চীন ভারতে ২০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে

  • শুভজ্যোতি ঘোষ
  • বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ছবির ক্যাপশান,

গুজারাটের সবরমতি আশ্রমে চীনের প্রেসিডেন্ট এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

ভারত সফররত চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগামী পাঁচ বছরে ভারতে অন্তত ২০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছেন।

প্রেসিডেন্ট শি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে দুদেশের মধ্যে অনেকগুলি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার আওতায় চীন ভারতে একাধিক শিল্পপার্ক গড়ে তুলবে, লগ্নি করবে রেলের উন্নয়নেও।

দুই নেতারা যখন এই সব সহযোগিতার কথা ঘোষণা করছেন ঠিক তখনই অবশ্য লাদাখে ভারতীয় ভূখন্ডে চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ উঠেছে। এবং দুই নেতাই স্বীকার করেছেন দু'দেশের সীমান্ত সঠিকভাবে নিরূপণের প্রয়োজন আছে।

দেং শিয়াওপিংয়ের পরে যাকে চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনে করা হয়, সেই শি জিনপিং-কে ভারতে অভ্যর্থনা জানাতে উৎসাহ আর আতিথেয়তার কোনও কার্পণ্য করেনি নরেন্দ্র মোদী সরকার।

প্রেসিডেন্ট শি বুধবার ভারত সফর শুরু করেছেন গুজরাটের রাজধানী আহমেদাবাদ থেকে। হোটেলে তাঁকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে। আর রাতে ১০০ পদের গুজরাটি খানায় তারা দুজনে নৈশভোজ সারেন সবরমতীর নদীতীরে।

ছবির ক্যাপশান,

এই সীমান্তকে ঘিরে ১৯৬২ সালে ভারত আর চীনের মধ্যে একটি স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধ হয়।

তারপর বৃহস্পতিবার দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে দুজনের বৈঠক নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় গড়িয়ে দেড় ঘন্টা ধরে চলেছে।

বৈঠকের শেষে প্রেসিডেন্ট শি জানিয়েছেন, চীন ও ভারত যদি এক সুরে কথা বলতে পারে তাহলে সারা দুনিয়া সে দিকে ঘুরে তাকাতে বাধ্য। চীন ও ভারতের সহযোগিতার ভিত যে হবে অর্থনীতি, সেটাও তিনি স্পষ্ট করে দেন। প্রেসিডেন্ট শি বলেন, চীন ও ভারত উভয়েই হল উদীয়মান বাজার।

''আমাদের দুই অর্থনীতির মধ্যেই অনেক মিল, সেই সঙ্গে আমাদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সম্ভাবনা যেমন বিপুল, প্রয়োজনও তেমনি সাঙ্ঘাতিক। আমাদের অর্থনীতির সাদৃশ্যগুলোকে কাজে লাগিয়ে সহযোগিতার সেই ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করাটা খুব জরুরি।''

এই সহযোগিতার প্রথম ধাপেই চীন ভারতে আগামী পাঁচ বছরে ২০০০ কোটি ডলার লগ্নি করার কথা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে আছে গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে দুটি আলাদা শিল্পপার্ক স্থাপন, যেখানে তৈরি হবে যথাক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সংক্রান্ত এবং কৃষিসংক্রান্ত সরঞ্জাম।

তা ছাড়া ভারতীয় রেলের মান্ধাতার আমলের অবকাঠামোর উন্নতি ঘটিয়ে হাইস্পিড ট্রেন চালু করা বা রেলস্টেশনগুলিকে আধুনিক করে তোলার ক্ষেত্রেও বিপুল বিনিয়োগ করবে চীন। উল্টোদিকে ভারতও চেয়েছে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতি, আর চীনের বাজারে প্রবেশ করার সুযোগ।

প্রধানমন্ত্রী মোদী বলছিলেন, ''আমাদের দুদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিন্তু সম্ভাবনার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি। আমাদের মধ্যে যে বাণিজ্য ঘাটতি বিরাট সে ব্যাপারেও আমি উদ্বেগ জানিয়েছি।''

ছবির ক্যাপশান,

ভারত ও চীনের প্রতীক

''সেই সঙ্গেই প্রেসিডেন্ট শি-কে আমি অনুরোধ করেছি, ভারতীয় কোম্পানিগুলি যাতে সহজে চীনের বাজারে ঢুকতে পারে ও তাদের পণ্য বেচতে পারে তা আপনি দেখুন।''

নরেন্দ্র মোদী আর শি জিনপিংয়ের বৈঠক নতুন আশা সঞ্চার করেছে দুদেশের বাণিজ্যিক মহলেও। কারণ পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণে গত বেশ কিছুদিন ধরেই একটা স্থবিরতা চলছিল।

ভারতের মাহিন্দ্রা শিল্পগোষ্ঠীর কর্ণধার আনন্দ মাহিন্দ্রা কিন্তু এখন সরাসরি বলছেন, দুদেশের যৌথ সহযোগিতা নিয়ে উৎসাহিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

তার কথায়, ''যুগ্মভাবে ভারত ও চীনের জিডিপি বিশ্ব অর্থনীতির একটা বিরাট অংশ হয়ে উঠতে পারে, সেই সম্ভাবনা কিন্তু প্রবল। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি সেই সম্ভাবনারই রূপায়ন দেখার আশা করছি। ভূরাজনৈতিকভাবেও এই দুই দেশ যদি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে তাহলে বিশ্বের বহু সমস্যার সমাধানেও তারা দারুণ প্রভাব ফেলতে পারে।''

প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রেসিডেন্ট শি-র বৈঠক সেই সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে কি না, তা দেখার জন্য অবশ্য আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে আশার কথা হল, অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত মজবুত করার পাশাপাশি তারা দুই দেশের অমীমাংসিত সীমান্ত-বিরোধ নিয়েও বৃহস্পতিবার তারা খোলাখুলি কথা বলেছেন।

যে কোনও সহযোগিতার জন্য সীমান্তে শান্তি ও আস্থা ফেরানোটা জরুরি, মি. মোদীর এই বক্তব্যের জবাবে প্রেসিডেন্ট শি-ও স্বীকার করেছেন যে ঐতিহাসিকভাবে দুদেশের সীমান্ত সঠিকভাবে নিরূপিত ও চিহ্নিত নয় বলেই সমস্যা তৈরি হয়। এই সমস্যার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চীনের অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছেন তিনি।

পর্যবেক্ষকরাও তাই মনে করছেন, পুরনো বিরোধ মিটিয়ে ভারত ও চীনের অর্থনীতির রাস্তায় একযোগে পথ-চলারই সূচনা করতে পারে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই সফর।