সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড, জামায়াতের হরতাল

Image caption আমৃত্যু কারাগারে থাকতে হবে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতের ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে।

বুধবার সকালে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এই রায় দিয়েছেন।

এদিকে এ্বই রায়ের প্রতিবাদে বৃহস্পতি ও রোববার সারাদেশে মোট ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে জামায়াতে ইসলামী।

এক বিবৃতিতে সংগঠনটি মি. সাঈদীর মুক্তি দাবি করেছে।

অপরদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আন্দোলনকারী গণজাগরণের মঞ্চ এই মি. সাঈদীর ফাঁসি দাবি করেছে।

আপিল বিভাগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মি. সাঈদীর মৃতুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শেষ হওয়ার পর পাঁচমাস ধরে রায়ের জন্য অপেক্ষমান ছিল।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এই রায় দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

রায়ের পর বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ''একজন ব্যক্তি, সরকারের সদস্য ও নাগরিক হিসাবে যেকোন রায়ের প্রতিই আমি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু মানবতাবিরোধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি আমরা আশা করি, সেটা না হওয়ায় আমি মর্মাহত।''

ছবির কপিরাইট Focus Bangla
Image caption চাপাইনবাবগঞ্জে পুলিশের সাথে জামায়াত সমথর্কদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়েছে

রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, ''মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখাটাই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেটা রাখা হয়নি বলে আমাদের খারাপ লাগছে।''

রায়ের পর ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেছেন, “আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাইনি। হাতে পেলে বুঝতে পারব কোন কোন জায়গায় আরো তথ্য প্রমাণ প্রয়োজন ছিল। সর্বোচ্চ শাস্তি আমাদের প্রত্যাশিত ছিল। তবে আমরা আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।”

মি. সাঈদীর আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেছেন, ''আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট নই। আমরা খালাস আশা করেছিলাম। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পরে আমরা রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন করবো।''

মি. সাঈদীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেছিলো গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর নিয়মানুযায়ী আপিল করেছিলো বাদী ও বিবাদী পক্ষ।

আপিলে তিনটি মামলায় মি. সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের দিয়েছেন আদালত। এগুলোর মধ্যে আছে বিসাবালিকে হত্যার, তিন নারীকে অহপরণ করে আটকে রেখে ধর্ষণ এবং প্রভাব খাটিয়ে ১০০ থেকে ১৫০ জন সনাতন ধর্মাবলম্বীকে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ।

একটি অভিযোগে ১২ বছরের কারাদণ্ড, অপর একটি অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তিনটি অভিযোগ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে তাঁকে খালাস দেয়া হয়েছে।

রায়ের পর বিক্ষোভ আর সংঘর্ষ

এদিকে রায়ের প্রতিবাদে ঢাকা, রাজশাহী এবং সিলেটে বিক্ষোভ আর পুলিশের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

রায়ের আগে থেকেই শাহবাগে অবস্থান নেয় গণজাগরণ মঞ্চ। তারা রায়ের পর বিক্ষোভ করতে শুরু করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, গরম পানি নিক্ষেপ করে তাদের সরিয়ে দেয়।

এ সময় মঞ্চের কয়েকজন কর্মীও আহত হন।

এছাড়া রায়ের বিপক্ষে জামায়াত সমথর্করা রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, চাপাইনবাবগঞ্জে আর সিলেটে বিক্ষোভ করেছে।

তারা পুলিশের উপর ইটপাটকেল ছুড়লে পাল্টা লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস আর ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশ।

এসব স্থান থেকে কয়েকজনকে আটক করেছে।

পাঁচ মাস অপেক্ষমান থেকে রায়

চলতি বছরের ১৫ই এপ্রিল দু'পক্ষেরই আপিলের শুনানি শেষ হওয়ার পর ১৬ই এপ্রিল মি. সাঈদীর দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা আপিলের রায় অপেক্ষমাণ রাখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর পাঁচ মাস পর বিষয়টি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় এলো।

ছবির কপিরাইট Focus Bangla
Image caption শাহবাগে অবস্থান নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ

আপিল বেঞ্চের বাকি চার সদস্য বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী রায় ঘোষণার সময় এজলাসে উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে ২০১০ সালের ২৯শে জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে একটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিলো জামায়াতে ইসলামির সাবেক সংসদ সদস্য মি. সাঈদীকে।

এরপর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পিরোজপুরে হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ২০১১ সালের ১৪ই জুলাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এবং একই বছর অক্টোবরে তার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

এরপর গত বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি মৃত্যু দণ্ডাদেশ দিয়ে রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে আনা ২০টি অভিযোগের মধ্যে আটটিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। এর মধ্যে একাত্তরে দুটি হত্যাকাণ্ডের দায়ে আলাদা দুটি অভিযোগে তাঁকে সর্বোচ্চ সাজা দেয়া হয়।

ঐ সাজা থেকে অব্যাহতি চেয়ে আপিল করেছিলেন জামায়াতের এই নেতা। আর রাষ্ট্র পক্ষ বাকি ছয়টি অভিযোগে সাজা চেয়ে আপিল করে, যেগুলোতে দোষী সাব্যস্ত হলেও ট্রাইব্যুনাল সাজা দেয়নি।

এর আগে ট্রাইব্যুনালে মি. সাঈদীর মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরপর সারা দেশে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী তখন সংঘাতে ৩৭ জন নিহত হয়েছে। যদিও জামায়াতে ইসলামী দাবি করেছিল নিহতের সংখ্যা ৭৫ জনের মতো।

এবার সে বিষয়টিকে বিবেচনা নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বা ডিএমপি। সংস্থাটির মুখপাত্র মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন, পরিস্থিতির আলোকেই প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রায়ের আগেই সুপ্রিম কোর্টের চারদিকে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। এছাড়া ঢাকার সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

এই খবর নিয়ে আরো তথ্য