খসরু বলেন সংবিধান সংশোধনে কিছুটা তড়িঘড়ির বিষয়টিতে একমত পোষণ করেন।

তবে তিনি বলেন ড: কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিটি সংবিধানে বিচারপতিদের অপসারণের বিষয়ে যে বিধান রেখেছিল প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সেটিই ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

মিস্টার খসরু বলেন, “ এমন আইন করবো যে তদন্ত করে উনি অসদাচরণ করেছেন কি না তা তদন্ত করবেন বিচারকরাই। এখানে সংসদ কিছু না। সংসদ শুধু অনুমোদন দেবে। চেক-ডবল চেক আছে। তিনজন বিচারকের তদন্ত কমিটি বিচারকের বক্তব্য শুনবেন। আত্মরক্ষার অধিকার থাকবে।”

সংসদকে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা দেয়ার তীব্র সমালোচনা করেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন বিচারপতিদের অভিশংসনের বিষয়টি আওয়ামী লীগই সংসদ থেকে রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দিয়েছিলো।

তিনি বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কতটুকু অবশিষ্ট আছে আমার জানা নেই। কিছু থাকলেও এর মাধ্যমে চিরতরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে বিদায় দেয়া হচ্ছে। আমরা দেখেছি গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে কি হয়েছে। বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও তাই হবে।”

মিস্টার চৌধুরী বলেন বিচারপতিদের অভিশংসনের বিষয়টি সংসদের হাত থেকে আওয়ামী লীগই রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দিয়েছিলো।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন বলেন প্রস্তাবিত সংশোধনী গৃহীত হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে।

তিনি বলেন, “সংসদ তো ৩৫০ জনের মত নিবেনা। সংসদে কেউ কি বিকল্প কথা বলতে পারবে ? বিকল্প ভোট দিতে পারবে ? ঘুরে ফিরে যেখানে এক ব্যক্তির শাসনের দিকে গণতন্ত্র অবশেষে স্থান করে নিচ্ছে সেখানে সংসদ বললে তো হবেনা। মানুষ এখানে ভয় পাচ্ছে।”

একজন দর্শক বলেন, “সংসদের হাতে দেয়া যেত কিন্তু সেই সময় আসেনি। কারণ আমরা এখনো তেমন গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা অর্জন করিনি।”

আরেকজন দর্শক বলেন, “সাংসদরা অনেকে অপরাধের সাথে জড়িত বলে খবর প্রকাশ হচ্ছে। এখন এ ক্ষমতা পেলে তো অনেক বিষয়েই পার পেয়ে যাবে।”

গণতন্ত্রে সংকটের সম্ভাবনা প্রসঙ্গ

সালেম রহমান জানতে চান আপাত দৃষ্টিতে একদিকে আওয়ামী লীগের জনসম্পৃক্ততা কমে যাওয়া, অন্যদিকে বিএনপি দুর্বল হয়ে পড়ার ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রক্রিয়ায় কি কোন সংকট দেখা দিতে পারে ?

নাসিম আখতার হোসাইন বলেন, “দুটি দলই জনসম্পৃক্ততা হারিয়েছে। বিরোধী দল যে গণতন্ত্রের জন্য যে অপরিহার্য সেটিও আর দাঁড়াতে পারছেনা। কিন্তু জনগণ কোন কৌশলে যাবে। তাদের হাতে কোন বিকল্প নেই। তাই বদল করে তারা মাঝে মধ্যে একটু রেহাই পেতে চায়।”

আব্দুল মতিন খসরু বলেন , “বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুর্বল হলে গণতন্ত্র দুর্বল হবে। তাই দলগুলোকে শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।”

আমির খসরু মাহমুদ বলেন, “দু দলের মধ্যে এবং রাজনীতিতে অনেক দুর্বলতা আছে। কিন্তু বড় দুর্বলতা হচ্ছে গণতন্ত্রে। জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে।”

কামাল হোসেন বলেন, “নির্বাচন পদ্ধতি নষ্ট হয়ে গেছে। মনোনয়ন বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলো এসেছে। জনগণ আজ কেন অসহায় বোধ করছে।”

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ

মিনার্ভা সূতার জানতে চান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ১২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিয়েছে। এ ধরণের পরামর্শ না দিয়ে কর্তৃপক্ষের কি উচিত নয় এসব বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া ?

জবাবে আব্দুল মতিন খসরু এমপি বলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন দায়িত্ব পালন করতে পারছেনা বলেই এমনটি হচ্ছে।

এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও মঞ্জুরি কমিশনকে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন আইনের শাসনের অভাবেই এসব ঘটনা ঘটছে।

দলীয় করণের পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রে যথাযথ মনিটরিং না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

নাসিম আখতার হোসাইন বলেন, “রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ন্ত্রণ রাখা এগুলোর উপর। যেগুলো সঠিকভাবে চলছেনা সেগুলোকে শুদ্ধ করা উচিত কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন রয়েছে।”

একজন দর্শক বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলে আমরা যারা সেখানে পড়ি তাদের কি হবে ?”

ড: কামাল হোসেন বলেন, “রেগুলেশন কেন হচ্ছেনা ? মঞ্জুরি কমিশন আছে, আইন আছে তাহলে কেন হচ্ছেনা? আইনের ঘাটতি নেই, প্রয়োগের ঘাটতি আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়।”

রেলওয়ের জায়গায় দুর্ঘটনা প্রসঙ্গ

আউয়ালুল আজম খান জানতে চান অবৈধভাবে দখল করা রেলওয়ের জায়গায় দুর্ঘটনা এবং মৃত্যু – এসবের জন্য দায় কার ?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “সার্বিকভাবে আইনের শাসন না থাকলে তার প্রতিফলন সব জায়গায় ঘটে। অগণতান্ত্রিক ভাবে শাসনের কারণে কাউকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেনা।”

আব্দুল মতিন খসরু বলেন, “রেললাইনে বস্তি দীর্ঘদিন করে আছে। মন্ত্রণালয় ও সরকারের দায়িত্ব বিকল্প ব্যবস্থা করে বস্তিগুলো সরানো উচিত।”

Image caption একজন দর্শক

নাসিম আখতার হোসাইন বলেন, “দরিদ্রতাকে পূঁজি করে কিছু মানুষ ব্যবসা ফেঁদে বসেছে এক শ্রেণীর মানুষ। কারা পৃষ্ঠপোষক ?

ড: কামাল হোসেন বলেন, “রেলওয়ে বস্তির বিষয়ে আইনের আশ্রয় আমাদের নিতে হয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থা হয়না কেন?নাগরিকদের সক্রিয় হয়ে চাপ সৃষ্টি করতে হবে।”

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:

Your contact details
Disclaimer

এই খবর নিয়ে আরো তথ্য