ঘাতক আল-বদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন নিজামী

Image caption আল বদর বহিনীর প্রধান ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবীদের তুলে নিয়ে হত্যা করার কাজটি করেছিল আল বদর বাহিনী।

এই বাহিনীর প্রধান ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী।

বলা হয়, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি যারা তাদের সম্পর্কে খবর দেয়া, তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাড়ি বাড়ি নিয়ে যাওয়া ও তাদের হত্যার কাজটি করেছিল আল বদর।

কিভাবে ও কেন তৈরি হয়েছিল এই বাহিনী? কিভাবে তারা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কাজ করেছে?

মতিউর রহমান নিজামী ১৯৭১ সালে ছিলেন তখনকার জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রধান ।

এই ছাত্র সংঘের সদস্যদের নিয়েই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী মিলিশিয়া হিসেবে গঠিত হয়েছিল আল-বদর বাহিনী ।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিশেষ করে শেষ কয়েক মাসে এই আলবদর বাহিনী ঢাকা এবং অন্যত্র পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল।

মতিউর রহমান নিজামী নিজেই তখন সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে আলবদর বাহিনীকে বর্ণনা করেছিলেন "পাকিস্তানের শত্রুদের কাছে সাক্ষাত আজরাইল" বলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আহমদ। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর সকাল বেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হল থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায় আল-বদর বাহিনীর কয়েকজন সদস্য।

তার ছোট ভাই অধ্যাপক রশিদউদ্দিন বলেছেন, প্রায় দু’সপ্তাহ পর তার মরদেহ পাওয়া গিয়েছিলো।

তিনি বলেন, “প্রায় দু’সপ্তাহ পরে মিরপুরের একটি বধ্যভূমিতে তাকে পাওয়া যায়। সেখানে একটি কূপে অনেক মরদেহের মধ্য থেকে শুধু পরনের কাপড় দেখে তাকে সনাক্ত করা হয়েছিলো।”

ছবির কপিরাইট web
Image caption বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে আল-বদর বাহিনী

পরিবারের কয়েকজন সদস্যের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে।

অধ্যাপক রশিদউদ্দিন বলেন, সেই স্মৃতি তাকে এখনো বেদনা দেয়।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিশেষ করে শেষের দিকে এরকম আরও বহু হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হয় আল-বদর বাহিনীকে।

পরে তাদের অনেকের মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল দেশের অসংখ্য বধ্যভূমিতে। পাওয়া যায়নি অনেককেই।

Image caption বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের গণহত্যা

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মে মাসের দিকে ময়মনসিংহ জেলায় প্রথম আল-বদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক আফসান চৌধুরী বলেছেন, সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উদ্যোগে এই বাহিনী প্রতিষ্ঠা করা হয়।

তিনি বলেন, “মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তান বাহিনী ভেতর থেকে কোনো প্রতিরোধ হবে বলে ভাবেনি। তাদের প্রস্তুতিও ছিল না। কিন্তু সারা বাংলাদেশে প্রতিরোধ শুরু হলে দেশের পুন:নিয়ন্ত্রণ নেবার দরকার পড়ে তাদের। তারা বুঝতে পারে পুরো বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তখন তাদের যে সহায়ক ছিল তাদের নিয়ে এই বাহিনী গঠন করা হয়েছিলো।”

আফসান চৌধুরী বলেন, আল-বদর তৈরি হওয়ার পর এই বাহিনী মূলত শহরাঞ্চলে কাজ করে।

আর গ্রামাঞ্চলে মূলত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করতো রাজাকার বাহিনী।

বাংলাদেশ ওয়ারক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রধান ড: এম এ হাসান বলেছেন, “আল বদর বাহিনীকে সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে পাকিস্তান বাহিনী। অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিতো, মাসিক ভাতা দিতো। প্রশিক্ষণ শেষ হবার পর পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে বিভিন্ন অপারেশনে যেতো আল বদর বাহিনীর সদস্যরা। যাদেরকে শত্রু মনে করতো তারা তাদের সম্পর্কে খবরাখবর নিতো, তুলে নিয়ে যেতো ও গোপন হত্যাকাণ্ড চালাতো। কখনো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতেও তুলে দিতো।”

আল-বদর বাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তান রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য যে আদর্শ ধারণ করতো তা বেশ শক্ত ছিল বলে মনে করেন, ড: হাসান।

আল-বদর বাহিনী পুরো সময় তাদের কার্যক্রম চালালেও মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দুদিন আগে, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করে।

আফসান চৌধুরী বলেন, যাদেরকে পাকিস্তানের শত্রু বলে মনে করা হয়েছিল তাদের নামের তালিকা তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর দ্বারাই। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা তৈরি হলে এই তালিকা ধরে হত্যাকাণ্ডের বাস্তবায়ন করে আল-বদর বাহিনী।

মুক্তিযুদ্ধের পর আল-বদর বাহিনীর অনেকেই পালিয়ে পাকিস্তান চলে যান। ড: হাসান বলছেন, পাকিস্তানে তাদেরকে স্বাগত জানানোর জন্য বিশেষ দল ছিল।

পাকিস্তানের আইএসআই-এর সহায়তা তারা পাকিস্তানে নানা কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হয়েছেন।

পশ্চিমা বেশ কয়েকটি দেশেও রয়েছেন কয়েকজন।

তিনি বলেন, “তাদের নামের পতন হলেও তাদের আদর্শ এখনো রয়ে গেছে।”